৫ ব্যাংকের আমানতকারীরা টাকা ফেরত পাবেন বলে নিশ্চিত করেছেন গভর্নর। ২ বছরের মধ্যে টাকা ফেরত, অডিট ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিয়ে জানুন বিস্তারিত।
বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে সাম্প্রতিক সময়ে সবচেয়ে আলোচিত ইস্যু হলো—৫ ব্যাংকের আমানতকারীরা টাকা ফেরত পাবেন কি না। দীর্ঘদিন ধরে আর্থিক অনিশ্চয়তা, ব্যাংক অবলুপ্তি এবং আমানত ঝুঁকির কারণে গ্রাহকদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছিল। অবশেষে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর এই বিষয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ ও আশাব্যঞ্জক বক্তব্য দিয়েছেন।
বৃহস্পতিবার ৫টি অবলুপ্ত ব্যাংক নিয়ে আয়োজিত এক ব্রিফিংয়ে গভর্নর স্পষ্ট করে জানান, আগামী দুই বছরের মধ্যে ৫ ব্যাংকের আমানতকারীরা টাকা ফেরত পাবেন। যদিও ২০২৪–২৫ অর্থবছরের জন্য এসব ব্যাংকের আমানতকারীরা কোনো মুনাফা পাবেন না, তবে মূল টাকা ফেরত পাওয়ার বিষয়ে আশ্বাস দেওয়া হয়েছে।
এই ঘোষণাকে দেশের ব্যাংকিং খাতে একটি বড় স্বস্তির খবর হিসেবে দেখা হচ্ছে।
৫ ব্যাংকের আমানতকারীরা টাকা ফেরত পাবেন: গভর্নরের স্পষ্ট বার্তা

বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর বলেন, লোকসানের কারণে অবলুপ্ত হওয়া পাঁচটি ব্যাংকের আর্থিক অবস্থা বর্তমানে দুর্বল। ফলে স্বাভাবিকভাবেই আমানতকারীদের মুনাফা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক এবং সরকারের সমন্বিত উদ্যোগে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা হচ্ছে।
তিনি জানান,
“আমরা আশা করছি, আগামী দুই বছরের মধ্যেই ৫ ব্যাংকের আমানতকারীরা টাকা ফেরত পাবেন। এটি একটি সময়সাপেক্ষ প্রক্রিয়া হলেও আমানতকারীদের স্বার্থ সর্বোচ্চ গুরুত্ব পাচ্ছে।”
এই বক্তব্যে পরিষ্কার হয়, সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংক আমানতকারীদের পাশে থাকার অবস্থান নিয়েছে।
কেন ২০২৪–২৫ সালে মুনাফা পাবেন না আমানতকারীরা
গভর্নরের ভাষ্য অনুযায়ী, পাঁচটি ব্যাংকই দীর্ঘদিন ধরে লোকসানে ছিল। অনিয়ম, দুর্বল ব্যবস্থাপনা এবং অর্থ লুটপাটের কারণে ব্যাংকগুলোর মূলধন ভেঙে পড়ে।
এর ফলে—
-
ব্যাংকগুলোর আয় ব্যয়ের ভারসাম্য নষ্ট হয়েছে
-
আমানতের বিপরীতে মুনাফা দেওয়ার সক্ষমতা নেই
-
আর্থিক পুনর্গঠন ছাড়া টিকে থাকা সম্ভব নয়
এই বাস্তবতায়, সাময়িকভাবে মুনাফা বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
ফরেনসিক অডিটে বেরিয়ে আসছে ভয়াবহ তথ্য
বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আরও জানান, পাঁচ ব্যাংকের বিরুদ্ধে করা ফরেনসিক অডিট এখনো চলমান রয়েছে। এই অডিট শেষ হতে আরও প্রায় তিন মাস সময় লাগবে।
তিনি বলেন—
-
ভুয়া অডিটে জড়িত ব্যক্তিদের ইতোমধ্যে শনাক্ত করা হয়েছে
-
তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছে
-
কারা কীভাবে টাকা লুটপাট করেছে, তা আরও স্পষ্ট হবে
এই ফরেনসিক অডিট শেষ হলে ব্যাংকিং খাতে জবাবদিহিতা আরও জোরদার হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
ভুয়া অডিট ও লুটপাটকারীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা
গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর স্পষ্ট করে বলেন,
“যারা ভুয়া অডিট করেছে, তাদের চিহ্নিত করা হয়েছে। শাস্তির জন্য প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।”
এর মানে হলো—
-
দায়ীদের আইনের আওতায় আনা হবে
-
ভবিষ্যতে এমন অনিয়ম ঠেকাতে নজরদারি বাড়ানো হবে
-
ব্যাংকিং খাতে আস্থা পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করা হবে
এটি আমানতকারীদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ইতিবাচক বার্তা।
ব্যাংকের বোর্ডে আসছে বড় পরিবর্তন
পাঁচ ব্যাংকের বোর্ড পুনর্গঠন নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দেন গভর্নর। তিনি বলেন, ব্যাংকগুলোর পরিচালনা পর্ষদে ব্যাপক গুণগত ও সংখ্যাগত পরিবর্তন আনার প্রস্তাব মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে।
তিনি স্বীকার করেন—
-
এই পরিবর্তনে কেউ খুশি নাও হতে পারেন
-
তবে ব্যাংকিং খাতের স্বার্থে এটি জরুরি
-
দক্ষ ও সৎ নেতৃত্ব ছাড়া সংস্কার সম্ভব নয়
এই বোর্ড পরিবর্তন ভবিষ্যতে ব্যাংক পরিচালনায় স্বচ্ছতা আনবে বলে আশা করা হচ্ছে।
আমানতকারীদের জন্য কী বার্তা দিল বাংলাদেশ ব্যাংক
বর্তমান পরিস্থিতিতে আমানতকারীদের জন্য কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা স্পষ্ট—
-
৫ ব্যাংকের আমানতকারীরা টাকা ফেরত পাবেন, এটি নিশ্চিত করা হয়েছে
-
সময় লাগলেও টাকা ফেরতের প্রক্রিয়া চলমান
-
লুটপাটকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে
-
ব্যাংকিং সংস্কারে সরকার সক্রিয়
এতে করে দীর্ঘদিনের অনিশ্চয়তা কিছুটা হলেও কাটতে শুরু করেছে।
ব্যাংকিং খাতে আস্থা ফিরবে কি?
বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি—
-
ফরেনসিক অডিট সঠিকভাবে শেষ হয়
-
দায়ীদের শাস্তি নিশ্চিত করা যায়
-
নতুন বোর্ড কার্যকরভাবে কাজ করে
তাহলে ধীরে ধীরে ব্যাংকিং খাতে আস্থা ফিরবে। ৫ ব্যাংকের আমানতকারীরা টাকা ফেরত পাবেন—এই ঘোষণা সেই আস্থার প্রথম ধাপ।
আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে কীভাবে সমাধান হয় এমন সংকট
বিশ্বব্যাপী ব্যাংক সংকট মোকাবিলায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো সাধারণত—
-
ব্যাংক একীভূত করে
-
সরকারি তহবিল থেকে আমানত সুরক্ষা দেয়
-
দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়
এই বিষয়ে আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা জানতে চাইলে International Monetary Fund (IMF)–এর বিশ্লেষণ দেখা যেতে পারে।




