ঋণভিত্তিক ব্যয় কোনো আয় তৈরি করতে পারেনি—বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীনের মতে অযাচিত প্রকল্প ও অপরিণামদর্শী ব্যয় দেশের অর্থনীতিতে বড় সংকট তৈরি করেছে।
ঋণভিত্তিক ব্যয় কোনো আয় তৈরি করতে পারেনি—এই মন্তব্য এখন শুধু একটি বক্তব্য নয়, বরং দেশের সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি। বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন সম্প্রতি সচিবালয়ে দেওয়া বক্তব্যে বলেছেন, দীর্ঘ সময় ধরে সরকারের ঋণনির্ভর ব্যয় কাঙ্ক্ষিত কোনো উৎপাদনশীল আয় সৃষ্টি করতে ব্যর্থ হয়েছে। বরং এই ব্যয় ভবিষ্যতের জন্য আরও বড় দায় তৈরি করেছে।
২০০৮ সালে দেশের মোট সরকারি ঋণ ছিল প্রায় দুই লাখ কোটি টাকা। কিন্তু আওয়ামী লীগ সরকারের মেয়াদ শেষে এই ঋণ বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ২৩ লাখ কোটি টাকায়। এই বিশাল ব্যবধানই স্পষ্ট করে দেয় যে, ঋণভিত্তিক ব্যয় কোনো আয় তৈরি করতে পারেনি, বরং সামগ্রিক দায় বহুগুণ বাড়িয়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন উঠছে—কোথায় ভুল হলো, কোন প্রকল্পগুলো দায় বাড়াল, আর এর প্রভাব কেন পড়ল নিত্যপণ্যের বাজারে?
ঋণভিত্তিক ব্যয় কোনো আয় তৈরি করতে পারেনি: মূল বক্তব্য কী?

বাণিজ্য উপদেষ্টার ভাষ্য অনুযায়ী, সরকারের লক্ষ্য হওয়া উচিত ছিল ব্যয়ের উদ্বৃত্ত তৈরি করা। অর্থাৎ এমন খাতে বিনিয়োগ করা, যেখান থেকে আয় হবে এবং সেই আয় দিয়ে ঋণ পরিশোধ সম্ভব হবে। কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি।
তিনি স্পষ্ট করে বলেন, ঋণভিত্তিক ব্যয় কোনো আয় তৈরি করতে পারেনি, বরং দীর্ঘমেয়াদি দায় তৈরি করেছে। এর ফলে সরকারের ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা কমেছে এবং সাধারণ মানুষের ওপর চাপ বেড়েছে।
পদ্মা সেতু ও পদ্মা রেলসেতু: প্রত্যাশা বনাম বাস্তবতা
অযাচিত প্রকল্পের উদাহরণ দিতে গিয়ে শেখ বশিরউদ্দীন পদ্মা সেতু ও পদ্মা রেলসেতুর কথা উল্লেখ করেন।
পদ্মা রেলসেতু থেকে আয় হবে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছিল প্রায় ১ হাজার ৪০০ কোটি টাকা। কিন্তু বাস্তবে আয় হয়েছে মাত্র ২৬ কোটি টাকা। এই বিশাল ব্যবধানই প্রমাণ করে পরিকল্পনার দুর্বলতা।
এছাড়া বলা হয়েছিল, পদ্মা সেতু চালু হলে দেশের মোট দেশজ উৎপাদন (GDP) ২ শতাংশ পর্যন্ত বাড়বে। কিন্তু বাস্তবে সেই প্রবৃদ্ধি তো বাড়েইনি, বরং উল্টো কমেছে।
এই উদাহরণগুলো আবারও প্রমাণ করে—ঋণভিত্তিক ব্যয় কোনো আয় তৈরি করতে পারেনি, বরং অর্থনীতির ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করেছে।
অযাচিত প্রকল্প ও অপরিণামদর্শী ব্যয়ের প্রভাব
বাণিজ্য উপদেষ্টা আরও বলেন, কর্ণফুলী টানেল, পায়রা বন্দর এবং পদ্মা সেতুর মতো একাধিক প্রকল্প প্রয়োজনের তুলনায় অপরিণামদর্শীভাবে বাস্তবায়ন করা হয়েছে।
এই প্রকল্পগুলোর পেছনে বিপুল অঙ্কের টাকা ব্যয় হলেও সেগুলো থেকে কাঙ্ক্ষিত আর্থিক রিটার্ন আসেনি। ফলে সরকারকে নতুন করে ঋণ নিতে হয়েছে, যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এখানেও মূল সমস্যা একটাই—ঋণভিত্তিক ব্যয় কোনো আয় তৈরি করতে পারেনি।
সেচ ও কৃষিতে বিনিয়োগ হলে চিত্র বদলাতে পারত
শেখ বশিরউদ্দীনের মতে, যদি এই বিপুল অর্থ সেচব্যবস্থা উন্নয়ন, সার সরবরাহ এবং কৃষি উৎপাদনে ব্যয় করা হতো, তাহলে চিত্র ভিন্ন হতে পারত।
কৃষিখাতে উৎপাদন বাড়লে খাদ্য সরবরাহ স্থিতিশীল থাকত। এতে চালসহ নিত্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখা সহজ হতো। পাশাপাশি সরকারের আয়ও বাড়ত, যা দিয়ে ঋণ পরিশোধ সম্ভব হতো।
কিন্তু বাস্তবে তা না হওয়ায় আবারও সত্য প্রমাণিত হয়েছে—ঋণভিত্তিক ব্যয় কোনো আয় তৈরি করতে পারেনি।
টাকার অবমূল্যায়ন ও আইএমএফ ঋণ
গত ১৫ বছরে দেশের মুদ্রার অবমূল্যায়ন হয়েছে প্রায় ৪৬ শতাংশ। এই অবমূল্যায়নের কারণে আমদানি ব্যয় বেড়েছে, মূল্যস্ফীতি তীব্র হয়েছে এবং সরকারের আর্থিক চাপ আরও বাড়িয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে সরকারকে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (IMF) থেকে বড় অঙ্কের ঋণ নিতে হয়েছে। IMF ঋণের শর্ত অনুযায়ী বিভিন্ন সংস্কার কার্যক্রম বাস্তবায়ন করতে হচ্ছে, যা সরাসরি প্রভাব ফেলছে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায়।
নিত্যপণ্যের বাজারে প্রভাব কেন পড়ল?
ঋণ, অবমূল্যায়ন এবং অপরিকল্পিত ব্যয়ের সরাসরি প্রভাব পড়েছে চালসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে।
আমদানি ব্যয় বাড়ায় খাদ্যপণ্যের দাম বেড়েছে। আবার কৃষিতে পর্যাপ্ত বিনিয়োগ না হওয়ায় দেশীয় উৎপাদনও চাপের মুখে পড়েছে। ফলে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমেছে।
এই পুরো প্রক্রিয়ার কেন্দ্রে রয়েছে একটাই বাস্তবতা—ঋণভিত্তিক ব্যয় কোনো আয় তৈরি করতে পারেনি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভবিষ্যতে সরকারকে ঋণনির্ভর ব্যয়ের বদলে উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। কৃষি, শিল্প, রপ্তানি এবং মানবসম্পদ উন্নয়নে অর্থ ব্যয় করলে দীর্ঘমেয়াদে আয় বাড়বে।
এতে ঋণের ওপর নির্ভরতা কমবে এবং অর্থনীতি হবে টেকসই। না হলে বারবার একই সমস্যার মুখোমুখি হতে হবে—যেখানে ঋণভিত্তিক ব্যয় কোনো আয় তৈরি করতে পারেনি।




