করাচির শপিং মলে আগুনে ভয়াবহ বিপর্যয়। মৃত বেড়ে ২৩, নিখোঁজ ৩৮। উদ্ধার অভিযান চলছে, নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
করাচির শপিং মলে আগুন—এই ভয়াবহ ঘটনায় পাকিস্তানের বৃহত্তম শহর করাচি এখনো আতঙ্কে। শনিবার রাতে এম এ জিন্না রোডে অবস্থিত গুল প্লাজায় অগ্নিকাণ্ডের পর থেকে উদ্ধার অভিযান অব্যাহত রয়েছে। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, এই ঘটনায় মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৩ জনে, আর এখনো ৩৮ জন নিখোঁজ রয়েছেন।
স্থানীয় প্রশাসন ও উদ্ধারকারী সংস্থাগুলো বলছে, পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনতে সময় লাগছে। ধসে পড়া অংশ ও বেসমেন্টে জমে থাকা ধোঁয়া উদ্ধারকাজকে কঠিন করে তুলেছে।
কীভাবে ছড়িয়ে পড়ে করাচির শপিং মলে আগুন
প্রাথমিকভাবে জানা গেছে, শনিবার গভীর রাতে চারতলা গুল প্লাজার ভেতর হঠাৎ আগুন ছড়িয়ে পড়ে। মলটিতে থাকা প্লাস্টিক, ফোম, কাপড় ও পারফিউমের মতো দাহ্য উপাদান আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে সহায়তা করে।
প্রায় ২৪ ঘণ্টার বেশি সময়ের চেষ্টার পর রোববার আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়। তবে পরে আবর্জনার ভেতর থেকে আবার আগুনের সূত্রপাত হলে সোমবার দমকল বাহিনীকে নতুন করে অভিযান চালাতে হয়। এতে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে।
গুল প্লাজার অবস্থা: ধস ও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি

আগুনের ফলে গুল প্লাজার একটি বড় অংশ ধসে পড়েছে। এই শপিং মলটিতে প্রায় ১ হাজার ২০০টি দোকান ছিল। অধিকাংশ দোকানই সম্পূর্ণ পুড়ে গেছে।
মেয়র মুর্তজা ওয়াহাব জানান, ভবনের ছাদ পরিষ্কার করতে ভারী যন্ত্রপাতি আনা হয়েছে। ছাদে পার্ক করা গাড়িগুলোও ক্রেনের মাধ্যমে সরানো হচ্ছে। ধ্বংসস্তূপ সরাতে গিয়ে উদ্ধারকারীরা এখনো মরদেহ ও দেহাংশ খুঁজে পাচ্ছেন।
উদ্ধার অভিযান ও নিখোঁজদের সন্ধান
করাচি জেলা প্রশাসন, জরুরি সেবা সংস্থা এবং করাচি মেট্রোপলিটন কর্পোরেশনের যৌথ প্রচেষ্টায় উদ্ধার অভিযান চলছে। বর্তমানে উদ্ধারকারী দলগুলো গুল প্লাজার বেসমেন্টে তল্লাশি চালাচ্ছে।
করাচি দক্ষিণ জেলার পুলিশের উপ-মহাপরিদর্শক সৈয়দ আসাদ রেজা জানিয়েছেন, এখন পর্যন্ত আবর্জনার ভেতর থেকে ২৩টি মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। তবে অনেক ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ দেহ পাওয়া যায়নি।
ডিএনএ পরীক্ষার প্রয়োজন কেন
উদ্ধারকারী সংস্থা ১১২২-এর প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা আবিদ জালাল বলেন, বিভিন্ন জায়গা থেকে পাওয়া দেহাংশ একই ব্যক্তির নাকি আলাদা মানুষের—তা নিশ্চিত করতে ফরেনসিক ও ডিএনএ পরীক্ষা প্রয়োজন।
এই কারণেই মোট মৃত্যুর সংখ্যা এখনই চূড়ান্তভাবে বলা সম্ভব হচ্ছে না। বিষয়টি করাচির শপিং মলে আগুনের ভয়াবহতা আরও স্পষ্ট করে তুলছে।
প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনায় ভয়াবহ অভিজ্ঞতা
গুল প্লাজার ‘জাইন’ নামের এক দোকানের মালিক জানান, আগুন লাগার সময় মলের ভেতরে কয়েকশ মানুষ ছিলেন।
তিনি বলেন,
“আমাদের চোখের সামনেই দোকানগুলো পুড়ে গেল। মালপত্র বের করার সুযোগই পাইনি। কয়েকজন বন্ধুর এখনো কোনো খোঁজ নেই।”
একজন পথচারী জানান, দোকান মালিকেরা ফায়ার এক্সটিংগুইশার দিয়ে আগুন নেভানোর চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু আগুনের তীব্রতা এত বেশি ছিল যে নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হয়নি।
আহত ও ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর অবস্থা
অনেক মানুষ গুরুতর আহত অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি আছেন। তাদের অনেকের শ্বাসকষ্ট ও দগ্ধ হওয়ার সমস্যা দেখা দিয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো এখন চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছে।
মেয়র মুর্তজা ওয়াহাব বলেন, নিখোঁজ সবাইকে উদ্ধার না করা পর্যন্ত অভিযান বন্ধ করা হবে না। একই সঙ্গে কেএমসির সব বিভাগ সর্বোচ্চ সতর্কতায় রাখা হয়েছে।
রাষ্ট্রপতির শোক ও নির্দেশনা
করাচির শপিং মলে আগুন ঘটনায় শোক প্রকাশ করেছেন পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আসিফ আলি জারদারি। তিনি সিন্ধু প্রদেশ সরকারকে নির্দেশ দিয়েছেন—
-
সব বাণিজ্যিক ভবনের অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা পর্যালোচনা করতে
-
পুরনো ভবনগুলোর ঝুঁকি মূল্যায়ন করতে
-
নিয়মিত ফায়ার সেফটি অডিট নিশ্চিত করতে
এই নির্দেশনাকে অনেকেই ভবিষ্যতে বড় দুর্ঘটনা রোধের গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন।
অগ্নিনিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন
এই দুর্ঘটনার পর করাচির অন্যান্য শপিং মল ও বাণিজ্যিক ভবনের অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন—
-
জরুরি নির্গমন পথ কার্যকর ছিল না
-
পর্যাপ্ত ফায়ার অ্যালার্ম ছিল না
-
নিয়মিত নিরাপত্তা মহড়া হয়নি
এই বিষয়গুলো করাচির শপিং মলে আগুনকে আরও প্রাণঘাতী করে তুলেছে।
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের নজর
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমেও করাচির শপিং মলে আগুনের খবর গুরুত্ব পাচ্ছে। পাকিস্তানের প্রভাবশালী দৈনিক Dawn বিস্তারিতভাবে এই ঘটনার আপডেট প্রকাশ করছে।
করাচির শপিং মলে আগুন শুধু একটি দুর্ঘটনা নয়, এটি নগর নিরাপত্তা ব্যবস্থার বড় দুর্বলতাও তুলে ধরেছে। উদ্ধার অভিযান শেষ না হওয়া পর্যন্ত প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতির চিত্র স্পষ্ট হবে না। তবে এই ঘটনায় ভবিষ্যতে অগ্নিনিরাপত্তা জোরদারের দাবি আরও জোরালো হয়ে উঠবে—এটাই বাস্তবতা।




