রমজানে নিত্যপণ্যের দাম স্থিতিশীল থাকবে বলে জানালেন বাণিজ্য উপদেষ্টা। ৪০% বেশি আমদানিতে কিছু পণ্যের দাম কমার সম্ভাবনাও রয়েছে।
রমজান সামনে রেখে সাধারণ মানুষের সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তা থাকে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম নিয়ে। তবে এবছর সেই দুশ্চিন্তা অনেকটাই কমতে পারে। কারণ সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, রমজানে নিত্যপণ্যের দাম স্থিতিশীল থাকবে এবং কিছু কিছু পণ্যের দাম আগের বছরের তুলনায় কমতেও পারে।
বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন জানিয়েছেন, গত বছরের তুলনায় এবার প্রায় ৪০ শতাংশ বেশি নিত্যপণ্য আমদানি করা হয়েছে। ফলে বাজারে সরবরাহ পর্যাপ্ত থাকবে এবং কৃত্রিম সংকট তৈরির সুযোগ কমবে। সরকারের এই অবস্থান সাধারণ ভোক্তাদের জন্য স্বস্তির খবর হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
রমজানে নিত্যপণ্যের দাম স্থিতিশীল রাখতে সরকারের প্রস্তুতি

আসন্ন রমজান উপলক্ষে নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্যের বাজার পরিস্থিতি পর্যালোচনায় রবিবার (২৫ জানুয়ারি) একটি টাস্কফোর্স সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভা শেষে বাণিজ্য উপদেষ্টা স্পষ্ট করে বলেন, রমজানে নিত্যপণ্যের দাম স্থিতিশীল রাখতে সরকার ও ব্যবসায়ীরা একসঙ্গে কাজ করছে।
তার ভাষায়, ব্যবসায়ীরা আশ্বস্ত করেছেন যে বাজারে পণ্যের সরবরাহ স্বাভাবিক রয়েছে। চাল, ডাল, তেল, চিনি, ছোলা ও খেজুর—এসব পণ্যের মজুতও সন্তোষজনক পর্যায়ে আছে। ফলে রমজানে হঠাৎ করে দাম বাড়ার কোনো যৌক্তিক কারণ নেই।
৪০% বেশি আমদানির প্রভাব কীভাবে বাজারে পড়বে
গত বছরের তুলনায় ৪০ শতাংশ বেশি আমদানি হওয়াটা বাজারের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ইতিবাচক দিক। বিশেষজ্ঞদের মতে, আমদানি বাড়লে তিনটি বড় সুবিধা পাওয়া যায়—
প্রথমত, সরবরাহ বাড়ে।
দ্বিতীয়ত, মজুতদারির সুযোগ কমে।
তৃতীয়ত, প্রতিযোগিতার কারণে দাম নিয়ন্ত্রণে থাকে।
এই কারণেই সরকার আশাবাদী যে রমজানে নিত্যপণ্যের দাম স্থিতিশীল রাখা সম্ভব হবে। বিশেষ করে ভোজ্যতেল, চিনি ও ডালের মতো পণ্যে দাম কিছুটা কমার সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছে।
বাজার নিয়ন্ত্রণে ব্যবসায়ীদের ভূমিকা
শেখ বশিরউদ্দীন বলেন, বাজার শুধু সরকারের একক প্রচেষ্টায় নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব নয়। ব্যবসায়ীদের সহযোগিতাও এখানে বড় ভূমিকা রাখে। টাস্কফোর্স সভায় ব্যবসায়ী প্রতিনিধিরা জানিয়েছেন, তারা রমজানে অতিরিক্ত মুনাফা না করে স্বাভাবিক লাভে পণ্য বিক্রি করতে আগ্রহী।
এই সমন্বয়ের ফলে রমজানে নিত্যপণ্যের দাম স্থিতিশীল রাখার বাস্তব সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি, নিয়মিত বাজার মনিটরিং এবং ভ্রাম্যমাণ আদালতের কার্যক্রমও জোরদার করা হবে বলে জানা গেছে।
অর্থনৈতিক চাপে বাজার কেন অস্থির হতে পারে
যদিও সরকার আশার কথা শোনাচ্ছে, তবে কিছু অর্থনৈতিক বাস্তবতাও তুলে ধরেছেন বাণিজ্য উপদেষ্টা। তিনি উল্লেখ করেন, কর্ণফুলী টানেল, পায়রা বন্দর এবং পদ্মা সেতুর মতো বড় প্রকল্পে সরকারের বাড়তি দায় তৈরি হয়েছে।
এছাড়া টাকার অবমূল্যায়ন এবং আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (IMF) থেকে বড় অঙ্কের ঋণ নেওয়ার কারণে অর্থনীতিতে চাপ সৃষ্টি হয়েছে। এসব বিষয় সরাসরি বা পরোক্ষভাবে নিত্যপণ্যের বাজারে প্রভাব ফেলে। তবুও সরকারের লক্ষ্য রমজান মাসে ভোক্তাদের ওপর বাড়তি চাপ না দেওয়া।
রূপপুর প্রকল্পের ব্যয় বৃদ্ধি ও এর প্রভাব
এদিকে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক) রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্পে ২৫ হাজার ৫৯২ কোটি টাকা ব্যয় বাড়ানোর প্রস্তাব অনুমোদন দিয়েছে। এই প্রকল্পের মূল ব্যয় ছিল ১ লাখ ১৩ হাজার ৯২ কোটি টাকা, যা এখন বেড়ে দাঁড়াচ্ছে প্রায় ১ লাখ ৩৮ হাজার ৬৮৫ কোটি টাকায়।
বিশ্লেষকদের মতে, বড় প্রকল্পে ব্যয় বাড়লে সামগ্রিক অর্থনীতিতে চাপ তৈরি হয়। তবে সরকার বলছে, এসব দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্প দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা ও শিল্পোন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। তাৎক্ষণিকভাবে যাতে রমজানে নিত্যপণ্যের দাম স্থিতিশীল থাকে, সেদিকে বিশেষ নজর দেওয়া হচ্ছে।
একনেকে অনুমোদিত প্রকল্প ও অর্থের উৎস
রূপপুর বিদ্যুৎকেন্দ্রসহ একনেকে অনুমোদিত ২৫টি প্রকল্প বাস্তবায়নে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৪৫ হাজার ১৯১ কোটি টাকা। এর মধ্যে—
-
সরকারি তহবিল: ১০ হাজার ৮৮১ কোটি টাকা
-
বৈদেশিক ঋণ: ৩২ হাজার ৯৮ কোটি টাকা
-
সংস্থার নিজস্ব তহবিল: ২ হাজার ২৯১ কোটি টাকা
এই ব্যয় কাঠামো দেখাচ্ছে যে উন্নয়ন প্রকল্পের চাপ থাকলেও সরকার নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে সরাসরি ভর্তুকি ও নীতিগত সহায়তা অব্যাহত রাখতে চায়।
ভোক্তাদের জন্য কী বার্তা দিল সরকার
সরকারি বার্তায় স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, আতঙ্কিত হয়ে অতিরিক্ত পণ্য কেনার প্রয়োজন নেই। কারণ এতে কৃত্রিম সংকট তৈরি হয়। বরং স্বাভাবিক চাহিদার ভিত্তিতে কেনাকাটা করলে রমজানে নিত্যপণ্যের দাম স্থিতিশীল রাখা আরও সহজ হবে।
ভোক্তাদের পাশাপাশি গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকেও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের আহ্বান জানানো হয়েছে, যাতে গুজব ছড়িয়ে বাজার অস্থির না হয়।
আন্তর্জাতিক বাজার ও বৈশ্বিক পরিস্থিতি
আন্তর্জাতিক বাজারে খাদ্যপণ্যের দাম তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল থাকাও বাংলাদেশের জন্য ইতিবাচক দিক। বিশ্বব্যাংক ও FAO–এর তথ্যমতে, বৈশ্বিক খাদ্য মূল্যসূচক আগের বছরের তুলনায় কিছুটা কমেছে।




