বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহার ৫১ দফা ঘোষণা করে তারেক রহমান বলেন, এটি প্রতিশ্রুতি নয় বরং রাষ্ট্র পরিচালনার নতুন সামাজিক চুক্তি।
বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহার ৫১ দফা ঘোষণা করে দলটির চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেছেন, এটি কোনো প্রচলিত প্রতিশ্রুতির তালিকা নয়; বরং ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ পরিচালনার জন্য একটি নতুন সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় চুক্তির রূপরেখা। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ছয় দিন আগে রাজধানীর সোনারগাঁও হোটেলে আনুষ্ঠানিকভাবে এই ইশতেহার ঘোষণা করা হয়, যেখানে রাষ্ট্রব্যবস্থা সংস্কার, অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার, সামাজিক ন্যায়বিচার ও বৈষম্যহীন উন্নয়নের রূপরেখা তুলে ধরা হয়।
ইশতেহার ঘোষণার প্রেক্ষাপট ও অনুষ্ঠান
শুক্রবার বিকেল সোয়া ৪টার দিকে শুরু হয়ে টানা দুই ঘণ্টাব্যাপী অনুষ্ঠানে বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহার উপস্থাপন করেন তারেক রহমান। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। সঞ্চালনা করেন সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবীর রিজভী। শুভেচ্ছা বক্তব্য দেন কেন্দ্রীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটির চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম খান।
এটি তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপির প্রথম নির্বাচনী ইশতেহার। এর আগে পঞ্চম থেকে নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচন পর্যন্ত ইশতেহার ঘোষণা করেছিলেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও দলের চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া।
বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহার ৫১ দফা: কাঠামো ও দর্শন
নতুন রাষ্ট্রীয় চুক্তির ঘোষণা

তারেক রহমান বলেন, “দুর্নীতি রোধ, আইনের শাসন ও জবাবদিহি নিশ্চিত না করা গেলে কোনো উন্নয়ন পরিকল্পনাই সফল হবে না।” তাঁর ভাষায়, এই ইশতেহার রাষ্ট্র পরিচালনার একটি কাঠামোগত রূপরেখা।
ইশতেহারে পাঁচটি ভাগে মোট ৫১ দফা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে—
-
প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ সর্বোচ্চ ১০ বছর
-
উপরাষ্ট্রপতি পদ ও সংসদের উচ্চকক্ষ প্রবর্তন
-
বিরোধী দল থেকে ডেপুটি স্পিকার
-
উচ্চকক্ষে ২০ শতাংশ নারী প্রতিনিধিত্ব
-
তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা সংবিধানে পুনঃপ্রতিষ্ঠা
রাষ্ট্র পরিচালনা ও সাংবিধানিক সংস্কার
বিএনপি ক্ষমতায় এলে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের শাসনামলের রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি অনুসরণের কথা জানানো হয়। সংবিধানে “সর্বশক্তিমান আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস” পুনঃস্থাপনের কথাও উল্লেখ করা হয়।
রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলোর জবাবদিহি নিশ্চিত করতে ন্যায়পাল নিয়োগ, বিচার বিভাগ পৃথকীকরণ এবং বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার অঙ্গীকার করা হয়েছে।
শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও মানবসম্পদ উন্নয়ন
শিক্ষা সংস্কার
-
শিক্ষা সংস্কার কমিশন গঠন
-
কারিগরি ও ব্যবহারিক শিক্ষাকে অগ্রাধিকার
-
শিক্ষার্থীদের জন্য বিনামূল্যে স্কুল ড্রেস
-
স্কুল, কলেজ, লাইব্রেরি ও ক্যাফেতে ফ্রি ওয়াই-ফাই
স্বাস্থ্য খাত
-
জিডিপির ৫ শতাংশ স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ
-
এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ
-
মা ও শিশুর পূর্ণাঙ্গ স্বাস্থ্যসেবা
অর্থনীতি, কর্মসংস্থান ও আইসিটি
বিএনপি আইসিটি খাত সম্প্রসারণের মাধ্যমে ১০ লাখ নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। আইসিটি খাতে জিডিপির অবদান ৫ শতাংশ থেকে ১০ শতাংশে উন্নীত করার কথাও বলা হয়।
বিদ্যুৎ খাতে ২০৩০ সালের মধ্যে উৎপাদন সক্ষমতা ৩৫ হাজার মেগাওয়াটে উন্নীত করা এবং সঞ্চালন লাইন ২০ হাজার সার্কিট কিলোমিটারে সম্প্রসারণের পরিকল্পনার কথা জানানো হয়।
কৃষি, গ্রামীণ অর্থনীতি ও সামাজিক সুরক্ষা
-
কৃষকদের ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত ঋণ সুদসহ মওকুফ
-
কৃষি, মৎস্য ও পশুপালন খাতে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত ঋণ মওকুফ
-
প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য ‘ফ্যামিলি কার্ড’ চালু করে মাসিক ২৫০০ টাকা বা সমমূল্যের পণ্য সরবরাহ
তরুণ সমাজ ও ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড
১৫–৬৪ বছর বয়সী কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে বাজারভিত্তিক দক্ষতা, কর্মমুখী শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। পাশাপাশি ভবিষ্যতে বয়স্ক জনগোষ্ঠীর সামাজিক সুরক্ষার পরিকল্পনাও তুলে ধরা হয়।
পররাষ্ট্রনীতি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক
তারেক রহমান বলেন, দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব অক্ষুণ্ন রেখে অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষাই হবে বিএনপির পররাষ্ট্রনীতির ভিত্তি।
রোহিঙ্গাদের নিরাপদ ও সম্মানজনক প্রত্যাবর্তনের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করা হয়।
প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে নদ-নদীর পানি বণ্টন সমস্যার শান্তিপূর্ণ সমাধানের কথাও বলা হয়।
ব্যবসায়ী মহলের প্রতিক্রিয়া
ডিসিসিআই সভাপতি তাসকিন আহমেদ বলেন, ব্যাংকিং ও আর্থিক খাতে সুশাসন ও আস্থা ফেরানো না গেলে বিনিয়োগ গতি পাবে না।
বাংলাদেশ স্টিল ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি শেখ মাসাদুল আলম বলেন, কাগুজে প্রতিশ্রুতি নয়, বাস্তবায়নই হবে আসল পরীক্ষা।
বিশ্লেষকদের মতে, বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহার ৫১ দফা দলটির দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্র সংস্কারের রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরে। এতে প্রতিশোধের রাজনীতির বদলে ন্যায় ও মানবিকতার বার্তা দেওয়া হয়েছে।




