আরও খবর

Shikor Web Image (47)
দূরপাল্লার বাস চলাচল: ১১–১২ ফেব্রুয়ারি গুরুত্বপূর্ণ নতুন সিদ্ধান্ত
Shikor Web Image (44)
ভোটার নম্বর ও ভোটকেন্দ্র তথ্য: ঘরে বসে জেনে নিন
Shikor Web Image (41)
৪৩ হাজার ভোটকেন্দ্রে গোয়েন্দা নজরদারি: থাকবে জানিয়েছেন প্রেস সচিব শফিকুল আলম
Shikor Web Image (38)
ঢাকা-১৮ আসনের নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ালেন মাহমুদুর রহমান মান্না
Shikor Web Image (32)
ভোটকেন্দ্রে মোবাইল নিষেধাজ্ঞা: জারি করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)

নাহিদ ইসলামের বক্তব্য: যা বললেন দেশবাসীর উদ্দেশে

নাহিদ ইসলামের বক্তব্যে ২০২৪ সালের বৈষম্য, সরকারের দুর্নীতি ও জাতীয় উন্নয়নের চ্যালেঞ্জ তুলে ধরা হয়েছে বিস্তারিত।

নাহিদ ইসলামের বক্তব্য: বাংলাদেশের বৈষম্য ও সরকারের দুর্নীতি নিয়ে বিশ্লেষণ

জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম রবিবার (৮ ফেব্রুয়ারি) সন্ধ্যা ৭টায় জাতির উদ্দেশে দেওয়া এক গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্যে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক বৈষম্য এবং দেশের অবকাঠামোগত সংকট নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। তিনি বলেন, স্বাধীনতার পর ৫৪ বছর ধরে রাষ্ট্রের মূল কাঠামো বৈষম্যের উপর প্রতিষ্ঠিত ছিল, যা ২০২৪ সালের জুলাইয়ে ভেঙে পড়ে। তার মতে, এই বৈষম্য কেবল অর্থনৈতিক নয়, বরং রাজনৈতিক ক্ষমতা, সামাজিক মর্যাদা, আইন প্রয়োগ এবং সুযোগ বণ্টনের প্রতিটি স্তরে বিদ্যমান।

নাহিদ ইসলারের বক্তব্যের মূল বিষয়: সাধারণ মানুষ, শ্রমজীবী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠী সর্বক্ষেত্রে বঞ্চিত হয়েছে, আর ক্ষমতাসীনরা শুধু নিজেদের ভাগ্য উন্নয়নে মনোনিবেশ করেছে।

বৈষম্য ও রাষ্ট্রীয় দুর্নীতি: নাহিদ ইসলারের বিশ্লেষণ

নাহিদ ইসলাম বলেন, স্বাধীনতার পর রাষ্ট্রের মূল প্রতিশ্রুতি ছিল সাম্য, মানবিক মর্যাদা এবং সামাজিক ন্যায়বিচার। কিন্তু বাস্তবে রাজনৈতিক আনুগত্যই হয়েছে সামাজিক ও অর্থনৈতিক সাফল্যের প্রধান শর্ত। তিনি আরও বলেন, চাকরি, ব্যবসা, শিক্ষা, নিরাপত্তা ও বিচারব্যবস্থায় ক্ষমতাসীনদের জন্য অবৈধ সুবিধা তৈরি হয়েছে।

“রাজনীতিক, আমলা ও দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীরা রাষ্ট্রীয় সম্পদ, ব্যাংক ব্যবস্থা ও উন্নয়ন প্রকল্প ব্যবহার করে নিজেদের সম্পদ বৃদ্ধি করেছে। সাধারণ মানুষ জীবনের মৌলিক প্রয়োজন পূরণের লড়াইয়ে ব্যস্ত থেকেছে।”

তিনি লক্ষ্য করেছেন যে, দেশের উন্নয়ন মূলত ঢাকাকেন্দ্রিক হয়েছে। মহানগরের আশপাশে বসবাসকারী দুই কোটি মানুষের চাহিদা পূরণের জন্য বিভিন্ন অবকাঠামো ও শিক্ষা-চিকিৎসা ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছে। ফলশ্রুতিতে একটি ছোট্ট ধনী শ্রেণি রাষ্ট্রীয় সম্পদ নিজের মধ্যে ভাগাভাগি করেছে, আর গ্রাম, মফস্বল ও প্রান্তিক অঞ্চলের জনগণ বঞ্চিত হয়েছে।

২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লবকে তিনি গণবিদ্রোহ হিসেবে উল্লেখ করেছেন, যার লক্ষ্য ছিল পুরনো বৈষম্যমূলক কাঠামো ভেঙে ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা।

ফ্যাসিবাদী শাসন ও রাষ্ট্রীয় অপকর্ম

নাহিদ ইসলাম ১৫ বছরের ফ্যাসিবাদী শাসনের মধ্যে গুম, হত্যা, বিনাবিচারে কারাবন্দি, হামলা, নির্যাতন ও মিথ্যা মামলার বিষয়েও সতর্ক করেছেন। তিনি বলেন, এই অপকর্মে রাষ্ট্রের সকল প্রতিষ্ঠান—পুলিশ, র‌্যাব, বিজিবি, এনএসআই, বিচার বিভাগ ও সশস্ত্র বাহিনী—সক্রিয়ভাবে ব্যবহৃত হয়েছে।

বিবৃতি অনুযায়ী, জুলাই বিপ্লবের পর পুরনো কাঠামো ভেঙে পড়েছে, তবে কিছু সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তা এখনও দায়িত্বে রয়েছে। নাহিদ ইসলাম ঘোষণা করেছেন, সকল অপরাধীকে শনাক্ত করা হবে এবং যথাযথ তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে শাস্তি নিশ্চিত করা হবে।

অর্থনৈতিক ক্ষতি ও পুনর্গঠন

নাহিদ ইসলাম উল্লেখ করেন, ফ্যাসিবাদী শাসনামলে প্রায় ২৩৪ বিলিয়ন ডলার বিদেশে পাচার হয়েছে। শ্বেতপত্র অনুযায়ী, হাসিনা ও তার মদদপুষ্ট আমলা এবং ব্যবসায়ীরা এই অর্থ সরিয়ে নিয়েছে। তিনি আশ্বাস দেন যে, এনসিপি সরকার গঠিত হলে এই অর্থ দেশে ফিরিয়ে আনা হবে এবং লুটপাট ও পাচারের সঙ্গে যুক্ত কোনো ব্যক্তিকে ছাড় দেওয়া হবে না।

“অন্তর্বর্তীকালীন সরকার লুটপাটকৃত অর্থ উদ্ধার করতে ব্যর্থ হয়েছে। আমরা লুটপাটকারীদের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করে একটি ‘পাবলিক ট্রাস্ট’-এর মালিকানায় নিয়ে আসব।”

প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা পুনর্গঠন

নাহিদ ইসলাম বলেছেন, খুনি হাসিনার আমলে সশস্ত্র বাহিনী দলের স্বার্থে ব্যবহৃত হয়েছিল। বর্তমান ডিফেন্স বাজেটের প্রায় ৭০% কর্মকর্তা-কর্মচারীর বেতন-ভাতায় ব্যয় হয়। তিনি ঘোষণা করেন, সরকার গঠিত হলে বাহিনীকে আধুনিক, প্রযুক্তিনির্ভর এবং হাই-টেক হিসেবে পুনর্গঠন করা হবে। এছাড়া, ১৮ ঊর্ধ্ব সব তরুণ-তরুণীর জন্য বাধ্যতামূলক মিলিটারি ট্রেনিং চালু করা হবে।

অর্থনীতি, কৃষি ও বাজার ব্যবস্থায় সংস্কার

নাহিদ ইসলাম বলেন, বাজারে দ্রব্যমূল্য স্থিতিশীল রাখা এবং কৃষিপণ্যের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করা হবে। তিনি চাঁদাবাজ ও মধ্যস্বত্বভোগী ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট ভেঙে দেবে এবং ন্যায্য বাজার ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার জন্য ডিজিটাল সরবরাহ ব্যবস্থা চালু করবে। এছাড়া, দেশকে দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে বিনিয়োগবান্ধব রাষ্ট্রে পরিণত করার প্রতিশ্রুতি দেন।

শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে সংস্কার

নাহিদ ইসলাম বলেন, স্বাধীনতার পর শিক্ষা ব্যবস্থা এবং স্বাস্থ্য খাত চরমভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছে। শিক্ষক নিয়োগ, শিক্ষার মান ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো দুর্নীতি ও সুপারিশের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। স্বাস্থ্য খাত প্রাতিষ্ঠানিক লুটপাটের কারণে সাধারণ মানুষ পর্যাপ্ত সেবা পাচ্ছে না। এনসিপি সরকার এই খাতগুলো সংস্কারের মাধ্যমে জনগণকে সেবা নিশ্চিত করবে।

বিচার ব্যবস্থা ও প্রশাসনিক সংস্কার

নাহিদ ইসলাম বলেন, বিচার ব্যবস্থা দীর্ঘ, ক্লান্তিকর ও ঘুষ-দূষিত হয়ে গেছে। তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, বিচার ব্যবস্থার ডিজিটালাইজেশন, বিচারকের সংখ্যা বৃদ্ধি ও ঘুষ-ভিত্তিক রায় প্রতিরোধের মাধ্যমে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা হবে।

তিনি আরও বলেন, উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে স্থানীয় ক্ষমতা হস্তান্তর করা হবে, যাতে জনগণ নিজস্ব সিদ্ধান্ত গ্রহণে অংশ নিতে পারে। স্থানীয় নির্বাচন ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা হবে।

নারীর অধিকার ও মানবাধিকার

নাহিদ ইসলাম নারীর নিরাপত্তা ও অধিকার শতভাগ নিশ্চিত করার অঙ্গীকার করেছেন। সরকারি চাকরি, রাজনীতি, স্থানীয় সরকারসহ সব পর্যায়ে নারীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হবে। এছাড়া, নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করা হবে এবং সমাজে প্রতিবাদী সংস্কৃতি গড়ে তোলা হবে।

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও কূটনীতি

তিনি বলেন, বাংলাদেশকে স্বাধীন, স্বকীয় ও মর্যাদাপূর্ণ কূটনীতির পথে এগিয়ে নেওয়া হবে। প্রতিবেশী দেশগুলো ও সার্ক, আসিয়ানসহ অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থার সঙ্গে সম্পর্ক পুনরুজ্জীবিত করা হবে। প্রবাসী বাংলাদেশিদের সেবা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে।

নাহিদ ইসলারের বক্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে যে, তিনি চাইছেন বাংলাদেশকে ন্যায়বিচার, স্বচ্ছতা এবং মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার রাষ্ট্রে রূপান্তরিত করতে। প্রশাসন, প্রতিরক্ষা, অর্থনীতি, বিচার ব্যবস্থা ও মানবাধিকার সংস্কার তার প্রস্তাবিত পরিকল্পনার মূল দিক।

সর্বাধিক পঠিত