ধার অনুদান অর্থনীতি নিয়ে বিশেষজ্ঞদের সতর্ক বার্তা তুলে ধরেছে Shikor TV Canada। ধার–অনুদান নিয়ে বেশি দূর যাওয়া যায় না, বললেন অর্থ উপদেষ্টা।
ধার অনুদান অর্থনীতি নিয়ে নতুন করে সতর্ক করলেন অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ। তিনি বলেন, দীর্ঘমেয়াদে উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হলে কোনো দেশই শুধুমাত্র ধার বা অনুদানের ওপর নির্ভর করতে পারে না। ধার–অনুদান নিয়ে বেশি দূর যাওয়া যায় না বিশেষ করে স্বাস্থ্য, শিক্ষা এবং অবকাঠামো—এই তিনটি খাতে টেকসই অগ্রগতি এনে দিতে হলে নিজের আয়ের উৎস শক্তিশালী করা ছাড়া বিকল্প নেই।
রাজস্ব ভবনে আয়োজিত জাতীয় ভ্যাট দিবসের সেমিনারে তিনি এই মন্তব্য করেন। তাঁর বক্তব্য স্পষ্ট করে দেয় যে ধার অনুদান অর্থনীতি বাংলাদেশকে একটি পর্যায়ে সহায়তা করলেও, দীর্ঘ মেয়াদে এটি দেশের উন্নয়ন কাঠামোকে দুর্বল করে দিতে পারে।
তিনি বলেন, ধার নিলে সুদের চাপ তৈরি হয়। আবার অনুদান নিলে ব্যবহার ও ব্যয়ের স্বাধীনতা সীমিত থাকে। অনেক সময় শর্তও যুক্ত থাকে, যা উন্নয়ন প্রকল্প পরিচালনায় বাধা সৃষ্টি করতে পারে। তাই সরকারি রাজস্বের ভিত্তি শক্তিশালী করাই আজ সবচেয়ে বড় প্রয়োজন।

ভ্যাট রাজস্ব বৃদ্ধি ছাড়া উন্নয়ন ধরে রাখা কঠিন
সেমিনারে অর্থ উপদেষ্টা আরও বলেন—অনেক সময় জনগণ ভ্যাট দিলেও তা সরকারি কোষাগারে পৌঁছায় না। তিনি মনে করেন, ভ্যাট আদায়ের পদ্ধতি সহজ না হলে সাধারণ ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে ভোক্তা—কেউই এ প্রক্রিয়ায় উৎসাহিত হয় না। ফলে রাজস্ব বাড়ে না; উন্নয়নও বাধাগ্রস্ত হয়।
এ কারণে ভ্যাটকে শক্তিশালী ও আধুনিক রাজস্ব পদ্ধতি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা জরুরি বলে তিনি মত দেন।
তিনি আরও মন্তব্য করেন—নিজস্ব আয়ের মাধ্যমে সরকার যদি স্বাস্থ্যসেবা উন্নয়ন করতে পারে, শিক্ষা ব্যবস্থায় বিনিয়োগ বাড়াতে পারে এবং বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পবাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে পারে, তাহলে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি আরও স্থিতিশীল হবে।
ভ্যাট ব্যবস্থায় সংস্কারের প্রয়োজন—ধার অনুদান অর্থনীতি
এখানে আবারও দেখা যায় যে ধার অনুদান অর্থনীতি নির্ভরতার ঝুঁকি কমাতে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার কতটা গুরুত্বপূর্ণ।
সেমিনারের সভাপতিত্ব করেন জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খান। তিনি বলেন, ভ্যাট চালুর প্রথম দিকে ৯৫ শতাংশ ব্যবসায়ী এর বিরোধিতা করেছিলেন। কিন্তু ধীরে ধীরে ভ্যাটের ভূমিকা প্রমাণিত হয়েছে।
তিনি জানান, ভ্যাটের রাজস্ব না থাকলে সরকার বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা, মুক্তিযোদ্ধা ভাতা—এমন বহু সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি চালু করতে পারতো না। অর্থাৎ ভ্যাট শুধু রাজস্ব নয়, দেশের সামাজিক উন্নয়নের অন্যতম ভিত্তি।
ছোট ব্যবসায়ীদের জন্য নতুন ভ্যাট সফটওয়্যার
এনবিআর চেয়ারম্যান জানান, ছোট উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ীদের সুবিধার্থে একটি নতুন সফটওয়্যার চালু করা হবে।
এই সফটওয়্যার সরকারি খরচে তৈরি হবে এবং ছোট ব্যবসায়ীরা সহজেই সেখানে প্রবেশ করে ভ্যাট দিতে পারবেন।
তাঁদের আলাদা কোনো প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে না। এতে একদিকে ব্যবসায়ীদের সময় ও খরচ বাঁচবে, অন্যদিকে রাজস্ব সংগ্রহের হারও বৃদ্ধি পাবে।
তিনি আরও বলেন—ছোটদের কাছ থেকে ভ্যাট আদায় না করলে বড় ব্যবসায়ীদের ওপর করের চাপ আরও বাড়বে। এর ফলে অর্থনৈতিক ভারসাম্য নষ্ট হতে পারে।
জিডিপির তুলনায় কর আদায়ের হার কেন কমছে?
এনবিআর চেয়ারম্যান জানান—এক সময় জিডিপির তুলনায় কর আদায়ের হার ছিল ১০ শতাংশ। এখন তা নেমে এসেছে ৬ শতাংশে।
তবে তিনি এর সম্ভাব্য কারণ ব্যাখ্যা করেন। জিডিপির হিসাব পরিবর্তনের ফলে এমনটা হতে পারে। তিনি মনে করেন, জিডিপির কিছু ক্ষেত্র রয়েছে যেখানে কর প্রশাসনের পৌঁছানো এখনো সম্ভব হয়নি।
এ কারণে এই খাতে গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে।
তবে তিনি রাজস্ব বৃদ্ধির ইতিবাচক দিকও উল্লেখ করেন। প্রতিবছর কর আদায়ের প্রবৃদ্ধি ১৫ শতাংশ হারে বাড়ছে। চলতি বছরের শেষে এই প্রবৃদ্ধি ২০ শতাংশে পৌঁছাতে পারে বলেও তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
টেকসই উন্নয়নের পথে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ
ধার বা অনুদানের ওপর নির্ভরশীল হওয়ার বড় সমস্যা হলো—এই অর্থায়ন চিরস্থায়ী নয়। দীর্ঘমেয়াদে এটি উন্নয়নকে অনিশ্চিত করে তোলে। ফলে বাজেট ঘাটতি বাড়ে, নতুন প্রকল্প থেমে যায় বা সময়মতো শেষ করা যায় না।
অর্থনীতিবিদদের মতে, কোনো দেশ যখন বারবার অনুদান বা ঋণের ওপর নির্ভর করে, তখন তার নীতি স্বাধীনতা কমে যায়। সরকার নতুন নীতি গ্রহণে সংকোচবোধ করে। আবার আন্তর্জাতিক সংস্থার শর্তও অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় চাপ সৃষ্টি করে।
সালেহউদ্দিন আহমেদ তাই বারবার জোর দিয়ে বলেন—নিজস্ব আয়ের উৎস যত বেশি, দেশের অর্থনীতি তত স্থিতিশীল হবে। ভ্যাট ও কর কাঠামো শক্তিশালী হলে সরকার স্বাস্থ্য, শিক্ষা, কৃষি, প্রযুক্তি—সব খাতে পরিকল্পিত বিনিয়োগ করতে পারবে।
দেশের অর্থনীতির জন্য কী বার্তা রেখে গেল এই সেমিনার?
এই সেমিনার মূলত তিনটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা স্পষ্ট করে—
ধার অনুদান অর্থনীতি দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁকিপূর্ণ
কোনো উন্নয়ন ধার করে চলতে পারে না। এতে দেশের স্বাভাবিক উন্নয়নচক্র ব্যাহত হয়।
ভ্যাট রাজস্ব টেকসই উন্নয়নের মূল চালিকা শক্তি
ভ্যাট ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ও আধুনিকীকরণ জরুরি। জনগণের আস্থা ফিরলে রাজস্ব আরও বাড়বে।
কর আদায় ব্যবস্থায় গবেষণা ও সংস্কার প্রয়োজন
জিডিপির সঙ্গে কর আদায়ের অসামঞ্জস্য দূর করতে আধুনিক গবেষণা দরকার।
বিষয়টি নিয়ে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষণ
বিশ্বব্যাংকের একটি গবেষণায় বলা হয়েছে—নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলো যখন নিজস্ব রাজস্ব বৃদ্ধির ওপর নজর দেয়, তখন তাদের অর্থনীতি পাঁচ থেকে সাত বছরের মধ্যে উল্লেখযোগ্যভাবে স্থিতিশীল হয়।
এই তথ্য প্রমাণ করে—নিজস্ব রাজস্ব কাঠামোই একটি দেশের উন্নয়নের দীর্ঘমেয়াদি ভিত্তি।




