মার্কিন ডলারের বিপরীতে সিঙ্গাপুর ডলার শক্তিশালী হয়ে ২০১৪ সালের পর সর্বোচ্চ অবস্থানে পৌঁছেছে। ডলার দুর্বলতার পেছনের কারণ ও এশীয় বাজারের প্রভাব জানুন।
মার্কিন ডলারের বিপরীতে সিঙ্গাপুর ডলার শক্তিশালী হয়ে আবারও আন্তর্জাতিক মুদ্রাবাজারে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে। প্রায় এক দশকের মধ্যে সবচেয়ে শক্ত অবস্থানে পৌঁছানো এই মুদ্রা শুধু সিঙ্গাপুর নয়, গোটা এশীয় অর্থনীতির জন্যই গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত বহন করছে। বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, ডলারের দুর্বলতা এবং এশিয়ার কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর নীতিগত অবস্থান এই উত্থানের পেছনে বড় ভূমিকা রাখছে।
চলতি সপ্তাহে সিঙ্গাপুরের কেন্দ্রীয় ব্যাংক (MAS) নীতিগত অবস্থান অপরিবর্তিত রাখতে পারে—এমন প্রত্যাশা বিনিয়োগকারীদের আস্থাকে আরও জোরালো করেছে। এর মধ্যেই মার্কিন ডলারের বিপরীতে সিঙ্গাপুর ডলার শক্তিশালী হয়ে ১.২৬৮৪ বিনিময় হারে পৌঁছায়, যা ২০১৪ সালের অক্টোবরের পর সর্বোচ্চ।
মার্কিন ডলারের বিপরীতে সিঙ্গাপুর ডলার শক্তিশালী হওয়ার পেছনের মূল কারণ
মার্কিন ডলারের সাম্প্রতিক দুর্বলতাই মূলত এই পরিবর্তনের প্রধান চালিকা শক্তি। যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ সুদের হার নিয়ে সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। গত ২৩ জানুয়ারি নিউইয়র্ক ফেডের সুদ পর্যালোচনার পর থেকেই ডলারের ওপর চাপ বাড়তে শুরু করে।
এর পাশাপাশি, জাপানের সম্ভাব্য মুদ্রা হস্তক্ষেপ এবং যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকেও হস্তক্ষেপের ইঙ্গিত বাজারে অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। এই পরিস্থিতিতে নিরাপদ ও স্থিতিশীল মুদ্রা হিসেবে বিনিয়োগকারীরা সিঙ্গাপুর ডলারের দিকে ঝুঁকছেন। ফলে মার্কিন ডলারের বিপরীতে সিঙ্গাপুর ডলার শক্তিশালী হয়ে ওঠে।
এশীয় মুদ্রাবাজারে এর প্রভাব

শুধু সিঙ্গাপুর ডলার নয়, মার্কিন ডলারের দুর্বলতার সুযোগে অন্যান্য এশীয় মুদ্রাও লাভবান হয়েছে। জাপানি ইয়েন প্রায় ১.২ শতাংশ শক্তিশালী হয়েছে। একই সময়ে মালয়েশিয়ার রিঙ্গিত ২০১৮ সালের পর সর্বোচ্চ অবস্থানে পৌঁছায়।
দক্ষিণ কোরিয়ার ওনও প্রায় তিন সপ্তাহের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে উঠে আসে। বিশ্লেষকদের মতে, এটি প্রমাণ করে যে মার্কিন ডলারের বিপরীতে সিঙ্গাপুর ডলার শক্তিশালী হওয়ার ঘটনা আলাদা কোনো বিচ্ছিন্ন বিষয় নয়; বরং এটি একটি আঞ্চলিক ট্রেন্ডের অংশ।
সিঙ্গাপুরের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভিন্নধর্মী নীতি
সিঙ্গাপুরের কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুদের হার পরিবর্তনের বদলে মূলত মুদ্রার বিনিময় হার ব্যবস্থাপনায় জোর দিয়ে থাকে। এই কৌশল দেশটিকে দীর্ঘদিন ধরে স্থিতিশীল রেখেছে। ফলে বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার সময়েও সিঙ্গাপুর ডলার তুলনামূলক নিরাপদ মুদ্রা হিসেবে বিবেচিত হয়।
এই নীতির কারণে গত ১২ মাসে মার্কিন ডলারের বিপরীতে সিঙ্গাপুর ডলার শক্তিশালী হয়ে প্রায় ৬ শতাংশ মূল্য বৃদ্ধি পেয়েছে। বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়ার পেছনে এটি একটি বড় কারণ।
বিদেশি বিনিয়োগকারীদের বাড়তি আগ্রহ
সিঙ্গাপুরের শেয়ারবাজার, সরকারি বন্ড এবং দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত স্থিতিশীলতা বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আকর্ষণ করছে। বৈশ্বিক অর্থনীতিতে যখন অনিশ্চয়তা বাড়ছে, তখন স্থিতিশীল আর্থিক কাঠামো থাকা দেশগুলোর মুদ্রা স্বাভাবিকভাবেই শক্তিশালী হয়।
এই বাস্তবতায় মার্কিন ডলারের বিপরীতে সিঙ্গাপুর ডলার শক্তিশালী হওয়ার ঘটনাকে বাজার বিশেষজ্ঞরা ইতিবাচক সংকেত হিসেবে দেখছেন।
বৈশ্বিক অর্থনীতিতে এর তাৎপর্য
এই মুদ্রা শক্তিশালী হওয়ার অর্থ হলো আমদানি খরচ কমে যাওয়া এবং মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে থাকা। তবে একই সঙ্গে রপ্তানিকারকদের জন্য এটি কিছুটা চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে। তবুও সিঙ্গাপুরের বৈচিত্র্যময় অর্থনীতি এই চাপ সামাল দিতে সক্ষম।
বিশ্ব অর্থনীতির বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে বিস্তারিত বিশ্লেষণ পাওয়া যাবে আন্তর্জাতিক আর্থিক সংস্থা International Monetary Fund (IMF)-এর প্রতিবেদনে, যেখানে বৈশ্বিক মুদ্রানীতির হালনাগাদ চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।
ভবিষ্যতে কী হতে পারে?
বিশ্লেষকদের ধারণা, যদি ফেডারেল রিজার্ভ সুদের হার দীর্ঘ সময় অপরিবর্তিত রাখে এবং এশীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো বর্তমান নীতি বজায় রাখে, তাহলে এই ধারা আরও কিছুদিন চলতে পারে।
তবে বাজার সবসময় পরিবর্তনশীল। তাই বিনিয়োগকারীদের সতর্ক নজর রাখতে হবে নীতিগত ঘোষণার ওপর।
সবশেষে বলা যায়, মার্কিন ডলারের বিপরীতে সিঙ্গাপুর ডলার শক্তিশালী হওয়া শুধু একটি সংখ্যাগত পরিবর্তন নয়। এটি এশীয় অর্থনীতির স্থিতিশীলতা, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কৌশল এবং বৈশ্বিক বিনিয়োগ প্রবণতার প্রতিফলন। এই ধারা আগামী দিনগুলোতে বৈশ্বিক বাজারে নতুন দিকনির্দেশনা দিতে পারে।




