নির্বাচন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ করতে পুলিশ প্রস্তুত বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা। এক লাখ পুলিশ সদস্য প্রশিক্ষিত, ভোট নিরাপত্তায় নেওয়া হয়েছে কঠোর পদক্ষেপ।
নির্বাচন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ করতে পুলিশ প্রস্তুত—এই বার্তা আবারও স্পষ্ট করলেন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী। আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রস্তুতি, দায়িত্ববোধ এবং নিরপেক্ষ অবস্থান নিয়ে তিনি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা দিয়েছেন।
তিনি বলেন, অবাধ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন নিশ্চিত করতে মাঠপর্যায়ের পুলিশের ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। জনগণের আস্থা ছাড়া শুধু শক্তি প্রয়োগ করে শান্তি প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়। এ কারণেই নির্বাচন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ করতে পুলিশ প্রস্তুত রয়েছে বলে সরকার দৃঢ় অবস্থান নিয়েছে।
রোববার (১৮ জানুয়ারি) সকালে রাজশাহীর সারদা পুলিশ একাডেমিতে সহকারী পুলিশ সুপারদের সমাপনী কুচকাওয়াজ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন তিনি।
নির্বাচনকালীন নিরাপত্তায় বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত পুলিশ
নির্বাচন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ করতে পুলিশ প্রস্তুত রাখার অংশ হিসেবে প্রায় এক লাখ পুলিশ সদস্যকে বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। এই প্রশিক্ষণের মাধ্যমে ভোটকেন্দ্রের নিরাপত্তা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, জনবান্ধব আচরণ এবং জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলার সক্ষমতা বাড়ানো হয়েছে।

স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা জানান, নির্বাচনের সময় যেকোনো ধরনের সহিংসতা বা বিশৃঙ্খলা দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশকে প্রস্তুত থাকতে হবে। একই সঙ্গে ভোটারদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই হবে প্রধান লক্ষ্য।
এই প্রশিক্ষণ কর্মসূচি নির্বাচন ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
পুলিশ কোনো দলের নয়, জনগণের সেবক
বক্তব্যে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা স্পষ্টভাবে বলেন, পুলিশ কোনো রাজনৈতিক দলের রক্ষক নয়। তারা জনগণের করের টাকায় পরিচালিত রাষ্ট্রের কর্মচারী। নির্বাচন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ করতে পুলিশ প্রস্তুত থাকলেও তাদের নিরপেক্ষতা প্রশ্নবিদ্ধ হলে পুরো প্রক্রিয়াই ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
তিনি আরও বলেন, পুলিশের মূল দায়িত্ব হলো জনগণের সেবা করা এবং আইনের শাসন নিশ্চিত করা। এজন্য নির্বাচনের সময় শতভাগ নিরপেক্ষ থাকতে হবে এবং কোনো অনৈতিক সুবিধা বা আপ্যায়ন গ্রহণ করা যাবে না।
এই নির্দেশনা মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের জন্য একটি স্পষ্ট বার্তা বহন করে।
ভোটকেন্দ্রে বিশৃঙ্খলা হলে কঠোর ব্যবস্থা
নির্বাচন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ করতে পুলিশ প্রস্তুত থাকার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা। স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, ভোটকেন্দ্রে কোনো বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হলে রিটার্নিং অফিসারের পরামর্শ অনুযায়ী তা কঠোরভাবে দমন করতে হবে।
তিনি জানান, আইনের বাইরে গিয়ে কোনো কাজ করলে তার দায় ব্যক্তিগতভাবে বহন করতে হবে। একই সঙ্গে আইন মেনে দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে সরকার পুলিশকে সর্বাত্মক সহায়তা দেবে।
এই অবস্থান নির্বাচনী পরিবেশকে শান্ত ও নিয়ন্ত্রিত রাখতে সহায়ক হবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
নতুন বাংলাদেশের জন্য জনবান্ধব পুলিশ
স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা তার বক্তব্যে “নতুন বাংলাদেশ” গড়ার প্রসঙ্গও তুলে ধরেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশ পুলিশ কোনো সাধারণ বাহিনী নয়; এটি রাষ্ট্র ও জনগণের সেবক।
নির্বাচন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ করতে পুলিশ প্রস্তুত রাখার পাশাপাশি বাহিনীর ভিত্তি হতে হবে—
-
জ্ঞান
-
নৈতিকতা
-
স্বচ্ছতা
-
জবাবদিহি
-
জনবান্ধব সেবা
এই মূল্যবোধ বাস্তবায়ন করতে পারলেই জনগণের আস্থা অর্জন সম্ভব হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
নির্বাচন ব্যবস্থায় পুলিশের আচরণের গুরুত্ব
বিশেষজ্ঞদের মতে, নির্বাচন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ করতে পুলিশ প্রস্তুত থাকলেও তাদের আচরণই সবচেয়ে বড় পরীক্ষার বিষয়। ভোটারদের সঙ্গে সদাচরণ, প্রার্থীদের প্রতি সমান আচরণ এবং আইনের যথাযথ প্রয়োগই একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের ভিত্তি গড়ে দেয়।
স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার বক্তব্যে এই বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। তিনি বলেন, মাঠপর্যায়ের পুলিশের আচরণের ওপরই মানবিক মর্যাদা ও আইনের শাসন অনেকাংশে নির্ভর করে।
আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ও বাংলাদেশের নির্বাচন
আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন মানে শুধু ভোটগ্রহণ নয়, বরং পুরো প্রক্রিয়ায় নিরাপত্তা ও নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করা। নির্বাচন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ করতে পুলিশ প্রস্তুত থাকার ঘোষণাকে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরাও ইতিবাচকভাবে দেখছেন।
গণতান্ত্রিক নির্বাচন নিয়ে জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা বারবার আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিরপেক্ষ ভূমিকার ওপর জোর দিয়েছে।
এ বিষয়ে বিস্তারিত বিশ্লেষণ পাওয়া যাবে United Nations Electoral Assistance Division-এর প্রতিবেদনে
নির্বাচন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ করতে পুলিশ প্রস্তুত থাকলেও সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো জনআস্থা অর্জন। অতীত অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে পুলিশ বাহিনী যদি নিরপেক্ষ ও পেশাদার ভূমিকা রাখতে পারে, তবে নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা অনেকটাই বাড়বে।




