এইমাত্র

আরও খবর

News Photocard (22)
শিক্ষকদের পে স্কেল বাস্তবায়নে নতুন নির্দেশনা, সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে চিঠি
News Photocard (13)
ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপিসহ তিন কমিটি বিলুপ্ত, ১৪ নেতা বহিষ্কার
News Photocard (7)
প্রধানমন্ত্রীর ফেনী সফরের কর্মসূচিতে যা রয়েছে
News Photocard
৭ দেশের শ্রমবাজারে ৯৪ শতাংশ বাংলাদেশি
News Photocard (25)
সকাল থেকে নিখোঁজ, ফুফুর কক্ষের বাক্সে মিলল শিশুর মরদেহ

পাঁচ বছরে বাংলাদেশ থেকে ৬১৫ কোটি ডলারের বেশি নিয়ে গেছে বিদেশি কম্পানি

পাঁচ বছরে বাংলাদেশ থেকে ৬১৫ কোটি ডলারের বেশি নিয়ে গেছে বিদেশি কম্পানি, ডলার সংকট, আটকে থাকা মুনাফা ও কমে যাওয়া নতুন বিদেশি বিনিয়োগও আলোচনায়, বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশে ব্যবসা করা বিদেশি কম্পানিগুলো গত পাঁচ অর্থবছরে বিদেশি কম্পানির মুনাফা প্রত্যাবাসন হিসেবে ৬ দশমিক ১৫ বিলিয়ন ডলার বা ৬১৫ কোটি ডলার নিজ নিজ দেশে নিয়ে গেছে। বাংলাদেশি মুদ্রায় এর পরিমাণ প্রায় ৭০ হাজার কোটি টাকা। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বিশ্লেষণ করে করা এক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। একই সময়ে বাংলাদেশে নতুন বিদেশি বিনিয়োগের প্রবাহও কমেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১-২২ থেকে ২০২৫-২৬ অর্থবছর পর্যন্ত টেলিযোগাযোগ, তেল-গ্যাস, খনিজ ও বিদ্যুৎ, তৈরি পোশাক ও বস্ত্র, ব্যাংক, বীমা ও লিজিংসহ বিভিন্ন খাতের বিদেশি কম্পানি লভ্যাংশ, মুনাফা ও আয় হিসেবে এই অর্থ প্রত্যাবাসন করেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেছেন, বিদেশি কম্পানির মুনাফা প্রত্যাবাসনের তথ্য থেকে বোঝা যায়, বাংলাদেশে বিনিয়োগ করে মুনাফা করার সুযোগ রয়েছে। তাঁর মতে, বিদেশি কম্পানির অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে দেশের উদ্যোক্তারাও বিনিয়োগে এগিয়ে আসতে পারেন।

পাঁচ বছরে বিদেশি কম্পানির মুনাফা প্রত্যাবাসনের চিত্র

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, পাঁচ বছরের প্রতিটি অর্থবছরে অর্থ প্রত্যাবাসনের পরিমাণে উল্লেখযোগ্য ওঠানামা হয়েছে।

২০২১-২২ অর্থবছরে বিদেশি কম্পানিগুলো ১৩৮ কোটি ৪৭ লাখ ডলার দেশে থেকে প্রত্যাবাসন করে। পরের অর্থবছরে বৈদেশিক মুদ্রার সংকটের মধ্যে এই অর্থের পরিমাণ প্রায় ৫২ শতাংশ কমে ৬৬ কোটি ৫ লাখ ডলারে নেমে আসে।

এরপর ২০২৩-২৪ অর্থবছরে পরিস্থিতিতে পরিবর্তন দেখা যায়। ওই অর্থবছরে বিদেশি কম্পানিগুলোর প্রত্যাবাসন বেড়ে ১১১ কোটি ৯৫ লাখ ডলারে দাঁড়ায়।

২০২৪-২৫ অর্থবছরে পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ অর্থ প্রত্যাবাসন হয়। ওই বছর বিদেশি কম্পানিগুলো ১৫২ কোটি ৪৩ লাখ ডলার বাংলাদেশ থেকে নিয়ে যায়।

সর্বশেষ ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এই পরিমাণ কিছুটা কমে ১৪৬ কোটি ৩ লাখ ডলারে দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ সর্বোচ্চ প্রত্যাবাসনের পরিমাণের তুলনায় কিছুটা কমলেও আগের কয়েক বছরের তুলনায় বিদেশি কম্পানির মুনাফা প্রত্যাবাসন উল্লেখযোগ্য পর্যায়ে ছিল।

ডলার সংকটে আটকে ছিল মুনাফা

বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালের মাঝামাঝি দেশে ডলার সংকট শুরু হয় এবং ২০২৩ সালে তা আরও তীব্র হয়। এর প্রভাব পড়ে বিদেশি কম্পানির মুনাফা বিদেশে পাঠানোর ক্ষেত্রেও।

২০২২ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত অনেক বিদেশি কম্পানি তাদের মুনাফা প্রত্যাবাসন করতে পারেনি। এ সময়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষ থেকেও এ ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ ছিল।

পরবর্তীতে ২০২৫ সালের শুরুতে বিধিনিষেধ শিথিল করা হলে আগের কয়েক বছরে আটকে থাকা মুনাফার একটি অংশ বিদেশে পাঠানো হয়। এর ফলেই ২০২৪-২৫ অর্থবছরে অর্থ প্রত্যাবাসনের পরিমাণ পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছে যায়।

কোন খাতে বেশি অর্থ প্রত্যাবাসন হয়েছে

গত পাঁচ বছরে বিভিন্ন খাতের বিদেশি কম্পানিগুলো বাংলাদেশ থেকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ প্রত্যাবাসন করেছে। এর মধ্যে টেলিযোগাযোগ, জ্বালানি, তৈরি পোশাক, ব্যাংকিং, বীমা এবং ভোক্তা পণ্য খাতের প্রতিষ্ঠান রয়েছে।

টেলিযোগাযোগ খাতের শীর্ষ প্রত্যাবাসনকারী কম্পানিগুলোর মধ্যে রয়েছে টেলিনর মোবাইল কমিউনিকেশনস, আজিয়াটা ইনভেস্টমেন্টস ও ভারতি ইন্টারন্যাশনাল।

টেলিনর মোবাইল কমিউনিকেশনস এএস গ্রামীণফোনের ৫৫ দশমিক ৮ শতাংশ শেয়ারের মালিক। গ্রামীণফোনের আর্থিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০০২ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত ২৪ বছরে টেলিনরকে ২২ হাজার ২১৭ কোটি টাকা লভ্যাংশ দেওয়া হয়েছে।

তেল-গ্যাস ও বিদ্যুৎ খাত

তেল, গ্যাস, খনিজ ও বিদ্যুৎ খাতে যুক্তরাষ্ট্রের শেভরন বাংলাদেশ অর্থ প্রত্যাবাসনকারী শীর্ষ প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি।

উৎপাদন বণ্টন চুক্তি বা পিএসসির আওতায় শেভরন বাংলাদেশ বিবিয়ানা, জালালাবাদ ও মৌলভীবাজার গ্যাসক্ষেত্র পরিচালনা করে।

এই খাতে সিঙ্গাপুরে নিবন্ধিত সামিট পাওয়ার ইন্টারন্যাশনাল এবং ভিক্টোরিয়া হোল্ডিংসও শীর্ষ প্রত্যাবাসনকারীদের তালিকায় রয়েছে।

তৈরি পোশাক ও বস্ত্র খাত

তৈরি পোশাক ও বস্ত্র খাতেও বিদেশি মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানগুলো বাংলাদেশ থেকে অর্থ প্রত্যাবাসন করেছে।

উল্লেখযোগ্য প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের আর-প্যাক ইন্টারন্যাশনাল, শ্রীলংকার ইউনিচেলা এবং নেদারল্যান্ডসের পাক্সার বি.ভি।

অন্যদিকে ব্যাংক, লিজিং ও বীমা খাতে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক, আমেরিকান লাইফ ইন্স্যুরেন্স কম্পানি বা মেটলাইফ এবং এএসপি ফিন অ্যাসেট অ্যান্ড লায়াবিলিটি ম্যানেজমেন্ট উল্লেখযোগ্য প্রত্যাবাসনকারী প্রতিষ্ঠান।

বিদেশি বিনিয়োগের প্রবাহও কমেছে

একদিকে বিদেশি কম্পানির মুনাফা প্রত্যাবাসন বেড়েছে, অন্যদিকে বাংলাদেশে নতুন বিদেশি বিনিয়োগের প্রবাহ কমেছে। এই দুই প্রবণতা দেশের বিনিয়োগ পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনার সুযোগ তৈরি করেছে।

তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ইকুইটি মূলধন হিসেবে বাংলাদেশে এসেছে ৫৫ কোটি ৪৭ লাখ ৭০ হাজার ডলার। আগের অর্থবছরের তুলনায় এই প্রবাহ প্রায় ১৭ শতাংশ কম।

অর্থাৎ বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলো আগের বিনিয়োগ থেকে অর্জিত মুনাফার একটি অংশ দেশে থেকে নিয়ে গেলেও একই সময়ে নতুন ইকুইটি মূলধন প্রবাহ কমেছে।

এখানে মুনাফা প্রত্যাবাসন এবং নতুন বিনিয়োগ—দুটি বিষয়কে আলাদা করে দেখা জরুরি। একটি হলো বাংলাদেশে বিদ্যমান বিদেশি বিনিয়োগ থেকে অর্জিত অর্থ বিদেশে পাঠানো; অন্যটি হলো নতুন করে বিদেশি মূলধন দেশে প্রবেশ করা।

স্থানীয় অর্থনীতিতে বিদেশি বিনিয়োগের ভূমিকা

পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ও সিইও ড. এম মাসরুর রিয়াজের মতে, বিদেশি বিনিয়োগকারীরা শুধু মূলধন নয়, আধুনিক প্রযুক্তি ও দক্ষ ব্যবস্থাপনাও নিয়ে আসেন।

তিনি মনে করেন, বিদেশি বিনিয়োগের মাধ্যমে রপ্তানিতে নতুন পণ্য ও বাজার তৈরির সুযোগ তৈরি হতে পারে। পাশাপাশি ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগ বা এসএমই খাতেও সাপ্লাই চেইন লিংকেজ তৈরিতে বিদেশি প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা থাকতে পারে।

তবে ড. এম মাসরুর রিয়াজের বক্তব্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগ স্থানীয় উদ্যোক্তা ও সাপ্লাই চেইন তৈরির ক্ষেত্রে প্রত্যাশিত ভূমিকা রাখতে পারেনি।

এই বিষয়টি বিদেশি বিনিয়োগের পরিমাণের পাশাপাশি এর অর্থনৈতিক প্রভাবও বিবেচনার প্রয়োজনীয়তা সামনে আনে। শুধু কত অর্থ দেশে ঢুকল বা কত অর্থ বাইরে গেল—এর পাশাপাশি বিনিয়োগের মাধ্যমে প্রযুক্তি, দক্ষতা, রপ্তানি সক্ষমতা এবং স্থানীয় ব্যবসার সঙ্গে সংযোগ কতটা তৈরি হচ্ছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।

বহুজাতিক কম্পানির অবদান কতটা

এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে বহুজাতিক কম্পানিগুলোর অবদান মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপির ৫ শতাংশেরও কম।

রপ্তানিতেও এসব কম্পানির অবদান ৫ শতাংশে পৌঁছায়নি।

এ তথ্য বিদেশি বিনিয়োগের আকার এবং দেশের অর্থনীতিতে এর প্রত্যক্ষ অবদানের মধ্যে পার্থক্যটি তুলে ধরে। বিদেশি কম্পানিগুলো বিভিন্ন খাতে ব্যবসা পরিচালনা করলেও সামগ্রিক জিডিপি ও রপ্তানিতে তাদের অংশ এখনও সীমিত বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

অন্যদিকে অন্যান্য খাতের শীর্ষ বিদেশি কম্পানিগুলোর মধ্যে রয়েছে ইউনিলিভার ইউকেসিআর, দ্য র‍্যালে ইনভেস্টমেন্ট কম্পানি এবং ভারতের ম্যারিকো লিমিটেড। ম্যারিকো বাংলাদেশ গত পাঁচ বছরে মূল কম্পানির কাছে লভ্যাংশ হিসেবে দুই হাজার কোটি টাকার বেশি প্রত্যাবাসন করেছে।

বিদেশি কম্পানির মুনাফা প্রত্যাবাসন ও বিনিয়োগের ভবিষ্যৎ

গত পাঁচ বছরের তথ্য বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনা, বিদেশি বিনিয়োগ এবং মুনাফা প্রত্যাবাসনের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্কের একটি চিত্র তুলে ধরে।

২০২২ সালের পর ডলার সংকটের কারণে বিদেশি কম্পানির মুনাফা প্রত্যাবাসনে বাধা তৈরি হয়েছিল। পরে বিধিনিষেধ শিথিল হওয়ায় আগের কয়েক বছরের আটকে থাকা মুনাফার একটি অংশ একসঙ্গে বিদেশে যাওয়ায় ২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রত্যাবাসন সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়।

তবে একই সময়ে নতুন বিদেশি ইকুইটি বিনিয়োগ কমে যাওয়ার বিষয়টিও সামনে এসেছে। ফলে বিদেশি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে শুধু প্রত্যাবাসনের পরিমাণ নয়, নতুন বিনিয়োগের প্রবাহ এবং বিনিয়োগের মাধ্যমে স্থানীয় অর্থনীতিতে কী ধরনের সংযোগ তৈরি হচ্ছে—এসব বিষয়ও আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান অবশ্য বিদেশি কম্পানির মুনাফা প্রত্যাবাসনকে বিনিয়োগের সুযোগের একটি ইঙ্গিত হিসেবে দেখেছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে বিনিয়োগ করে বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলো মুনাফা করতে পারছে—এটি দেশের বিনিয়োগ সম্ভাবনার দিকটি নির্দেশ করে।

২০২১-২২ থেকে ২০২৫-২৬ অর্থবছর পর্যন্ত বাংলাদেশ থেকে বিদেশি কম্পানিগুলো মোট ৬১৫ কোটি ডলার প্রত্যাবাসন করেছে। ডলার সংকটের কারণে একপর্যায়ে এই প্রবাহ কমে গেলেও পরবর্তীতে আটকে থাকা মুনাফার একটি অংশ বিদেশে যাওয়ায় প্রত্যাবাসন বেড়েছে।

একই সময়ে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে নতুন বিদেশি ইকুইটি বিনিয়োগ ১৭ শতাংশ কমেছে। ফলে বিদেশি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে মুনাফা প্রত্যাবাসনের পাশাপাশি নতুন মূলধন প্রবাহ, প্রযুক্তি, দক্ষতা, রপ্তানি এবং স্থানীয় সাপ্লাই চেইনে এর অবদান—সবগুলো বিষয় একসঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

সর্বাধিক পঠিত