‘নতুন বাংলাদেশ’ এর রূপরেখা তুলে ধরলেন জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমান তুলে ধরেছেন। ইনসাফ, দুর্নীতি দমন ও নারীর অংশগ্রহণে ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন ঘিরে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা।
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে দেশের রাজনীতিতে নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে নতুন বাংলাদেশ রূপরেখা জামায়াত আমির–এর ঘোষিত দৃষ্টিভঙ্গি। মঙ্গলবার ঢাকায় আয়োজিত পলিসি সামিট–২০২৬ অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে বিস্তারিত রূপরেখা তুলে ধরেন।
তার বক্তব্যে স্পষ্টভাবে উঠে আসে—দেশের প্রধান চ্যালেঞ্জ এখন কেবল টিকে থাকা নয়, বরং স্থিতিশীলতা, ইনসাফ ও মর্যাদাভিত্তিক রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তোলা। তিনি বলেন, নতুন বাংলাদেশ হবে দুর্নীতিমুক্ত, অংশগ্রহণমূলক এবং মানবিক মর্যাদার ওপর প্রতিষ্ঠিত।
এই বক্তব্যকে ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গনে যেমন আলোচনা তৈরি হয়েছে, তেমনি সাধারণ মানুষের মাঝেও তৈরি হয়েছে নতুন প্রত্যাশা।
পলিসি সামিট–২০২৬: রাজনৈতিক বার্তার নতুন মঞ্চ
রাজধানীতে অনুষ্ঠিত এই পলিসি সামিটে কূটনৈতিক প্রতিনিধি, রাজনৈতিক নেতা, শিক্ষাবিদ, শিল্পোদ্যোক্তা, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি ও সাংবাদিকরা উপস্থিত ছিলেন। এমন একটি বহুপক্ষীয় উপস্থিতির মধ্যেই নতুন বাংলাদেশ রূপরেখা জামায়াত আমির উপস্থাপন করেন তার দলের ভবিষ্যৎ ভাবনা।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাস একটি অসমাপ্ত সংগ্রামের ইতিহাস। ১৯৪৭ সালে ঔপনিবেশিক শাসন থেকে মুক্তি এবং ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধ—এই দুই ঐতিহাসিক অধ্যায়ের মূল লক্ষ্য ছিল সামাজিক ন্যায়বিচার ও অর্থনৈতিক মুক্তি।
কিন্তু পাঁচ দশকের বেশি সময় পার হলেও সেই লক্ষ্য পুরোপুরি অর্জিত হয়নি বলে মন্তব্য করেন তিনি।
গণতন্ত্র ও শাসনব্যবস্থার ব্যর্থতা নিয়ে কঠোর সমালোচনা
জামায়াত আমিরের বক্তব্যে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক বাস্তবতা নিয়ে কঠোর সমালোচনাও উঠে আসে। তিনি বলেন, গত ১৭ বছরে শাসনব্যবস্থার ব্যর্থতা ও কর্তৃত্ববাদী চর্চার কারণে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান দুর্বল হয়ে পড়েছে।
তার ভাষায়—
“জবাবদিহি কমেছে, নাগরিকদের কণ্ঠস্বর সংকুচিত হয়েছে।”
তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, ২০২৪ সালের জুলাই মাসে তরুণ সমাজ আবারও নিজেদের অধিকার ও ভবিষ্যৎ পুনরুদ্ধারের দাবিতে রাজপথে দাঁড়িয়েছিল। এই আন্দোলন নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার ইঙ্গিত দেয় বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
ফ্যাসিবাদ-পরবর্তী সন্ধিক্ষণ ও নতুন চ্যালেঞ্জ
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ফ্যাসিবাদী শাসনের একটি অন্ধকার অধ্যায় পার করে বাংলাদেশ এখন গণতান্ত্রিক রূপান্তরের এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে।
তবে এই পথ মোটেও সহজ নয়। সামনে এখনও বড় বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে—বিশেষ করে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠন, আইনের শাসন নিশ্চিত করা এবং জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনা।
এই প্রেক্ষাপটে নতুন বাংলাদেশ রূপরেখা জামায়াত আমির–এর বক্তব্য একটি রাজনৈতিক দিকনির্দেশনা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
নতুন বাংলাদেশ রূপরেখা জামায়াত আমির: অর্থনীতির বাস্তব চিত্র

অর্থনৈতিক প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে প্রবৃদ্ধি হলেও কর্মসংস্থানের মান কমে গেছে। বেকারত্ব ও মূল্যস্ফীতি মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলছে।
তার মতে—
-
অধিকাংশ মানুষ অনানুষ্ঠানিক ও অনিরাপদ কাজে যুক্ত
-
আয় কম, ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত
-
মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তের ওপর চাপ বাড়ছে
বিশেষ করে তরুণ শিক্ষিতদের শিক্ষা থেকে কর্মসংস্থানে রূপান্তর ঘটাতে না পারাকে তিনি বড় ব্যর্থতা হিসেবে উল্লেখ করেন।
নারীর অংশগ্রহণ ছাড়া টেকসই উন্নয়ন অসম্ভব
নারীদের ভূমিকা নিয়ে বক্তব্যে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, নারীদের পূর্ণ অংশগ্রহণ ছাড়া কোনো উন্নয়নই টেকসই হতে পারে না।
তিনি জোর দিয়ে বলেন—
-
এটি শুধু ন্যায়ের প্রশ্ন নয়
-
এটি অর্থনৈতিক প্রয়োজন
-
রাষ্ট্রের সামগ্রিক সক্ষমতার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত
সরকারি ও বেসরকারি খাতে নারীদের অংশগ্রহণ বাড়াতে কাঠামোগত বাধা দূর করার কথাও বলেন তিনি।
প্রবাসী ও শ্রমজীবী মানুষের অবদান
বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ হিসেবে জনগণের কথা উল্লেখ করেন জামায়াত আমির। দেশের ভেতরের শ্রমজীবী মানুষ এবং বিদেশে কর্মরত প্রবাসীরা অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি বলে মন্তব্য করেন তিনি।
প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্সকে তিনি কেবল আর্থিক অবদান নয়, বরং দক্ষতা ও বৈশ্বিক অভিজ্ঞতার বড় উৎস হিসেবে বর্ণনা করেন।
এ বিষয়ে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত বিশ্লেষণ পাওয়া যায় World Bank–এর গবেষণায়, যেখানে বলা হয়েছে রেমিট্যান্স উন্নয়নশীল দেশের অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা আনে।
দুর্নীতির বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতার অঙ্গীকার
সুশাসনের প্রশ্নে ডা. শফিকুর রহমান স্পষ্টভাবে বলেন, নতুন বাংলাদেশে দুর্নীতির বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতা নীতি বাস্তবায়ন করা হবে।
তিনি দাবি করেন, অতীতে জামায়াতের নেতৃত্বে পরিচালিত মন্ত্রণালয়গুলোতে দুর্নীতিমুক্ত ও দক্ষ প্রশাসনের নজির রয়েছে।
এই বক্তব্য নির্বাচনি রাজনীতিতে দুর্নীতি প্রশ্নে নতুন বিতর্ক তৈরি করেছে।
অংশীদারিত্বের রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক
রাষ্ট্র ও নাগরিক, সরকারি ও বেসরকারি খাত এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে অংশীদারিত্বের ওপর গুরুত্ব দেন জামায়াত আমির।
তার মতে—
-
এককভাবে রাষ্ট্র এগোতে পারে না
-
অংশীদারিত্বই ভবিষ্যৎ উন্নয়নের চাবিকাঠি
-
কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও বাস্তবভিত্তিক হতে হবে
এই অবস্থান নতুন বাংলাদেশের বৈশ্বিক সংযোগকে গুরুত্ব দেওয়ার ইঙ্গিত দেয়।
বক্তব্যের শেষাংশে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ইনসাফ, মর্যাদা ও সমৃদ্ধির ভিত্তিতে একটি নতুন বাংলাদেশ গড়াই তাদের লক্ষ্য।
তিনি বলেন, জুলাইয়ের শহীদদের আত্মত্যাগ বৃথা যাবে না। অনুষ্ঠানে উপস্থিত বক্তা, প্যানেলিস্ট ও বিশেষজ্ঞদের ধন্যবাদ জানিয়ে তিনি বক্তব্য শেষ করেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নতুন বাংলাদেশ রূপরেখা জামায়াত আমির–এর এই বক্তব্য আসন্ন নির্বাচনে দলটির কৌশল ও দৃষ্টিভঙ্গির স্পষ্ট প্রতিফলন।




