বাংলাদেশে নিপাহ ভাইরাসে প্রথম মৃত্যু ২০২৬ নিয়ে WHO-এর গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা। ১ জনের মৃত্যু, সংক্রমণের ঝুঁকি ও পরিস্থিতি বিশ্লেষণ।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) জানিয়েছে, বাংলাদেশে নিপাহ ভাইরাসে প্রথম মৃত্যু ২০২৬ সালে নিশ্চিত হয়েছে। উত্তরাঞ্চলীয় একটি এলাকায় বসবাসকারী এক নারী নিপাহ ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন। WHO বলছে, এই মৃত্যু জনস্বাস্থ্য পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা তৈরি করেছে, কারণ বাংলাদেশে প্রায় প্রতিবছরই নিপাহ ভাইরাসের সংক্রমণ শনাক্ত হয়।
এই ঘটনা এমন এক সময়ে সামনে এলো, যখন প্রতিবেশী ভারতেও নিপাহ ভাইরাসের একাধিক সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছে এবং এশিয়ার বিভিন্ন দেশে বিমানবন্দরে স্বাস্থ্য পরীক্ষার ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে।
WHO-এর বিবৃতি: কোথায়, কখন ও কেন এই মৃত্যু গুরুত্বপূর্ণ
WHO-এর তথ্য অনুযায়ী, আক্রান্ত নারীটির বয়স আনুমানিক ৪০ থেকে ৫০ বছরের মধ্যে। তিনি গত মাসে নিপাহ ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। বাংলাদেশে নিপাহ ভাইরাসে প্রথম মৃত্যু ২০২৬ হিসেবে এই ঘটনাটি নথিভুক্ত হয়েছে।
WHO জানিয়েছে, আক্রান্ত ব্যক্তির কোনো ভ্রমণ ইতিহাস ছিল না। তবে তার কাঁচা খেজুরের রস পান করার ইতিহাস ছিল, যা নিপাহ ভাইরাস সংক্রমণের একটি পরিচিত ঝুঁকিপূর্ণ উৎস হিসেবে চিহ্নিত।
বাংলাদেশে নিপাহ ভাইরাস প্রায় প্রতি বছরই শনাক্ত হয় বলে WHO উল্লেখ করেছে। ফলে এই মৃত্যুকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখলেও, নজরদারি ও সতর্কতা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা আবারও সামনে এসেছে।
রোগের সময়রেখা: উপসর্গ থেকে মৃত্যু
WHO-এর বিবরণ অনুযায়ী, আক্রান্ত নারীটি ২১ জানুয়ারি নিপাহ ভাইরাসের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ উপসর্গ অনুভব করতে শুরু করেন। শুরুতে তার জ্বর ও মাথাব্যথা দেখা দেয়।
পরবর্তী সময়ে তার শরীরে আরও গুরুতর উপসর্গ দেখা দেয়, যার মধ্যে ছিল—
-
অতিরিক্ত লালা নিঃসরণ
-
মানসিক বিভ্রান্তি
-
খিঁচুনি
উপসর্গ শুরুর প্রায় এক সপ্তাহ পর তিনি মারা যান। মৃত্যুর এক দিন পর পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত করা হয় যে তিনি নিপাহ ভাইরাসে আক্রান্ত ছিলেন। এই সময়রেখা বাংলাদেশে নিপাহ ভাইরাসে প্রথম মৃত্যু ২০২৬–এর ঘটনাটিকে স্পষ্টভাবে চিহ্নিত করে।
সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের অবস্থা
WHO জানিয়েছে, আক্রান্ত নারীর সংস্পর্শে এসেছিলেন এমন ৩৫ জন ব্যক্তিকে শনাক্ত করে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে। পরীক্ষার ফল অনুযায়ী, তাদের সবাই নিপাহ ভাইরাসে নেগেটিভ হিসেবে শনাক্ত হয়েছেন।
এ পর্যন্ত নতুন কোনো সংক্রমণ ধরা পড়েনি বলে WHO নিশ্চিত করেছে। এটি ইঙ্গিত দেয় যে, এই ঘটনাটি থেকে ব্যাপক মানব-থেকে-মানব সংক্রমণের প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
নিপাহ ভাইরাস কীভাবে ছড়ায়
নিপাহ ভাইরাস মূলত বাদুড় দ্বারা দূষিত খাদ্যপণ্য থেকে মানুষের শরীরে প্রবেশ করে। WHO বলছে, সংক্রমণের প্রধান উৎসগুলোর মধ্যে রয়েছে—
-
বাদুড়ে কামড়ানো ফল
-
কাঁচা খেজুরের রস
ভাইরাসটি মানুষের মধ্যে সহজে ছড়ায় না, তবে একবার সংক্রমিত হলে এটি অত্যন্ত প্রাণঘাতী হতে পারে। WHO-এর তথ্য অনুযায়ী, নিপাহ ভাইরাসে মৃত্যুহার ৭৫ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে।
এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশে নিপাহ ভাইরাসে প্রথম মৃত্যু ২০২৬ জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের কাছে একটি উচ্চ ঝুঁকির সতর্ক সংকেত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
প্রতিবেশী দেশ ও আঞ্চলিক প্রভাব
বাংলাদেশের এই ঘটনা ঘটার আগে প্রতিবেশী ভারতে নিপাহ ভাইরাসের দুটি সংক্রমণ শনাক্ত হয়। বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গে সংক্রমণের খবর প্রকাশের পর এশিয়ার বিভিন্ন দেশে বিমানবন্দরে স্বাস্থ্য পরীক্ষা জোরদার করা হয়।
মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়া ও পাকিস্তানসহ কয়েকটি দেশ বিমানবন্দরে যাত্রীদের তাপমাত্রা পরীক্ষা শুরু করে।
তবে WHO স্পষ্ট করে জানিয়েছে, বর্তমান তথ্যের ভিত্তিতে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে রোগ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি কম বলে বিবেচিত হচ্ছে।
ভ্রমণ ও বাণিজ্য নিয়ে WHO-এর অবস্থান
WHO শুক্রবার দেওয়া এক বিবৃতিতে জানায়, নিপাহ ভাইরাসের বর্তমান পরিস্থিতিতে কোনো ধরনের ভ্রমণ বা বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা আরোপের প্রয়োজন নেই।
সংস্থাটি বলেছে, বাংলাদেশে নিপাহ ভাইরাসে প্রথম মৃত্যু ২০২৬ হলেও, পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে এবং এখন পর্যন্ত আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্যঝুঁকি সীমিত।
আগের বছরগুলোর চিত্র: ২০২৫ সালের তথ্য
WHO-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বাংলাদেশে চারটি পরীক্ষাগারে নিশ্চিত নিপাহ ভাইরাসজনিত মৃত্যুর ঘটনা রিপোর্ট করা হয়েছিল। এটি প্রমাণ করে যে, নিপাহ ভাইরাস বাংলাদেশে নতুন কোনো রোগ নয়, বরং একটি পুনরাবৃত্ত জনস্বাস্থ্য চ্যালেঞ্জ।
চিকিৎসা ও প্রতিরোধ: বর্তমান বাস্তবতা
বর্তমানে নিপাহ ভাইরাসের জন্য কোনো লাইসেন্সপ্রাপ্ত ওষুধ বা টিকা নেই। চিকিৎসা মূলত উপসর্গভিত্তিক এবং সহায়ক ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল।
WHO এবং স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘদিন ধরেই কাঁচা খেজুরের রস পান থেকে বিরত থাকার পরামর্শ দিয়ে আসছেন, বিশেষ করে শীত মৌসুমে যখন নিপাহ সংক্রমণের ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি থাকে।
বাংলাদেশে নিপাহ ভাইরাসে প্রথম মৃত্যু ২০২৬: জনস্বাস্থ্য বার্তা
এই মৃত্যুর ঘটনাটি আবারও স্মরণ করিয়ে দেয় যে, বাংলাদেশে নিপাহ ভাইরাসে প্রথম মৃত্যু ২০২৬ কেবল একটি পরিসংখ্যান নয়, বরং সচেতনতা ও প্রতিরোধমূলক আচরণের গুরুত্ব তুলে ধরার একটি সতর্ক বার্তা।
WHO-এর মতে, সময়মতো নজরদারি, দ্রুত শনাক্তকরণ এবং ঝুঁকিপূর্ণ অভ্যাস পরিহারই ভবিষ্যতে বড় ধরনের প্রাদুর্ভাব ঠেকানোর প্রধান উপায়।




