কানাডা-চীন বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে ট্রাম্পের মন্তব্য, ইভি আমদানি, কৃষি শুল্ক কমানো ও রাজনৈতিক ঝুঁকি—সম্পূর্ণ বিশ্লেষণ পড়ুন।
কানাডা-চীন বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে বেইজিং সফর শেষে প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি যে “ল্যান্ডমার্ক” চুক্তিতে পৌঁছেছেন, তা শুধু বাণিজ্য নয়—কানাডার পররাষ্ট্রনীতির দৃষ্টিভঙ্গিতেও বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
এই চুক্তির আওতায় চীন থেকে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বৈদ্যুতিক যান (EV) কানাডার বাজারে প্রবেশের সুযোগ পাচ্ছে। বিনিময়ে কানাডার কৃষি ও সামুদ্রিক পণ্যে চীনের আরোপিত শুল্ক বড় পরিসরে কমানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
কানাডা-চীন বাণিজ্য চুক্তির মূল শর্তগুলো কী?

এই কানাডা-চীন বাণিজ্য চুক্তির কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক রয়েছে, যা সরাসরি অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানের সঙ্গে যুক্ত।
চুক্তি অনুযায়ী—
-
চীন থেকে ৪৯,০০০ পর্যন্ত বৈদ্যুতিক যান (EV) কানাডার বাজারে প্রবেশের অনুমতি
-
কানাডীয় ক্যানোলা বীজের ওপর শুল্ক ১৫ শতাংশে নামিয়ে আনা
-
ক্যানোলা মিল, লবস্টার, কাঁকড়া ও মটরশুঁটির ওপর শুল্ক প্রত্যাহার
-
শুল্ক ছাড় কার্যকর থাকবে ২০২৬ সালের শেষ পর্যন্ত
এই সিদ্ধান্তে পশ্চিম কানাডার কৃষিখাত স্বস্তি পেলেও অন্টারিওর অটো শিল্পে উদ্বেগ বেড়েছে।
ট্রাম্পের প্রতিক্রিয়া: “চীন যদি চুক্তি করে, সেটা করতেই পারে”
যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই কানাডা-চীন বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে তুলনামূলকভাবে শান্ত প্রতিক্রিয়া দিয়েছেন।
ট্রাম্প বলেন,
“আপনি যদি চীনের সঙ্গে একটি চুক্তি করতে পারেন, তাহলে সেটাই করা উচিত।”
যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধিরা এই চুক্তিকে “সমস্যাজনক” বলছেন, সেখানে ট্রাম্পের এই মন্তব্য কানাডার জন্য কূটনৈতিকভাবে কিছুটা স্বস্তির।
মার্ক কার্নির ‘Value-Based Realism’ নীতি
বেইজিংয়ে সংবাদ সম্মেলনে মার্ক কার্নি স্পষ্ট করেন, কানাডা এখন বাস্তবতাভিত্তিক পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করছে।
তিনি বলেন,
“আমরা পৃথিবীকে যেমন আছে, তেমনভাবেই দেখি—যেমনটা চাই, তেমনটা নয়।”
এই বক্তব্য থেকেই বোঝা যায়, কানাডা মানবাধিকার ও গণতন্ত্রের প্রশ্নে অবস্থান বজায় রাখলেও অর্থনৈতিক স্বার্থে বাস্তব সিদ্ধান্ত নিতে প্রস্তুত।
কানাডা-চীন বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে অভ্যন্তরীণ বিভক্ত প্রতিক্রিয়া
অন্টারিওর উদ্বেগ
অন্টারিওর প্রিমিয়ার ডাগ ফোর্ড এই চুক্তির কড়া সমালোচনা করেছেন। তার মতে,
চীনা ইভি কানাডার অটো শিল্পের জন্য হুমকি এবং এটি “কানাডীয় কর্মীদের ক্ষতির বিনিময়ে” চীনের বাজার দখলের সুযোগ তৈরি করবে।
তিনি চীনা গাড়িকে “ভর্তুকিপ্রাপ্ত স্পাই কার” বলেও উল্লেখ করেন।
পশ্চিম কানাডার স্বস্তি
অন্যদিকে, ম্যানিটোবা ও সাসকাচোয়ানের কৃষকরা এই কানাডা-চীন বাণিজ্য চুক্তিকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন।
ক্যানোলা উৎপাদক মার্ক রেইমার বলেন,
এই সিদ্ধান্ত কৃষকদের আগামী মৌসুমে কী বপন করবেন, সে বিষয়ে আস্থার জায়গা তৈরি করেছে।
চীনা ইভি ও জাতীয় নিরাপত্তা বিতর্ক
এই চুক্তির সবচেয়ে বিতর্কিত অংশ হলো চীনা বৈদ্যুতিক যান আমদানি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন—
-
আধুনিক ইভিতে ডাটা সংগ্রহ ও এআই সফটওয়্যার ব্যবহারের ঝুঁকি রয়েছে
-
জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে লোকাল অ্যাসেম্বলি ও সফটওয়্যার নিয়ন্ত্রণ জরুরি
ওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক আন্দ্রেয়াস স্কটার মনে করেন,
এই ঝুঁকি প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।
কানাডা-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের ওপর প্রভাব
এই কানাডা-চীন বাণিজ্য চুক্তি কানাডা-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের ক্ষেত্রেও প্রশ্ন তুলেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে—
-
এটি CUSMA চুক্তি নবায়নে প্রভাব ফেলতে পারে
-
তবে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে অনিশ্চয়তা বাড়ায় কানাডা বিকল্প অংশীদার খুঁজছে
বিজনেস কাউন্সিল অব কানাডা সতর্ক করে বলেছে,
“উত্তর আমেরিকার সঙ্গে সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত না করে ভারসাম্য বজায় রাখা জরুরি।”
বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে চীনের কৌশল
চীন এই কানাডা-চীন বাণিজ্য চুক্তিকে বৈশ্বিক কূটনীতিতে বড় অর্জন হিসেবে দেখছে।
বিশ্লেষকদের মতে—
-
বেইজিং নিজেকে স্থিতিশীল ও নির্ভরযোগ্য অংশীদার হিসেবে তুলে ধরতে চাইছে
-
অন্যান্য দেশকেও চীনের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদারে উৎসাহ দিচ্ছে
চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং বলেন,
এই সম্পর্ক বিশ্ব শান্তি ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতায় ভূমিকা রাখবে।
কানাডার অর্থনীতির জন্য ঝুঁকি না সুযোগ?
এই কানাডা-চীন বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে অর্থনীতিবিদদের মত বিভক্ত।
কেউ বলছেন—
-
এটি কৃষি ও নিম্নআয়ের ভোক্তাদের জন্য সুযোগ
-
সাশ্রয়ী ইভি বাজার সম্প্রসারিত হবে
অন্যরা বলছেন—
-
অটো শিল্প ও কর্মসংস্থানে দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি রয়েছে
ওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক লরা স্টিফেনসনের মতে,
এই সিদ্ধান্ত না পুরোপুরি সঠিক, না পুরোপুরি ভুল—এটি একটি “গণনাকৃত ঝুঁকি”।
মানবাধিকার প্রশ্নে চাপ অব্যাহত
কানাডা-চীন বাণিজ্য চুক্তি হলেও মানবাধিকার ইস্যু আলোচনার বাইরে যায়নি।
বিশেষ করে—
-
হংকংয়ের গণতন্ত্রপন্থী নেতা জিমি লাইয়ের কারাবাস
-
চীনে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা
কার্নি জানিয়েছেন, মানবাধিকার প্রসঙ্গ আলোচনায় এসেছে, তবে কূটনৈতিক সীমাবদ্ধতার মধ্যেই।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন—
-
চুক্তির বাস্তব প্রভাব বোঝা যাবে সময়ের সঙ্গে
-
যুক্তরাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ প্রতিক্রিয়া গুরুত্বপূর্ণ হবে
-
চীন কানাডায় বিনিয়োগ বাড়াতে পারে
সব মিলিয়ে, কানাডা এখন এমন এক পথে হাঁটছে যেখানে লাভ ও ঝুঁকি—দুটিই সমানভাবে বিদ্যমান।



