ট্রাম্পের শুল্ক হুমকির বিরুদ্ধে কানাডা, যুক্তরাষ্ট্রের নতুন ট্যারিফের বিরুদ্ধে কড়া অবস্থান নিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি। ডাভোসে তাঁর স্পষ্ট বার্তা।
কানাডা গ্রিনল্যান্ড শুল্ক বিরোধিতা ইস্যুটি এখন আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার কেন্দ্রে। যুক্তরাষ্ট্রের নতুন শুল্ক আরোপের ঘোষণার পর বিশ্ব অর্থনীতি ও কূটনীতিতে তৈরি হয়েছে নতুন চাপ। এই প্রেক্ষাপটে কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি স্পষ্ট ভাষায় যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানের বিরোধিতা করেছেন।
সুইজারল্যান্ডের ডাভোসে অনুষ্ঠিত ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের (WEF) ৫৬তম বার্ষিক সম্মেলনে তিনি বলেন, গ্রিনল্যান্ড ইস্যুকে কেন্দ্র করে শুল্ক আরোপ কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। তাঁর বক্তব্যে আর্কটিক নিরাপত্তা, সার্বভৌমত্ব এবং বৈশ্বিক নিয়মভিত্তিক ব্যবস্থার গুরুত্ব স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
ডাভোসে কার্নির স্পষ্ট বার্তা

ডাভোস সম্মেলনে বক্তব্য রাখতে গিয়ে মার্ক কার্নি বলেন, কানাডা গ্রিনল্যান্ড শুল্ক বিরোধিতা করে এবং এই বিষয়ে আলোচনার মাধ্যমে সমাধান চায়। তাঁর মতে, আর্কটিক অঞ্চলে নিরাপত্তা ও সমৃদ্ধি নিশ্চিত করতে সহযোগিতামূলক আলোচনা সবচেয়ে কার্যকর পথ।
তিনি জোর দিয়ে বলেন, শুল্ক আরোপ করে চাপ সৃষ্টি করলে দীর্ঘমেয়াদে কূটনৈতিক সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বরং নিয়মভিত্তিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার মধ্যেই সমাধান খুঁজতে হবে।
গ্রিনল্যান্ড নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক সিদ্ধান্ত
যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইউরোপীয় মিত্রদের বিরুদ্ধে শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেন। কারণ হিসেবে তিনি গ্রিনল্যান্ড অধিগ্রহণে বিরোধিতার কথা উল্লেখ করেন। গ্রিনল্যান্ড বর্তমানে ডেনমার্কের স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল।
এই সিদ্ধান্ত ইউরোপীয় দেশগুলোর পাশাপাশি কানাডার মধ্যেও উদ্বেগ তৈরি করেছে। কারণ আর্কটিক অঞ্চলের স্থিতিশীলতা কানাডার জাতীয় নিরাপত্তা ও অর্থনীতির সঙ্গে সরাসরি জড়িত।
ডেনমার্কের সার্বভৌমত্বে কানাডার সমর্থন
মার্ক কার্নি স্পষ্টভাবে ডেনমার্কের সার্বভৌমত্বের পক্ষে অবস্থান নেন। তিনি বলেন, গ্রিনল্যান্ড ডেনমার্কের অংশ এবং এই বাস্তবতা সম্মান করা জরুরি।
কানাডা গ্রিনল্যান্ড শুল্ক বিরোধিতা করার মাধ্যমে মূলত আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি তাদের প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেছে। এতে করে ইউরোপীয় মিত্রদের সঙ্গে কানাডার সম্পর্ক আরও দৃঢ় হওয়ার ইঙ্গিত পাওয়া যায়।
আর্কটিক অঞ্চলে নিরাপত্তা ও সমৃদ্ধির প্রশ্ন
আর্কটিক অঞ্চল শুধু ভূরাজনৈতিক নয়, অর্থনৈতিক দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ। এখানে রয়েছে বিপুল প্রাকৃতিক সম্পদ, সম্ভাবনাময় নৌপথ এবং কৌশলগত সামরিক গুরুত্ব।
কার্নি বলেন, নিরাপত্তা ও সমৃদ্ধির লক্ষ্যে সহযোগিতা ছাড়া বিকল্প নেই। শুল্ক আরোপ করলে সেই লক্ষ্য ব্যাহত হয়।
যুক্তরাষ্ট্র-কানাডা সম্পর্কে নতুন চাপ
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কানাডার সম্পর্ক ঐতিহাসিকভাবে ঘনিষ্ঠ। তবে সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো সেই সম্পর্কে চাপ সৃষ্টি করছে। বিশেষ করে ট্রাম্পের অতীতে কানাডা দখলের হুমকি এবং সাম্প্রতিক AI-নির্মিত মানচিত্র প্রকাশ বিষয়টিকে আরও সংবেদনশীল করেছে।
এই পরিস্থিতিতে কানাডা গ্রিনল্যান্ড শুল্ক বিরোধিতা করে নিজের অবস্থান পরিষ্কার করেছে। কার্নি সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের নাম উল্লেখ না করলেও তাঁর বক্তব্যে বার্তাটি স্পষ্ট।
নিয়মভিত্তিক বিশ্বব্যবস্থার গুরুত্ব
ডাভোসে কার্নি বলেন, যদি শক্তিধর রাষ্ট্রগুলো নিয়ম ও মূল্যবোধ উপেক্ষা করে কেবল নিজেদের স্বার্থে কাজ করে, তাহলে বৈশ্বিক সহযোগিতা দুর্বল হয়ে পড়বে।
এই মন্তব্য আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও কূটনীতিতে গভীর তাৎপর্য বহন করে। কানাডা এখানে নিজেকে নিয়মভিত্তিক ব্যবস্থার পক্ষের দেশ হিসেবে তুলে ধরেছে।
চীনের সঙ্গে কানাডার সম্পর্ক ও নতুন সুযোগ
কার্নি সম্প্রতি চীনের সঙ্গে একটি বাণিজ্যিক সমঝোতা করেন। তিনি বলেন, সেই সম্পর্কে স্পষ্ট সীমারেখা রয়েছে। তবে সেই সীমার মধ্যেই রয়েছে বিশাল সম্ভাবনা।
জ্বালানি, কৃষি, আর্থিক সেবা—সব ক্ষেত্রেই পারস্পরিক লাভের সুযোগ দেখছে কানাডা। এটি প্রমাণ করে যে কানাডা গ্রিনল্যান্ড শুল্ক বিরোধিতা করলেও তারা বৈশ্বিক বাণিজ্য থেকে পিছিয়ে যাচ্ছে না।
বহুপাক্ষিক কূটনীতির পথে কানাডা
কার্নির ভাষায়, কানাডার লক্ষ্য হলো “ওয়েব অব কানেকশনস” তৈরি করা। অর্থাৎ একাধিক দেশের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলা।
এই কৌশল যুক্তরাষ্ট্রের একক চাপ মোকাবিলায় কানাডাকে শক্তিশালী অবস্থানে রাখবে।
আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা
গ্রিনল্যান্ড ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক সিদ্ধান্ত ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকায় সমালোচিত হয়েছে। অনেক বিশ্লেষক মনে করছেন, এটি আর্কটিক অঞ্চলে নতুন কূটনৈতিক উত্তেজনা তৈরি করতে পারে।
এই প্রেক্ষাপটে কানাডা গ্রিনল্যান্ড শুল্ক বিরোধিতা করে আলোচনার পথ খোলা রাখতে চায়। এটি ভবিষ্যতে বড় সংঘাত এড়াতে সহায়ক হতে পারে।
কেন এই অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ
কানাডার অবস্থান শুধু গ্রিনল্যান্ড নয়, বৈশ্বিক বাণিজ্য ব্যবস্থার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। এটি দেখায় যে মাঝারি শক্তির দেশগুলোও আন্তর্জাতিক নিয়ম রক্ষায় দৃঢ় ভূমিকা রাখতে পারে।
আন্তর্জাতিক সংবাদসূত্রের তথ্য
এই প্রতিবেদনটি আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা Reuters–এর তথ্যের ওপর ভিত্তি করে তৈরি, যেখানে ডাভোসে মার্ক কার্নির বক্তব্য বিস্তারিতভাবে প্রকাশ করা হয়েছে।
ডাভোসে মার্ক কার্নির বক্তব্য স্পষ্ট করে দিয়েছে, কানাডা একতরফা শুল্ক আরোপের রাজনীতিতে বিশ্বাস করে না। কানাডা গ্রিনল্যান্ড শুল্ক বিরোধিতা করে আলোচনার মাধ্যমে সমাধান চায় এবং আন্তর্জাতিক নিয়মভিত্তিক ব্যবস্থাকে অগ্রাধিকার দেয়।
এই অবস্থান শুধু বর্তমান সংকট নয়, ভবিষ্যৎ আর্কটিক রাজনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।



