গ্রিনল্যান্ডে ডেনমার্কের সেনা মোতায়েন নতুন করে উত্তেজনা বাড়িয়েছে। ট্রাম্পের হুমকির প্রেক্ষাপটে ৫৮ সেনা পাঠিয়ে কঠোর বার্তা দিল কোপেনহেগেন।
গ্রিনল্যান্ডে ডেনমার্কের সেনা মোতায়েন আবারও আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে আলোচনার কেন্দ্রে চলে এসেছে। স্বশাসিত ডেনিশ ভূখণ্ড গ্রিনল্যান্ডকে নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার বিষয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রকাশ্য হুমকির মধ্যেই ডেনমার্ক এই সিদ্ধান্ত নেয়। ফলে আর্কটিক অঞ্চলজুড়ে কূটনৈতিক ও সামরিক উত্তেজনা স্পষ্টভাবে বেড়েছে।
সোমবার সন্ধ্যায় রয়্যাল ডেনিশ সেনাবাহিনীর প্রধান পিটার বয়েসেনের নেতৃত্বে একটি উল্লেখযোগ্য সেনাদল পশ্চিম গ্রিনল্যান্ডের কাঙ্গারলুসুয়াকে অবতরণ করে। এই মোতায়েন শুধু প্রতীকী নয়, বরং আর্কটিক অঞ্চলে ডেনমার্কের অবস্থান ও সার্বভৌমত্বের প্রতি স্পষ্ট বার্তা হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
কীভাবে হলো গ্রিনল্যান্ডে ডেনমার্কের সেনা মোতায়েন

ডেনিশ পাবলিক ব্রডকাস্টার টিভি২ জানিয়েছে, সর্বশেষ ধাপে ৫৮ জন ডেনিশ সেনা গ্রিনল্যান্ডে পৌঁছেছেন। তারা বহুজাতিক সামরিক মহড়া “অপারেশন আর্কটিক এন্ডুরেন্স”-এ অংশ নেবেন। এর আগে সেখানে পাঠানো প্রায় ৬০ জন সেনার সঙ্গে তারা যোগ দিয়েছেন।
এই মহড়ার লক্ষ্য মূলত আর্কটিক অঞ্চলে সামরিক প্রস্তুতি, নজরদারি সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং মিত্র দেশগুলোর মধ্যে সমন্বয় জোরদার করা। তবে বর্তমান ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় এই মহড়ার তাৎপর্য অনেক গভীর।
ট্রাম্পের হুমকি ও ডেনমার্কের অবস্থান
গ্রিনল্যান্ড নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আগ্রহ নতুন নয়। তিনি একাধিকবার গ্রিনল্যান্ডকে যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে আনার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন। এই প্রস্তাবকে ডেনমার্ক সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে।
ডেনমার্ক পরিষ্কারভাবে জানিয়েছে, গ্রিনল্যান্ড বিক্রির জন্য নয়। দেশটির নেতারা সতর্ক করে বলেছেন, জোরপূর্বক দ্বীপ দখলের যেকোনো প্রচেষ্টা ন্যাটোর জন্য ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে। কারণ ন্যাটোর ৩২ সদস্য দেশের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ডেনমার্ক উভয়ই গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার।
এই প্রেক্ষাপটে গ্রিনল্যান্ডে ডেনমার্কের সেনা মোতায়েনকে অনেক বিশ্লেষক রাজনৈতিক ও সামরিক বার্তা হিসেবে দেখছেন।
কেন গ্রিনল্যান্ড এত গুরুত্বপূর্ণ
গ্রিনল্যান্ড শুধু একটি দ্বীপ নয়, এটি আর্কটিক অঞ্চলের কৌশলগত কেন্দ্রবিন্দু। এখানে রয়েছে—
-
গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ও বিমানঘাঁটি
-
আর্কটিক শিপিং রুটের নিয়ন্ত্রণ
-
বিপুল প্রাকৃতিক সম্পদের সম্ভাবনা
-
রাশিয়া ও চীনের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণের সুবিধা
এই কারণেই যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ এবং ন্যাটোর কাছে গ্রিনল্যান্ডের গুরুত্ব দিন দিন বাড়ছে। গ্রিনল্যান্ডে ডেনমার্কের সেনা মোতায়েন মূলত এই কৌশলগত অবস্থান রক্ষার অংশ।
ন্যাটো ও ইউরোপীয় সম্পর্কের ওপর প্রভাব
ট্রাম্পের জেদ এবং গ্রিনল্যান্ড ইস্যু ইতোমধ্যে মার্কিন-ইউরোপীয় সম্পর্ককে কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে নাজুক অবস্থায় নিয়ে গেছে। অনেক ইউরোপীয় দেশ আশঙ্কা করছে, এ ধরনের বক্তব্য ও চাপ ন্যাটোর ঐক্য দুর্বল করতে পারে।
ডেনমার্ক স্পষ্টভাবে বলেছে, তারা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সহযোগিতা চায়, কিন্তু সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে কোনো আপস নয়। তাই গ্রিনল্যান্ডে ডেনমার্কের সেনা মোতায়েনকে ন্যাটোর ভেতরে শক্ত অবস্থান নেওয়ার কৌশল হিসেবেও ব্যাখ্যা করা হচ্ছে।
আর্কটিক অঞ্চলে সামরিক তৎপরতা কেন বাড়ছে
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আর্কটিক অঞ্চল বৈশ্বিক শক্তিগুলোর নতুন প্রতিযোগিতার মঞ্চে পরিণত হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বরফ গলে নতুন সমুদ্রপথ খুলে যাচ্ছে। একই সঙ্গে প্রাকৃতিক সম্পদের প্রতি আগ্রহ বাড়ছে।
এই বাস্তবতায় ডেনমার্ক, যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া এবং চীন সবাই আর্কটিকে নিজেদের উপস্থিতি বাড়াচ্ছে। গ্রিনল্যান্ডে ডেনমার্কের সেনা মোতায়েন সেই বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক চিত্রেরই অংশ।
গ্রিনল্যান্ডের স্থানীয় প্রতিক্রিয়া
গ্রিনল্যান্ড স্বশাসিত হলেও প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্রনীতি ডেনমার্কের হাতে। স্থানীয় রাজনীতিকরা সাধারণত শান্তিপূর্ণ অবস্থান বজায় রাখার পক্ষে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার আলোচনা গ্রিনল্যান্ডবাসীর মধ্যেও উদ্বেগ তৈরি করেছে।
অনেক স্থানীয় নেতা বলছেন, দ্বীপের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে গ্রিনল্যান্ডের জনগণ, কোনো বাইরের শক্তি নয়। এই অবস্থানে ডেনমার্কের সাম্প্রতিক সেনা মোতায়েনকে তারা নিরাপত্তা নিশ্চয়তা হিসেবেই দেখছেন।
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের দৃষ্টিভঙ্গি
আল জাজিরাসহ আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, গ্রিনল্যান্ডে ডেনমার্কের সেনা মোতায়েন কেবল একটি সামরিক সিদ্ধান্ত নয়, বরং একটি স্পষ্ট কূটনৈতিক বার্তা। এটি দেখাচ্ছে যে ডেনমার্ক আর্কটিক অঞ্চলে নিজের দায়িত্ব ও অধিকার নিয়ে আপসহীন।
সামনে কী হতে পারে
বিশ্লেষকদের মতে, স্বল্পমেয়াদে এই সেনা মোতায়েন উত্তেজনা বাড়ালেও বড় ধরনের সামরিক সংঘাতের সম্ভাবনা কম। তবে কূটনৈতিক চাপ এবং ন্যাটোর অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে এর প্রভাব দীর্ঘমেয়াদি হতে পারে।
ডেনমার্ক চাইছে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সহযোগিতা বজায় রাখতে, আবার একই সঙ্গে গ্রিনল্যান্ডের ওপর নিজের অধিকারও স্পষ্ট করতে। এই ভারসাম্য রক্ষা করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
সব মিলিয়ে বলা যায়, গ্রিনল্যান্ডে ডেনমার্কের সেনা মোতায়েন আর্কটিক অঞ্চলের নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে নতুন করে আলোচনায় এনেছে। ট্রাম্পের হুমকি, ন্যাটোর ভবিষ্যৎ এবং ইউরোপ-আমেরিকার সম্পর্ক—সবকিছু মিলিয়ে এই পদক্ষেপের গুরুত্ব অনেক গভীর।
আগামী দিনগুলোতে এই ইস্যু কীভাবে মোড় নেয়, তা নজরে রাখবে পুরো বিশ্ব।




