জুলাই অভ্যুত্থানের নেতারা টার্গেট হয়ে উঠেছেন বলে সতর্ক করেছেন আসিফ মাহমুদ। ওসমান হাদির ওপর হামলা পরিকল্পিত ষড়যন্ত্রের অংশ কি না, জানুন বিস্তারিত।
জুলাই অভ্যুত্থানের নেতারা টার্গেট—এই আশঙ্কাজনক বক্তব্য এখন দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ও জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের অন্যতম নেতা আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়ার এমন মন্তব্য এসেছে এক গুরুতর হামলার পরিপ্রেক্ষিতে। ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক ও জুলাই আন্দোলনের সক্রিয় নেতা শরিফ ওসমান হাদিকে গুলি করার ঘটনাকে তিনি পরিকল্পিত রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র হিসেবে দেখছেন।
রোববার সকালে শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবসে রায়েরবাজার বধ্যভূমি স্মৃতিসৌধে শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে আসিফ মাহমুদ বলেন, জুলাই অভ্যুত্থানের নেতৃত্বকে নেতৃত্বহীন করার গভীর চক্রান্ত চলছে। তাঁর ভাষায়, পরাজিত শক্তিরা এখন সংগঠিতভাবে আঘাত হানছে।
এই বক্তব্য ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে—আসলে কি জুলাই অভ্যুত্থানের নেতারা টার্গেট হয়ে উঠেছেন?
জুলাই অভ্যুত্থানের নেতারা টার্গেট: আসিফ মাহমুদের বক্তব্যের তাৎপর্য

আসিফ মাহমুদ সরাসরি অভিযোগ করেন, যেভাবে ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী পরাজয়ের আভাস পেয়ে দেশকে মেধাশূন্য করতে বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ড চালিয়েছিল, ঠিক একই কৌশলে ২০২৪ সালের পরাজিত ফ্যাসিবাদী শক্তি এখন জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের নেতৃত্বকে টার্গেট করছে।
তিনি বলেন,
“চব্বিশের পরাজিত শক্তি দেশকে নেতৃত্বহীন করার জন্য জুলাই অভ্যুত্থানের নেতাদের ওপর হামলা চালাচ্ছে।”
এই বক্তব্য রাজনৈতিক বাস্তবতায় গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি শুধু একটি হামলার প্রতিক্রিয়া নয়, বরং একটি ধারাবাহিক ষড়যন্ত্রের ইঙ্গিত বহন করে।
ওসমান হাদির ওপর হামলা: কী ঘটেছিল
জুলাই অভ্যুত্থানের অন্যতম সংগঠক শরিফ ওসমান হাদি ঢাকা–৮ আসন থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। গত শুক্রবার দুপুরে বিজয়নগরে প্রচারণাকালে মোটরসাইকেলে আসা দুই ব্যক্তি তাঁকে গুলি করে পালিয়ে যায়।
-
মাথায় গুলিবিদ্ধ হন ওসমান হাদি
-
বর্তমানে তিনি ঢাকার এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন
-
অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে জানা গেছে
এই ঘটনায় দেশজুড়ে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়ে। অনেকেই এটিকে নিছক বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখছেন না।
হামলার পেছনে কারা: রাজনৈতিক অভিযোগ ও প্রতিক্রিয়া
ওসমান হাদির সমর্থকেরা এই হামলার জন্য গত বছরের গণ–অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগকে দায়ী করছেন। অন্যদিকে অন্তর্বর্তী সরকার মনে করছে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট বানচালের উদ্দেশ্যেই এই হামলা চালানো হয়েছে।
এই ঘটনার পর—
-
বিএনপি
-
জামায়াতে ইসলামী
-
জাতীয় নাগরিক পার্টি
হামলার নিন্দা জানিয়ে যৌথভাবে ষড়যন্ত্র মোকাবেলায় ঐক্যবদ্ধ থাকার ঘোষণা দেয়।
এই প্রেক্ষাপটে জুলাই অভ্যুত্থানের নেতারা টার্গেট—এই বক্তব্য আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে।
হিটলিস্টের অভিযোগ: আরও কারা ঝুঁকিতে
আসিফ মাহমুদ জানান, শুধু ওসমান হাদি নন, আরও অনেক জুলাই আন্দোলনের নেতাকে “হিটলিস্টে” রাখা হয়েছে বলে তাঁরা তথ্য পেয়েছেন।
তিনি বলেন,
“একাত্তরের মতো এবারও পরাজিত শক্তির ষড়যন্ত্র সফল হবে না।”
এই মন্তব্য রাজনৈতিক সহিংসতার সম্ভাবনা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
নির্বাচনের মাঠে জুলাই অভ্যুত্থানের নেতৃত্ব
ওসমান হাদির মতো আসিফ মাহমুদ নিজেও আসন্ন সংসদ নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। তিনি ঢাকা–১০ আসনে নির্বাচন করতে চান।
উল্লেখ্য—
-
তিনি বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক ছিলেন
-
অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন
-
১০ ডিসেম্বর নির্বাচনে অংশ নিতে পদত্যাগ করেন
নির্বাচনের প্রাক্কালে এমন হামলা রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করে তুলছে।
শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস ও জুলাই অভ্যুত্থানের যোগসূত্র
রায়েরবাজার বধ্যভূমিতে শ্রদ্ধা নিবেদনকালে আসিফ মাহমুদ বলেন, স্বাধীনতাযুদ্ধের যে প্রত্যাশা ছিল, ৫৪ বছর পরও তা পূরণ হয়নি। তাঁর মতে, এই ব্যর্থতার ফলেই ২০২৪ সালে জুলাই অভ্যুত্থান সংঘটিত হয়।
এই বক্তব্য জুলাই অভ্যুত্থানকে কেবল রাজনৈতিক আন্দোলন নয়, বরং ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতার অংশ হিসেবে উপস্থাপন করে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষণ: কেন এখন জুলাই অভ্যুত্থানের নেতারা টার্গেট
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে—
-
নির্বাচন ঘনিয়ে আসা
-
নতুন নেতৃত্বের উত্থান
-
গণ–অভ্যুত্থানের জনপ্রিয়তা
এই তিনটি বিষয় পরাজিত শক্তির জন্য হুমকি হয়ে উঠেছে। ফলে তারা সহিংসতার পথ বেছে নিতে পারে।
এই বাস্তবতায় জুলাই অভ্যুত্থানের নেতারা টার্গেট—এই বক্তব্য কেবল অভিযোগ নয়, বরং একটি সতর্কবার্তা।
জাতীয় নিরাপত্তা ও গণতন্ত্রের প্রশ্ন
এই ধরনের হামলা শুধু ব্যক্তিগত নিরাপত্তার প্রশ্ন নয়। এটি—
-
গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার ওপর আঘাত
-
অবাধ নির্বাচনের পথে বাধা
-
নতুন নেতৃত্ব বিকাশের জন্য হুমকি
হিসেবে দেখা হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক দৃষ্টিভঙ্গি
আন্তর্জাতিক গণতন্ত্র পর্যবেক্ষক সংস্থাগুলো সাধারণত রাজনৈতিক সহিংসতাকে নির্বাচনের জন্য বড় ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করে। এ বিষয়ে বিস্তারিত বিশ্লেষণ পাওয়া যায় Human Rights Watch-এর প্রতিবেদনে, যেখানে রাজনৈতিক সহিংসতা ও নির্বাচন নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে।
ওসমান হাদির ওপর হামলা এবং আসিফ মাহমুদের বক্তব্য নতুন করে স্পষ্ট করেছে—বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি এখন অত্যন্ত সংবেদনশীল। নির্বাচন সামনে রেখে সহিংসতার আশঙ্কা যেমন বাড়ছে, তেমনি গণ–অভ্যুত্থানের নেতৃত্বের নিরাপত্তা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।




