জ্বালানি তেলের দাম নিয়ে যে বার্তা দিল সরকার, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্ববাজারে বাড়ছে জ্বালানি তেলের দাম। তবে ঈদের আগে দাম না বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে সরকার, চালু হয়েছে রেশনিং ব্যবস্থাও।
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে বিশ্ববাজারে দ্রুত বাড়ছে জ্বালানি তেলের দাম। এর প্রভাব পড়ছে বিভিন্ন দেশের জ্বালানি নীতিতেও। দক্ষিণ কোরিয়া সরকার অভ্যন্তরীণ বাজারে মূল্য নিয়ন্ত্রণে নতুন পদক্ষেপ হিসেবে প্রায় তিন দশকের মধ্যে প্রথমবারের মতো পেট্রোলিয়ামজাত জ্বালানির ওপর সর্বোচ্চ মূল্যসীমা নির্ধারণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। একই সময়ে বাংলাদেশ সরকারও দেশের জ্বালানি সরবরাহ পরিস্থিতি নিয়ে আশ্বাস দিচ্ছে এবং বাজারে শৃঙ্খলা আনতে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে।
বিশ্ববাজারে ব্যারেলপ্রতি তেলের দাম ইতোমধ্যে ১১৪ ডলার ছাড়িয়ে গেছে। এই প্রেক্ষাপটে বিভিন্ন দেশ জ্বালানি সরবরাহ ও মূল্য নিয়ন্ত্রণে জরুরি পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হচ্ছে।
বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার প্রভাব
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করেছে। এর ফলে দ্রুত বাড়ছে জ্বালানি তেলের দাম, যা অনেক দেশের অর্থনীতিতে চাপ সৃষ্টি করছে।
দক্ষিণ কোরিয়ার সরকার এই পরিস্থিতিতে ব্যতিক্রমী পদক্ষেপ নিয়েছে। দেশটির প্রেসিডেন্ট লি জে-মিয়ং জরুরি মন্ত্রিসভা বৈঠকে ঘোষণা দেন যে, ভোক্তা ও শিল্প খাতকে অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব থেকে রক্ষা করতে সরকার দ্রুত ব্যবস্থা কার্যকর করবে।
তিনি জানান, জ্বালানি তেলের বাজারে অস্থিতিশীলতা মোকাবিলায় সরকার কঠোরভাবে মূল্যসীমা নির্ধারণ করবে।
সাধারণত দক্ষিণ কোরিয়ায় জ্বালানির দাম আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সমন্বয় করে বাড়ানো বা কমানো হয়। এ ক্ষেত্রে সরকার কর সমন্বয় বা ভর্তুকির মাধ্যমে বাজারকে নিয়ন্ত্রণ করে। তবে বৈশ্বিক অস্থিরতার কারণে এবার প্রায় ৩০ বছরের মধ্যে প্রথমবার দেশটি সরাসরি সর্বোচ্চ মূল্যসীমা নির্ধারণের পথে হাঁটছে।
বিশ্ববাজারে তেলের দামের সর্বশেষ পরিস্থিতি জানতে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের বিশ্লেষণ দেখা যেতে পারে —
জ্বালানি তেলের দাম বৈশ্বিক পরিস্থিতি।
দেশের জ্বালানি সরবরাহ পরিস্থিতি
বাংলাদেশে সরকার বলছে, দেশে জ্বালানি তেলের পর্যাপ্ত মজুদ রয়েছে এবং সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
তবে বাস্তব পরিস্থিতিতে অনেক স্থানে গ্রাহকদের দুর্ভোগের খবর পাওয়া যাচ্ছে। দেশের বিভিন্ন পেট্রল পাম্পে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও মোটরসাইকেল ও ব্যক্তিগত গাড়ির চালকরা অনেক সময় তেল পাচ্ছেন না। ফলে অনেকেই তেল না নিয়েই ফিরে যেতে বাধ্য হচ্ছেন।
যাত্রীবাহী বাস ও পণ্য পরিবহনকারী গাড়িগুলোর ক্ষেত্রেও একই ধরনের সংকট দেখা গেছে। কোথাও কোথাও তেলের মজুদ শেষ হয়ে যাওয়ায় কিছু ফিলিং স্টেশন সাময়িকভাবে বন্ধ রাখছেন মালিকরা।
এ ছাড়া পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে কিছু ব্যক্তি অবৈধভাবে তেল মজুদ করছেন বলেও অভিযোগ উঠেছে।
রাজধানীতে মোবাইল কোর্ট অভিযান
জ্বালানি সরবরাহ পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করতে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় রাজধানীর বিভিন্ন ফিলিং স্টেশনে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করেছে।
জ্বালানি বিভাগ জানায়, এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে রাজধানীর বিভিন্ন পেট্রল পাম্পে অভিযান চালিয়ে মজুদ পরিস্থিতি পর্যালোচনা করা হয়।
অভিযানে যেসব ফিলিং স্টেশনে নিয়ম অনুযায়ী তেল সরবরাহ চালু রয়েছে, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে—
-
আসাদ গেটের মেসার্স সোনার বাংলা ফিলিং স্টেশন
-
মেসার্স তালুকদার ফিলিং স্টেশন
-
গাবতলীর মেসার্স শাহানাজ ফিলিং স্টেশন
-
মেসার্স এসপি ফিলিং স্টেশন
-
মেসার্স ডেনসো ফিলিং স্টেশন
-
তেজগাঁও ক্লিন ফুয়েল স্টেশন
-
মেসার্স আল-মাহমুদ ফিলিং স্টেশন
-
কল্যাণপুরের কমফোর্ট ফিলিং অ্যান্ড সিএনজি স্টেশন
-
মেসার্স মোহনা ফিলিং স্টেশন
-
মহাখালীর ইউরেকা ফিলিং স্টেশন
এসব স্টেশনে নিয়ম মেনে তেল বিক্রি চলমান রয়েছে বলে জানানো হয়েছে।
যেসব পাম্পে তেল নেই
অভিযান চলাকালে রাজধানীর কয়েকটি ফিলিং স্টেশনকে ‘ড্রাই’ বা তেলশূন্য অবস্থায় পাওয়া গেছে।
এর মধ্যে রয়েছে—
-
তেজগাঁওয়ের সিটি ফিলিং স্টেশন
-
আরএস এন্টারপ্রাইজ
-
রয়েল ফিলিং স্টেশন
-
মহাখালীর তশোফা ফিলিং স্টেশন
-
কল্যাণপুরের সাহিল ফিলিং স্টেশন
-
সোহরাব সার্ভিসেস ফিলিং স্টেশন
-
দারুস সালামের খালেক সার্ভিস স্টেশন
তবে সিটি ফিলিং স্টেশন কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তেলবাহী গাড়ি পৌঁছালেই দ্রুত সরবরাহ পুনরায় শুরু করা হবে।
অন্যদিকে মহাখালীর সোহাগ ফিলিং স্টেশনে প্রায় ৩ হাজার ৫০০ লিটার অকটেনের মজুদ থাকলেও পরিমাপে কিছু অসংগতি পাওয়া যায়। পরে তা সংশোধন করে আবার তেল বিক্রি শুরু করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
ঈদের আগে জ্বালানি তেলের দাম বাড়বে কি?
ঈদুল ফিতর সামনে রেখে সাধারণ মানুষের মধ্যে একটি বড় প্রশ্ন তৈরি হয়েছে— ঈদের আগে জ্বালানি তেলের দাম বাড়বে কি না।
এ বিষয়ে সড়ক পরিবহন, রেল ও নৌপরিবহন মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম পরিষ্কারভাবে জানিয়েছেন যে, ঈদের আগে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর কোনো পরিকল্পনা সরকারের নেই।
মন্ত্রী বলেন, জ্বালানি সংকটের অজুহাতে যেন ঈদ যাত্রা ব্যাহত না হয় কিংবা পরিবহন ভাড়া বাড়ানো না হয়, সে বিষয়ে সরকার কঠোর অবস্থানে থাকবে।
তিনি আরও বলেন, দেশে বর্তমানে জ্বালানি তেলের মজুদ সন্তোষজনক এবং নিরাপদ অবস্থায় রয়েছে। ঈদ যাত্রা নির্বিঘ্ন রাখতে বাসসহ অন্যান্য পরিবহনের জন্য পর্যাপ্ত জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা হবে।
তার ভাষায়, জ্বালানির ঘাটতির কারণে ঈদ যাত্রায় কোনো ধরনের সমস্যা সৃষ্টি হবে না এবং যাত্রীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত ভাড়া নেওয়ার সুযোগও দেওয়া হবে না।
জ্বালানি তেলের দাম নিয়ন্ত্রণে রেশনিং ব্যবস্থা
দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি সংকট এড়াতে বাংলাদেশে রেশনিং পদ্ধতিতে তেল বিক্রি শুরু হয়েছে।
রবিবার (৮ মার্চ) থেকে এই ব্যবস্থা আনুষ্ঠানিকভাবে চালু করেছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)।
রেশনিং ব্যবস্থার আওতায় যানবাহনের ধরন অনুযায়ী প্রতিদিন নির্দিষ্ট পরিমাণ জ্বালানি নেওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়েছে।
আরও বিস্তারিত বিশ্লেষণ পড়তে পারেন
জ্বালানি তেলের দাম ও জ্বালানি সংকট বিশ্লেষণ — Shikor TV Canada।
কত লিটার তেল নেওয়া যাবে

বিপিসির নির্দেশনা অনুযায়ী প্রতিদিন তেল সংগ্রহের সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে।
মোটরসাইকেল
-
দিনে সর্বোচ্চ ২ লিটার পেট্রল বা অকটেন
ব্যক্তিগত গাড়ি
-
দিনে সর্বোচ্চ ১০ লিটার
এসইউভি ও মাইক্রোবাস
-
দিনে ২০–২৫ লিটার
পিকআপ ও লোকাল বাস
-
দিনে ৭০–৮০ লিটার ডিজেল
দূরপাল্লার বাস ও ট্রাক
-
দিনে ২০০–২২০ লিটার
এ ছাড়া তেল কেনার সময় অবশ্যই রসিদ নিতে হবে এবং পরবর্তীবার তেল সংগ্রহের সময় সেই রসিদ দেখাতে হবে।
তেল নিয়ে উদ্বিগ্ন না হওয়ার আহ্বান
এর আগে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু জানিয়েছেন, তেল নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার কোনো কারণ নেই।
তিনি বলেন, সোমবার (৯ মার্চ) আরও দুটি তেলবাহী জাহাজ দেশে আসছে।
তার বক্তব্য অনুযায়ী, সরকার মূলত যুদ্ধ পরিস্থিতির অনিশ্চয়তার কারণে রেশনিং ব্যবস্থা চালু করেছে। তবে অনেক মানুষ এটিকে সংকটের ইঙ্গিত মনে করে অতিরিক্ত তেল মজুদ করতে শুরু করেছেন।
মন্ত্রী বলেন, “আমরা আগেও বলেছি, এখনো বলছি—তেল নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার কোনো কারণ নেই। দেশে তেলের কোনো অভাব নেই। মানুষ ভয় পেয়ে অপ্রয়োজনীয়ভাবে মজুদ করছে।”
সামগ্রিক চিত্র
বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম দ্রুত বাড়লেও বাংলাদেশ সরকার বলছে, দেশে পর্যাপ্ত মজুদ রয়েছে এবং সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
তবে বাজারে আতঙ্ক, অতিরিক্ত মজুদ এবং সরবরাহ ব্যবস্থার অসংগতি কিছু জায়গায় সমস্যার সৃষ্টি করছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার একদিকে মোবাইল কোর্ট অভিযান চালাচ্ছে, অন্যদিকে রেশনিং পদ্ধতির মাধ্যমে জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় নিয়ন্ত্রণ আনার চেষ্টা করছে।
ঈদুল ফিতর সামনে রেখে সরকারের আশ্বাস—জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক থাকবে এবং দাম বাড়ানোর কোনো পরিকল্পনা আপাতত নেই।




