শিল্পায়নের নিম্নমুখী প্রভাবে চাকরি হারিয়েছে ১৪ লাখ মানুষ। এ কে আজাদ বলছেন, শিল্পখাতের মন্দা, ব্যাংকিং সংকট ও কমতে থাকা জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্থনীতিকে ঝুঁকিতে ফেলছে।
বাংলাদেশের অর্থনীতি বর্তমানে একটি চ্যালেঞ্জিং সময় পার করছে। শিল্পায়নের নিম্নমুখী প্রভাব চাকরি হারিয়েছে ১৪ লাখ মানুষ—এমন তথ্য উঠে এসেছে দেশের অন্যতম শীর্ষ শিল্প উদ্যোক্তা ও হা-মীম গ্রুপের চেয়ারম্যান এ কে আজাদের বক্তব্যে। এই পরিসংখ্যান শুধু একটি সংখ্যা নয়; এটি লাখো পরিবারের জীবনের বাস্তব চিত্র তুলে ধরে।
শনিবার রাজধানীতে অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সম্মেলন ২০২৫–এর উদ্বোধনী অধিবেশনে বক্তব্য রাখতে গিয়ে তিনি দেশের শিল্পখাত, কর্মসংস্থান এবং ব্যাংকিং ব্যবস্থার বর্তমান অবস্থার ওপর গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তার মতে, শিল্পখাতে মন্দা এখন আর সম্ভাব্য ঝুঁকি নয়—বরং এটি বাস্তব সংকটে রূপ নিয়েছে।
শিল্পায়নের নিম্নমুখী প্রভাব চাকরি হারিয়েছে ১৪ লাখ মানুষ: বাস্তবতা কী?

শিল্পায়নের নিম্নমুখী প্রভাব চাকরি হারিয়েছে ১৪ লাখ মানুষ—এই তথ্য সরাসরি ইঙ্গিত দেয় দেশের উৎপাদন ও কর্মসংস্থান কাঠামোর দুর্বলতার দিকে। এ কে আজাদ বলেন, শিল্পখাতে উৎপাদন কমে যাওয়ায় অনেক কারখানা আংশিক বা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। এর ফলেই বিপুল সংখ্যক শ্রমিক কাজ হারিয়েছেন।
প্রতিবছর বাংলাদেশে গড়ে ৩০ লাখ নতুন মানুষ শ্রমবাজারে প্রবেশ করে। কিন্তু শিল্পখাতে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি না হওয়ায় এই বিপুল জনগোষ্ঠীর জন্য কাজের সুযোগ তৈরি হচ্ছে না। ফলে বেকারত্বের হার দ্রুত বাড়ছে, যা সামাজিক ও অর্থনৈতিক উভয় দিক থেকেই উদ্বেগজনক।
জিডিপি প্রবৃদ্ধির নিম্নগতি অর্থনীতির চাপ বাড়াচ্ছে
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ বুলেটিন অনুযায়ী, গত অর্থবছরে দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ছিল ৪.২২ শতাংশ। তবে চলতি অর্থবছরে তা কমে ৩.৯৭ শতাংশে নেমে আসতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
এ কে আজাদের মতে, প্রবৃদ্ধির এই নিম্নগতি শিল্পায়নের নিম্নমুখী প্রভাবেরই প্রতিফলন। উৎপাদন কমলে আয় কমে, আয় কমলে ভোগ ও বিনিয়োগ হ্রাস পায়—এই চক্র শেষ পর্যন্ত পুরো অর্থনীতির ওপর চাপ সৃষ্টি করে।
ব্যাংকিং খাতে বাড়ছে খেলাপি ঋণ
শুধু শিল্পখাত নয়, ব্যাংকিং খাতের অবস্থাও উদ্বেগজনক। বর্তমানে দেশে খেলাপি বা শ্রেণীকৃত ঋণের হার ২৪ শতাংশে পৌঁছেছে। বাস্তবে এই হার আরও বেশি হতে পারে বলে মনে করেন এ কে আজাদ।
উচ্চ খেলাপি ঋণের কারণে ব্যাংকগুলো ঝুঁকি নিতে চাইছে না। ফলে নতুন শিল্প উদ্যোগ বা ব্যবসার জন্য প্রয়োজনীয় ঋণপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে শিল্পায়নের ওপর, যা শেষ পর্যন্ত কর্মসংস্থান সংকটকে আরও তীব্র করছে।
উচ্চ সুদের হার বেসরকারি খাতকে চাপে ফেলছে
বাংলাদেশ ব্যাংকের সংকোচনমূলক মুদ্রানীতির ফলে সুদের হার বেড়েছে। এর ফলে বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তারা প্রয়োজনীয় অর্থায়ন পাচ্ছেন না।
এ কে আজাদ বলেন, “আমরা মাত্র ৬ শতাংশ হারে ঋণ পাচ্ছি, যা শিল্প খাতের জন্য পর্যাপ্ত নয়।” উচ্চ সুদের হার শিল্প উদ্যোক্তাদের নতুন বিনিয়োগ থেকে পিছিয়ে দিচ্ছে। ফলে নতুন কারখানা স্থাপন বা উৎপাদন সম্প্রসারণ থমকে যাচ্ছে।
ক্যাপিটাল মেশিনারি আমদানি কমার সতর্ক সংকেত
শিল্পখাতের দুরবস্থার আরেকটি স্পষ্ট ইঙ্গিত হলো ক্যাপিটাল মেশিনারি আমদানি হ্রাস। গত বছর দেশে এই খাতে আমদানি কমেছিল। চলতি বছরে তা আগের বছরের তুলনায় আরও ২৬ শতাংশ কমেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ক্যাপিটাল মেশিনারি আমদানি কমা মানে নতুন শিল্প স্থাপনে আগ্রহ কমে যাওয়া। এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়বে উৎপাদন, রপ্তানি এবং কর্মসংস্থানের ওপর।
শিল্পায়নের নিম্নমুখী প্রভাব কেন এত গভীর?
শিল্পায়নের নিম্নমুখী প্রভাব চাকরি হারিয়েছে ১৪ লাখ মানুষ—এই পরিস্থিতির পেছনে কয়েকটি প্রধান কারণ রয়েছে:
-
বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা
-
উচ্চ সুদের হার ও ঋণ সংকট
-
জ্বালানি ও কাঁচামালের দাম বৃদ্ধি
-
বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশের অভাব
এই সব কারণ মিলেই শিল্পখাতকে একটি কঠিন অবস্থার মধ্যে ফেলে দিয়েছে।
কর্মসংস্থান সংকটের সামাজিক প্রভাব
কর্মসংস্থান কমে যাওয়ার প্রভাব শুধু অর্থনীতিতে সীমাবদ্ধ নয়। এটি সমাজের বিভিন্ন স্তরে প্রভাব ফেলছে। আয় কমে যাওয়ায় অনেক পরিবার শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও মৌলিক চাহিদা পূরণে হিমশিম খাচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, দীর্ঘদিন ধরে যদি শিল্পায়নের নিম্নমুখী প্রভাব অব্যাহত থাকে, তাহলে দারিদ্র্যের হার আবারও বাড়তে পারে।
করণীয় কী হতে পারে?
অর্থনীতিবিদ ও শিল্প উদ্যোক্তাদের মতে, এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে কয়েকটি পদক্ষেপ জরুরি:
-
শিল্পখাতে সহজ শর্তে ঋণপ্রবাহ নিশ্চিত করা
-
সুদের হার সহনীয় পর্যায়ে আনা
-
নতুন শিল্পে বিনিয়োগে প্রণোদনা
-
ব্যাংকিং খাতে সংস্কার জোরদার করা
এই পদক্ষেপগুলো বাস্তবায়ন করা গেলে শিল্পায়নের গতি আবারও বাড়তে পারে।
বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (IMF)–এর বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উন্নয়নশীল দেশগুলোতে শিল্পখাত দুর্বল হলে কর্মসংস্থান সংকট দ্রুত বাড়ে। এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যাবে বিশ্বব্যাংকের বিশ্লেষণে:
শিল্পায়নের নিম্নমুখী প্রভাব চাকরি হারিয়েছে ১৪ লাখ মানুষ
বর্তমান পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে শিল্পায়নের নিম্নমুখী প্রভাব চাকরি হারিয়েছে ১৪ লাখ মানুষ—এই সংখ্যা ভবিষ্যতে আরও বাড়তে পারে। তবে সময়মতো সঠিক নীতি সিদ্ধান্ত ও কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া গেলে পরিস্থিতি ঘুরে দাঁড়ানোর সম্ভাবনাও রয়েছে।
দেশের অর্থনীতি, শিল্পখাত এবং কর্মসংস্থান—এই তিনটি বিষয় একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। শিল্পখাত শক্তিশালী না হলে টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়—এটাই বাস্তবতা।




