গাজার জন্য বোর্ড অব পিস গঠন করে যুদ্ধ বন্ধ ও পুনর্গঠনের পথে নতুন উদ্যোগ নিয়েছেন ট্রাম্প। ২০ দফা পরিকল্পনায় কী আছে, জানুন বিস্তারিত।
গাজার জন্য বোর্ড অব পিস গঠন করে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছেন যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। দীর্ঘদিনের রক্তক্ষয়ী সংঘাত, ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি ও মানবিক বিপর্যয়ের প্রেক্ষাপটে এই উদ্যোগকে কেউ দেখছেন আশার আলো হিসেবে, আবার কেউ দেখছেন গভীর অনিশ্চয়তার প্রতীক হিসেবে।
হোয়াইট হাউজের সর্বশেষ বিবৃতি অনুযায়ী, এই বোর্ড সাময়িকভাবে গাজার শাসনব্যবস্থার তত্ত্বাবধান করবে এবং যুদ্ধ–পরবর্তী পুনর্গঠন কার্যক্রম পরিচালনার দায়িত্ব পালন করবে। ট্রাম্প প্রশাসনের ভাষায়, এটি গাজার জন্য এখন পর্যন্ত “সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ ও শক্তিশালী আন্তর্জাতিক বোর্ড”।
বোর্ড অব পিসের নেতৃত্বে কারা আছেন
গাজার জন্য বোর্ড অব পিস গঠন প্রক্রিয়ায় আন্তর্জাতিক রাজনীতির প্রভাবশালী কয়েকজন ব্যক্তিকে যুক্ত করা হয়েছে। বোর্ডটির চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন স্বয়ং ডোনাল্ড ট্রাম্প। তাঁর নেতৃত্বে এই বোর্ড পরিচালিত হবে সরাসরি হোয়াইট হাউজের তত্ত্বাবধানে।
প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হিসেবে যুক্ত হয়েছেন—
-
যুক্তরাজ্যের সাবেক প্রধানমন্ত্রী স্যার টনি ব্লেয়ার
-
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও
এ ছাড়া ‘প্রতিষ্ঠাতা নির্বাহী সদস্য’ হিসেবে বোর্ডে থাকছেন—
-
ট্রাম্পের মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ
-
প্রেসিডেন্টের জামাতা জ্যারেড কুশনার
এই তালিকায় আরও রয়েছেন—
-
বেসরকারি আর্থিক প্রতিষ্ঠান কেকেআরের প্রধান নির্বাহী মার্ক রোয়ান
-
বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট অজয় বাঙগা
-
যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা রবার্ট গ্যাব্রিয়েল
হোয়াইট হাউজ জানিয়েছে, বোর্ডের বাকি সদস্যদের নাম আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই প্রকাশ করা হবে।
গাজার জন্য বোর্ড অব পিস গঠন: মূল লক্ষ্য কী

হোয়াইট হাউজের বিবৃতিতে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে, গাজার জন্য বোর্ড অব পিস গঠনের প্রধান লক্ষ্য তিনটি—
-
ইসরায়েল–হামাস যুদ্ধ স্থায়ীভাবে বন্ধ করা
-
যুদ্ধ–পরবর্তী গাজা পুনর্গঠন ও প্রশাসনিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা
-
দীর্ঘমেয়াদে গাজাকে সহিংসতামুক্ত ও পরিচালনাযোগ্য অঞ্চলে রূপান্তর করা
এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে ট্রাম্প একটি ২০ দফা শান্তি পরিকল্পনা ঘোষণা করেছেন। এই পরিকল্পনাকে প্রশাসন ‘বাস্তববাদী ও কঠোর’ হিসেবে বর্ণনা করেছে।
২০ দফা পরিকল্পনায় কী রয়েছে
ট্রাম্প প্রশাসনের ২০ দফা পরিকল্পনা দুইটি ধাপে বাস্তবায়নের কথা বলা হয়েছে।
প্রথম ধাপ:
-
হামাস ও ইসরায়েলের মধ্যে যুদ্ধবিরতি
-
বন্দি ও জিম্মি বিনিময়
-
ইসরায়েলি সেনাদের আংশিক প্রত্যাহার
-
গাজায় মানবিক ত্রাণ প্রবেশ বৃদ্ধি
এই ধাপটি ইতিমধ্যে কার্যকর হলেও, যুদ্ধবিরতি অত্যন্ত ভঙ্গুর অবস্থায় রয়েছে।
দ্বিতীয় ধাপ:
-
গাজার পূর্ণাঙ্গ পুনর্গঠন
-
অঞ্চলটির সম্পূর্ণ অসামরিকীকরণ
-
হামাসসহ সব ফিলিস্তিনি সশস্ত্র গোষ্ঠীর নিরস্ত্রীকরণ
স্টিভ উইটকফ জানিয়েছেন, দ্বিতীয় ধাপে কোনো ধরনের ছাড় দেওয়া হবে না। তাঁর ভাষায়, “দায়বদ্ধতা পালনে ব্যর্থ হলে ভয়াবহ পরিণতি অপেক্ষা করছে।”
গাজা পরিচালনায় এনসিএজি ও বোর্ড অব পিসের সমন্বয়
বোর্ড অব পিস ঘোষণার আগেই গাজা পরিচালনার জন্য একটি ১৫ সদস্যের ফিলিস্তিনি টেকনোক্র্যাট কমিটি গঠন করা হয়েছে। এর নাম ন্যাশনাল কমিটি ফর দ্য অ্যাডমিনিস্ট্রেশন অব গাজা (এনসিএজি)।
এই কমিটির নেতৃত্বে রয়েছেন পশ্চিম তীরভিত্তিক ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের সাবেক উপমন্ত্রী আলি শাথ। যুদ্ধ–পরবর্তী সময়ে গাজার দৈনন্দিন প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনা করবে এই কমিটি।
হোয়াইট হাউজ জানিয়েছে, জাতিসংঘের সাবেক মধ্যপ্রাচ্য দূত নিকোলে ম্লাদেনভ বোর্ড অব পিসের প্রতিনিধি হিসেবে গাজায় অবস্থান করে এনসিএজির সঙ্গে সমন্বয় করবেন।
আন্তর্জাতিক স্ট্যাবিলাইজেশন ফোর্স মোতায়েনের পরিকল্পনা
গাজার নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ট্রাম্প প্রশাসন ইন্টারন্যাশনাল স্ট্যাবিলাইজেশন ফোর্স (আইএসএফ) মোতায়েনের ঘোষণা দিয়েছে।
এই বাহিনীর দায়িত্ব হবে—
-
ফিলিস্তিনি পুলিশ বাহিনীকে প্রশিক্ষণ দেওয়া
-
নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখা
-
সন্ত্রাসমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করা
আইএসএফ-এর নেতৃত্ব দেবেন যুক্তরাষ্ট্রের মেজর জেনারেল জ্যাসপার জেফারস। বিশ্লেষকদের মতে, এই বাহিনী কার্যকর না হলে গাজার জন্য বোর্ড অব পিস গঠন কার্যত ব্যর্থ হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
গাজার মানবিক সংকট: বাস্তবতা কী বলছে
জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, গাজায় মানবিক পরিস্থিতি এখনো চরমভাবে বিপর্যস্ত। জরুরি খাদ্য, চিকিৎসা ও পানীয় জলের প্রবেশ নির্বিঘ্ন করতে বারবার আহ্বান জানানো হয়েছে।
হামাস–নিয়ন্ত্রিত গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে—
-
যুদ্ধবিরতির পরও ৪৫০ জনের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন
-
একই সময়ে ইসরায়েলের তিনজন সেনা নিহত হয়েছে
এই পরিসংখ্যান স্পষ্ট করে দিচ্ছে, কাগজে-কলমে যুদ্ধবিরতি থাকলেও বাস্তবে সহিংসতা পুরোপুরি থামেনি।
গাজা যুদ্ধের পটভূমি সংক্ষেপে
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাস ইসরায়েলে আকস্মিক হামলা চালায়। এতে শতাধিক ইসরায়েলি নিহত হন এবং ২৫১ জনকে জিম্মি করা হয়।
এর জবাবে ইসরায়েল গাজায় ব্যাপক সামরিক অভিযান শুরু করে। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দাবি অনুযায়ী, এই অভিযানে এখন পর্যন্ত ৭১ হাজার ২৬০ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন।
এই ভয়াবহ বাস্তবতার মাঝেই গাজার জন্য বোর্ড অব পিস গঠন করে নতুন পথ খুঁজতে চাইছে ট্রাম্প প্রশাসন।
আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া ও বিশ্লেষণ
আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করছেন, গাজার জন্য বোর্ড অব পিস গঠন একটি সাহসী কিন্তু ঝুঁকিপূর্ণ উদ্যোগ। কারণ—
-
হামাসের ভবিষ্যৎ ভূমিকা এখনো স্পষ্ট নয়
-
ফিলিস্তিনিদের রাজনৈতিক স্বার্থ কতটা রক্ষা পাবে, তা অনিশ্চিত
-
ইসরায়েলের দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা উদ্বেগ পুরোপুরি সমাধান হয়নি
অন্যদিকে সমর্থকদের মতে, এই উদ্যোগ ব্যর্থ হলে গাজায় আর কোনো বাস্তবসম্মত বিকল্প অবশিষ্ট থাকবে না।
গাজা সংকট নিয়ে জাতিসংঘের অবস্থান জানতে চাইলে বিস্তারিত পাওয়া যাবে United Nations-এর বিশ্লেষণে (External authoritative link anchor: গাজার জন্য বোর্ড অব পিস গঠন).
আগামী কয়েক সপ্তাহে বোর্ডের পূর্ণাঙ্গ কাঠামো ও সদস্য তালিকা প্রকাশ হলে অনেক প্রশ্নের উত্তর মিলতে পারে। একই সঙ্গে দ্বিতীয় ধাপের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন শুরু হলেই বোঝা যাবে, গাজার জন্য বোর্ড অব পিস গঠন কেবল একটি কূটনৈতিক ঘোষণা, নাকি সত্যিকারের পরিবর্তনের সূচনা।
একটি বিষয় নিশ্চিত—গাজার ভবিষ্যৎ এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি আন্তর্জাতিক সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল।




