দাঁড়িপাল্লার এক পাল্লায় আমেরিকা অন্যটিতে ভারত, চরমোনাই পীর দাঁড়িপাল্লা মন্তব্য ঘিরে রাজনৈতিক আলোচনা তীব্র। আমেরিকা ও ভারতের প্রভাব নিয়ে হাতপাখার জনসভায় তার গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্যের পূর্ণ বিশ্লেষণ।
ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আমির ও চরমোনাই পীর মুফতি সৈয়দ মুহাম্মদ রেজাউল করীম বলেছেন, বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় দাঁড়িপাল্লা প্রতীককে ঘিরে যে আলোচনা চলছে, তা আদতে ইনসাফের প্রতিফলন নয়। চরমোনাই পীর দাঁড়িপাল্লা মন্তব্যে তিনি অভিযোগ করেন, এক পাল্লায় গোপনে আমেরিকা এবং অন্য পাল্লায় গোপনে ভারত অবস্থান করছে—যা বাংলাদেশের মানুষের প্রত্যাশিত ন্যায়ের ধারণার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
গতকাল দুপুর সাড়ে ১২টায় পটুয়াখালীর বাউফল উপজেলায় অনুষ্ঠিত হাতপাখা প্রতীকের নির্বাচনী জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। তার বক্তব্যের মূল উদ্দেশ্য ছিল জনগণকে ইসলামভিত্তিক শাসনব্যবস্থার পক্ষে সচেতন করা এবং প্রচলিত রাজনৈতিক কাঠামোর সীমাবদ্ধতা তুলে ধরা।
দাঁড়িপাল্লা প্রতীক নিয়ে চরমোনাই পীরের বক্তব্য

জনসভায় দেওয়া বক্তব্যে চরমোনাই পীর বলেন, দাঁড়িপাল্লাকে ইনসাফ ও ন্যায়ের প্রতীক হিসেবে উপস্থাপন করা হলেও বাস্তবে সেটি স্বার্থান্বেষী মহলের হাতিয়ার হয়ে উঠেছে। তার ভাষায়,
“যারা দাঁড়িপাল্লা নিয়ে আসছে, তারা ইনসাফের কথা বললেও বাস্তবে এক পাল্লায় আমেরিকা আরেক পাল্লায় ভারতকে গোপনে বসিয়েছে।”
এই চরমোনাই পীর দাঁড়িপাল্লা মন্তব্য রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে, বিশেষ করে বিদেশি প্রভাব ও জাতীয় সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে।
‘আমাদের দরকার ইসলামের ইনসাফ’
চরমোনাই পীর স্পষ্ট করে বলেন, বাংলাদেশের মানুষ কোনো বিদেশি শক্তির বিচারব্যবস্থা বা ন্যায়ের ধারণা দেখতে চায় না।
“আমরা আমেরিকার ইনসাফ চাই না, ভারতের ইনসাফ চাই না—আমরা ইসলামের ইনসাফ চাই।”
এই বক্তব্যের মাধ্যমে তিনি ইসলামভিত্তিক রাষ্ট্র পরিচালনার দাবি পুনর্ব্যক্ত করেন এবং ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের রাজনৈতিক অবস্থান স্পষ্ট করেন।
জনসভার প্রেক্ষাপট ও সভাপতিত্ব
উক্ত নির্বাচনী জনসভায় সভাপতিত্ব করেন ইসলামী আন্দোলনের বাউফল উপজেলা কমিটির আহ্বায়ক ও হাতপাখা প্রতীকের প্রার্থী মুফতি আবদুল মালেক আনোয়ারী। সভাটি আয়োজন করা হয় স্থানীয় ভোটারদের উদ্দেশে ইসলামী আন্দোলনের রাজনৈতিক দর্শন তুলে ধরার জন্য।
অভ্যুত্থান-পরবর্তী প্রত্যাশা ও হতাশা
চরমোনাই পীর তার বক্তব্যে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ের কথা স্মরণ করিয়ে দেন। তিনি বলেন, মানুষ একটি জুলুম ও নির্যাতনমুক্ত সোনার বাংলাদেশ প্রত্যাশা করেছিল।
তবে তার অভিযোগ, ক্ষমতালোভী স্বার্থান্বেষী মহলের ‘নীলনকশা’র কারণে সেই প্রত্যাশা বাস্তবায়িত হয়নি। প্রচলিত আইন ও কাঠামোর মধ্য দিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনা করে নতুন কিছু দেওয়া সম্ভব নয় বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
প্রচলিত ধারার রাজনীতির সমালোচনা
চরমোনাই পীর বলেন, বিএনপি কিংবা জামায়াত—কেউই ইসলামভিত্তিক রাষ্ট্র পরিচালনার অঙ্গীকার করেনি। বরং তারা প্রচলিত ধারা অনুসরণ করার কথা বলেছে।
এর বিপরীতে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ক্ষমতায় গেলে ইসলামভিত্তিক রাষ্ট্র পরিচালনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
দুর্নীতি ও সামাজিক ক্ষতির অভিযোগ
বক্তব্যে তিনি প্রচলিত আইনি কাঠামোর কারণে বাংলাদেশ বারবার দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে বলে অভিযোগ করেন। তার ভাষায়, এই ব্যবস্থার অধীনে দেশ “চোরের দেশে” পরিণত হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, এই রাজনৈতিক ব্যবস্থার ফলেই হাজার হাজার মা তাদের সন্তান হারিয়েছে—যা সামাজিকভাবে ভয়াবহ ক্ষতি ডেকে এনেছে।
হাতপাখা প্রতীকে ভোট চাওয়ার আহ্বান
জনসভায় চরমোনাই পীর সরাসরি হাতপাখা প্রতীকে ভোট চেয়ে বলেন,
“হাতপাখায় একটি ভোট পড়া মানেই ইসলামের পক্ষে একটি শক্তি বৃদ্ধি।”
তিনি নতুন ভোটারসহ সব শ্রেণি-পেশার মানুষকে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের পক্ষে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানান। এই আহ্বানও চরমোনাই পীর দাঁড়িপাল্লা মন্তব্য-এর রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটকে আরও স্পষ্ট করে।
অন্যান্য বক্তারা যা বললেন
সভায় আরও বক্তব্য রাখেন ইসলামী আন্দোলনের কেন্দ্রীয় নেতা নাসির আহমেদ কাউসার, হাবিবুর রহমান মিসবাহ, পটুয়াখালী জেলা ইসলামী আন্দোলনের সভাপতি হাওলাদার মো. সেলিম মিয়া, বাউফল উপজেলার সদস্যসচিব আলহাজ আবুল হোসেন হাওলাদার এবং মাওলানা নুরুল আমিন।
তারা সবাই ইসলামী আন্দোলনের রাজনৈতিক দর্শন ও আসন্ন নির্বাচনে হাতপাখা প্রতীকের গুরুত্ব তুলে ধরেন।
আগের জনসভা
উল্লেখ্য, এই জনসভার আগে চরমোনাই পীর পটুয়াখালী শহরের শহীদ আলাউদ্দিন শিশু পার্কে আরেকটি নির্বাচনী জনসভায় ভাষণ দেন। সেখানে তিনি একই ধরনের রাজনৈতিক বক্তব্য উপস্থাপন করেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষণ
বিশ্লেষকদের মতে, চরমোনাই পীর দাঁড়িপাল্লা মন্তব্য মূলত প্রচলিত রাজনৈতিক প্রতীক ও বিদেশি প্রভাবের বিরুদ্ধে ইসলামী আন্দোলনের অবস্থানকে জোরালোভাবে তুলে ধরেছে। এটি নির্বাচনী রাজনীতিতে ধর্মভিত্তিক বয়ানকে নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে।
আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট
বাংলাদেশের নির্বাচন ও রাজনৈতিক বক্তব্য আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমেও নজর কাড়ে।
উদাহরণ হিসেবে, চরমোনাই পীর দাঁড়িপাল্লা মন্তব্য প্রসঙ্গে দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে বিদেশি প্রভাব নিয়ে আলোচনা আল জাজিরার মতো আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে নিয়মিত উঠে আসে।




