বিজিবির নতুন ৩০২৩ সদস্য শপথ গ্রহণ করেছেন চট্টগ্রামে। রেকর্ডসংখ্যক রিক্রুটের কুচকাওয়াজ, উপদেষ্টার বক্তব্য ও বিজিবির ঐতিহাসিক অর্জনের পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন।
বিজিবির নতুন ৩০২৩ সদস্য শপথ—এই বাক্যটি শুধু একটি আনুষ্ঠানিক ঘোষণাই নয়, বরং বাংলাদেশের সীমান্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থায় এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা। বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)-এর ইতিহাসে রেকর্ডসংখ্যক নবীন সদস্য একসঙ্গে দেশমাতৃকার সার্বভৌমত্ব ও অখণ্ডতা রক্ষার শপথ গ্রহণ করেছেন।
বুধবার (১৪ জানুয়ারি) সকালে চট্টগ্রামের সাতকানিয়ায় অবস্থিত বর্ডার গার্ড ট্রেনিং সেন্টার অ্যান্ড কলেজ (বিজিটিসিএন্ডসি)-এর বীর উত্তম মজিবুর রহমান প্যারেড গ্রাউন্ডে অনুষ্ঠিত হয় বিজিবির ১০৪তম রিক্রুট ব্যাচের প্রশিক্ষণ সমাপনী কুচকাওয়াজ। এই আয়োজন বিজিবির ইতিহাসে একটি স্মরণীয় ও গৌরবোজ্জ্বল দিন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
বিজিবির নতুন ৩০২৩ সদস্য শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান: যা ঘটেছে

এই গুরুত্বপূর্ণ আয়োজনে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন স্বরাষ্ট্র ও কৃষি মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী (অব.)। তিনি নবীন সৈনিকদের শপথ গ্রহণ করান এবং কুচকাওয়াজ পরিদর্শন ও অভিবাদন গ্রহণ করেন।
অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন—
-
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব নাসিমুল গনি
-
বিজিবির মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আশরাফুজ্জামান সিদ্দিকী
-
বিজিটিসিএন্ডসি’র কমান্ড্যান্ট
-
সামরিক ও বেসামরিক প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা
সশস্ত্র সালামের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু হয়। এরপর নবীন সৈনিকদের তেজোদীপ্ত কুচকাওয়াজ উপস্থিত সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করে।
সীমান্তের অতন্দ্র প্রহরী হিসেবে বিজিবির ভূমিকা
উপদেষ্টার বক্তব্যে বিজিবির নতুন ৩০২৩ সদস্য শপথ প্রসঙ্গটি বিশেষ গুরুত্ব পায়। তিনি বলেন, ২৩০ বছরের ঐতিহ্যবাহী এই বাহিনী আজ একটি সুসংগঠিত, চৌকষ ও পেশাদার বাহিনীতে পরিণত হয়েছে।
তিনি আরও উল্লেখ করেন—
-
দেশের ৪,৪২৭ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্ত সুরক্ষা
-
চোরাচালান ও মাদক পাচার প্রতিরোধ
-
মানবপাচার ও আন্তঃসীমান্ত অপরাধ দমন
-
অভ্যন্তরীণ আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় সহায়তা
-
প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় দায়িত্ব পালন
এই সব দায়িত্ব দক্ষতার সঙ্গে পালনের মাধ্যমেই বিজিবি দেশবাসীর আস্থা অর্জন করেছে।
শৃঙ্খলাই সৈনিক জীবনের অলংকার
নবীন সৈনিকদের উদ্দেশ্যে দেওয়া ভাষণে উপদেষ্টা বলেন,
“শৃঙ্খলা হচ্ছে সৈনিক জীবনের অলংকার। আদেশ ও কর্তব্য পালনে যে কখনো পিছপা হয় না, সেই প্রকৃত সৈনিক।”
তিনি সততা, আনুগত্য, নির্ভরযোগ্যতা, বুদ্ধিমত্তা ও উদ্দীপনাকে একটি বাহিনীর পেশাগত দক্ষতার মূল ভিত্তি হিসেবে উল্লেখ করেন। বিজিবির নতুন ৩০২৩ সদস্য শপথ নেওয়ার মাধ্যমে এই মূল্যবোধগুলো বাস্তবে ধারণ করবে—এমন প্রত্যাশাও ব্যক্ত করেন তিনি।
চার মূলনীতিতে উদ্বুদ্ধ হওয়ার আহ্বান
উপদেষ্টা নবীন সৈনিকদের বিজিবির চারটি মূলনীতিতে অনুপ্রাণিত হওয়ার আহ্বান জানান—
-
মনোবল
-
ভ্রাতৃত্ববোধ
-
শৃঙ্খলা
-
দক্ষতা
এই চার নীতিকে ধারণ করে দায়িত্ব পালনের মাধ্যমেই দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা আরও শক্তিশালী হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
সেরা রিক্রুটদের স্বীকৃতি ও অভিনন্দন
অনুষ্ঠানে বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে কৃতিত্বপূর্ণ অবদানের জন্য কয়েকজন নবীন সৈনিককে বিশেষ অভিনন্দন জানানো হয়—
-
সর্ব বিষয়ে সেরা রিক্রুট:
বক্ষ নং ১৫৫ – রিক্রুট আল ইমরান -
শারীরিক উৎকর্ষতায় সেরা:
-
বক্ষ নং ২৭৬৯ – শপিকুল ইসলাম (পুরুষ)
-
বক্ষ নং ১৫১৫ – রিক্রুট লুবনা খাতুন (মহিলা)
-
-
শ্রেষ্ঠ ফায়ারার:
-
বক্ষ নং ১৩৪৭ – রিক্রুট শফিকুর রহমান তামিম (পুরুষ)
-
বক্ষ নং ১৫৩১ – রিক্রুট নাহিদা আক্তার (মহিলা)
-
এই স্বীকৃতি নবীন সদস্যদের মধ্যে আরও দায়িত্ববোধ ও প্রেরণা জোগাবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
রেকর্ড প্রশিক্ষণ ও ঐতিহাসিক অর্জন
উপদেষ্টা জানান, বিজিটিসিএন্ডসি গত ৪৪ বছর ধরে বিজিবির রিক্রুটদের প্রশিক্ষণ দিয়ে আসছে। স্বাধীনতার পর থেকে এ পর্যন্ত ৭২টি ব্যাচ সফলভাবে প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করেছে।
তবে এবারের বিজিবির নতুন ৩০২৩ সদস্য শপথ গ্রহণ একটি ব্যতিক্রমী ও ঐতিহাসিক ঘটনা। যেখানে—
-
মোট রিক্রুট: ৩,০২৩ জন
-
পুরুষ: ২,৯৫০ জন
-
মহিলা: ৭৩ জন
যেখানে প্রশিক্ষণ কেন্দ্রটির স্বাভাবিক সক্ষমতা ৭০০–১,০০০ জন, সেখানে একসঙ্গে ৩ হাজারের বেশি রিক্রুটকে প্রশিক্ষণ দিয়ে বিজিবি স্বাধীনতাত্তোর বাংলাদেশে ইতিহাস সৃষ্টি করেছে।
ট্রিক ড্রিল ও ব্যান্ড ডিসপ্লে
অনুষ্ঠানের শেষভাগে বিজিবির প্রশিক্ষিত সদস্যদের অংশগ্রহণে আকর্ষণীয় ট্রিক ড্রিল এবং সুসজ্জিত বাদকদলের মনোজ্ঞ ব্যান্ড ডিসপ্লে উপস্থাপন করা হয়। এতে পুরো প্যারেড গ্রাউন্ড উৎসবমুখর পরিবেশে ভরে ওঠে।
এই আয়োজনে ঢাকা, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার অঞ্চলের সামরিক ও বেসামরিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, স্থানীয় প্রশাসনের প্রতিনিধি এবং গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত ছিলেন।
সবশেষে উপদেষ্টা বিজিবির অব্যাহত অগ্রযাত্রা ও নবীন সৈনিকদের কর্মজীবনে সাফল্য কামনা করেন।




