দেশে ১০-১৫টি ব্যাংক থাকলেই যথেষ্ট বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর। অতিরিক্ত ব্যাংক কীভাবে ব্যয় ও ঝুঁকি বাড়াচ্ছে, জানুন বিস্তারিত।
বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। দেশে ১০-১৫টি ব্যাংক থাকলেই যথেষ্ট—এমন বাস্তবভিত্তিক মন্তব্য করে আবারও আলোচনায় এসেছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর। বর্তমানে দেশে ৬৪টি ব্যাংক কার্যক্রম পরিচালনা করছে, যা অর্থনীতির জন্য কতটা কার্যকর—সেই প্রশ্নই সামনে এনেছেন তিনি।
বুধবার (২১ জানুয়ারি) সকালে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে আয়োজিত এক বক্তৃতায় গভর্নর ব্যাংকিং খাতের বর্তমান অবস্থা, গভর্নেন্স সংকট এবং ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ নিয়ে বিস্তারিত কথা বলেন। তার বক্তব্যে উঠে আসে ব্যাংকের সংখ্যা কমানোর প্রয়োজনীয়তা, মালিকানা কাঠামোর সমস্যা এবং দীর্ঘদিনের নীতিগত ব্যর্থতা।
বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতি ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের যৌথ আয়োজনে এই আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়।
কেন দেশে ১০-১৫টি ব্যাংক থাকলেই যথেষ্ট—গভর্নরের ব্যাখ্যা

বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর স্পষ্টভাবে বলেন, দেশে যদি ১০ থেকে ১৫টি ব্যাংক থাকত, তাহলে ব্যাংকিং খাত অনেক বেশি কার্যকর হতো। অতিরিক্ত ব্যাংকের কারণে—
-
প্রশাসনিক ব্যয় বেড়েছে
-
নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হয়েছে
-
ঝুঁকিপূর্ণ ঋণ বেড়েছে
-
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তদারকি জটিল হয়েছে
তার মতে, ব্যাংকের সংখ্যা কম হলে ব্যয় কমে আসত এবং লভ্যাংশ বাড়ত। পাশাপাশি নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর জন্য নজরদারি সহজ হতো।
ব্যাংকিং খাতের সবচেয়ে বড় সমস্যা: গভর্নেন্স ফেইলর
গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের মূল সংকট হলো গভর্নেন্স ফেইলর। রাজনৈতিক প্রভাব ও প্রভাবশালী ব্যক্তি বা পরিবারের নির্দেশে ঋণ দেওয়া হয়েছে।
তিনি স্বীকার করেন—
“এর পেছনে বাংলাদেশ ব্যাংকসহ সংশ্লিষ্ট অনেক প্রতিষ্ঠানের অবহেলা রয়েছে, যা অস্বীকার করার উপায় নেই।”
এই দুর্বল শাসন কাঠামোর সুযোগ নিয়ে বড় অঙ্কের ঋণ খেলাপি হয়েছে এবং অর্থ পাচারের মতো গুরুতর ঘটনা ঘটেছে।
ইসলামী ব্যাংক একীভূতকরণ ও নিয়ন্ত্রণ সংকট
গভর্নর উদাহরণ দিয়ে বলেন, ইসলামী ধারার পাঁচটি ব্যাংক একীভূত করা হয়েছে। এসব ব্যাংক দীর্ঘদিন ধরে ব্যক্তিমালিকানার নিয়ন্ত্রণে ছিল।
চেক অ্যান্ড ব্যালান্সের অভাবেই—
-
প্রায় তিন লাখ কোটি টাকা দেশ থেকে বেরিয়ে গেছে
-
ব্যাংকগুলোর আর্থিক স্বাস্থ্য ভেঙে পড়েছে
-
আমানতকারীদের আস্থা নষ্ট হয়েছে
এই বাস্তবতায় দেশে ১০-১৫টি ব্যাংক থাকলেই যথেষ্ট—এই বক্তব্য আরও শক্ত ভিত্তি পায়।
বাংলাদেশে ব্যাংকিং খাত কেন অস্বাভাবিকভাবে প্রভাবশালী
বিশ্বব্যাপী চারটি প্রধান আর্থিক খাতের মধ্যে ব্যাংকিং খাত সাধারণত তৃতীয় স্থানে থাকে। কিন্তু বাংলাদেশে এটি প্রথম স্থানে অবস্থান করছে।
এর ফলে—
-
বন্ড মার্কেট পিছিয়ে পড়েছে
-
স্টক মার্কেট দুর্বল হয়েছে
-
বিকল্প অর্থায়ন ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি
গভর্নর বলেন, এই ভারসাম্যহীনতা দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতির জন্য ক্ষতিকর।
দীর্ঘমেয়াদি ঋণের সংকট ও কাঠামোগত দুর্বলতা
বাংলাদেশে ব্যাংকগুলো সাধারণত দীর্ঘমেয়াদি ঋণ দিতে অনিচ্ছুক। ২০–২৫ বছর মেয়াদি ঋণ খুব কম ক্ষেত্রেই দেওয়া হয়।
কারণ হিসেবে উঠে আসে—
-
উচ্চ ঝুঁকি
-
নীতিগত অনিশ্চয়তা
-
তদারকি চাপ
ঋণ দেওয়ার পরপরই ব্যাংকগুলো চাপের মধ্যে পড়ে যায়। এতে বিনিয়োগকারীরা আস্থা হারান।
ব্যাংকের সংখ্যা কমালে কী পরিবর্তন আসতে পারে
বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি বাস্তবসম্মতভাবে ব্যাংকের সংখ্যা কমানো যায়, তাহলে—
-
নিয়ন্ত্রণ সহজ হবে
-
ঋণ ব্যবস্থাপনা উন্নত হবে
-
খেলাপি ঋণ কমবে
-
আমানতকারীদের আস্থা ফিরবে
এই দৃষ্টিকোণ থেকেই গভর্নরের বক্তব্য—দেশে ১০-১৫টি ব্যাংক থাকলেই যথেষ্ট—নতুন করে গুরুত্ব পাচ্ছে।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত বিশিষ্টজনেরা
এই আলোচনায় আরও উপস্থিত ছিলেন—
-
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. রেজাউল করিম
-
অর্থনীতি সমিতির আহ্বায়ক অধ্যাপক ড. মাহবুব উল্লাহ
-
সদস্যসচিব ড. মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন
তাঁরা সবাই ব্যাংকিং খাত সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার বিষয়ে একমত পোষণ করেন।
ভবিষ্যৎ করণীয় কী হতে পারে
বিশ্লেষকদের মতে—
-
নতুন ব্যাংক অনুমোদন বন্ধ করা
-
দুর্বল ব্যাংক একীভূত করা
-
মালিকানা কাঠামো সংস্কার
-
রাজনৈতিক প্রভাব কমানো
এই পদক্ষেপগুলো বাস্তবায়ন করা গেলে ব্যাংকিং খাত আবার স্থিতিশীল হতে পারে।
বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য শক্তিশালী ও বিশ্বাসযোগ্য ব্যাংকিং ব্যবস্থা অপরিহার্য। সেই লক্ষ্যেই গভর্নরের এই বক্তব্য নীতিনির্ধারকদের নতুন করে ভাবতে বাধ্য করবে।




