কৌশলের নামে গুপ্ত বা সুপ্ত বেশ ধরেনি বিএনপি তারেক রহমানের কঠোর বক্তব্য। ভুক্তভোগী পরিবার, বিচার দাবি ও গণতান্ত্রিক সরকারের প্রতিশ্রুতি বিস্তারিত জানুন।
বিএনপি গুম ও রাষ্ট্রীয় সহিংসতা প্রসঙ্গে আবারও কঠোর ভাষায় কথা বলেছেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, বহু পরিবার আজও অপেক্ষায় আছে—একদিন গুম হয়ে যাওয়া স্বজন ফিরে এসে দরজায় কড়া নাড়বেন। এই অপেক্ষা শুধু পারিবারিক বেদনার বিষয় নয়, বরং রাষ্ট্রের জন্য এক গভীর দায়।
রাজধানীর বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে গুম ও রাষ্ট্রীয় সহিংসতার শিকার পরিবারগুলোর সঙ্গে মতবিনিময় সভায় তিনি বলেন, এ ধরনের নির্যাতনের ক্ষত এতটাই গভীর যে তা সান্ত্বনা দিয়ে পূরণ করা যায় না। গণতন্ত্রে বিশ্বাসী প্রতিটি মানুষকে সজাগ থাকার আহ্বান জানান তিনি।
গুম ও রাষ্ট্রীয় সহিংসতায় ক্ষতবিক্ষত পরিবারগুলোর বাস্তবতা
বিএনপি গুম ও রাষ্ট্রীয় সহিংসতা নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে তারেক রহমান বলেন, ফ্যাসিবাদী শাসনামলে হাজার হাজার মানুষ নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। অনেককে হত্যা করা হয়েছে। আবার হাজারের বেশি মানুষ গুমের শিকার হয়েছেন।
তিনি বলেন, আজও বহু পরিবার প্রিয়জনের ফেরার আশায় দিন গুনছে। এই বাস্তবতা রাষ্ট্র কখনো এড়িয়ে যেতে পারে না। কারণ গুম একটি ব্যক্তিগত অপরাধ নয়, এটি রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতার প্রতিচ্ছবি।
গুম পরিবারের সঙ্গে মতবিনিময় সভার আয়োজন
‘মায়ের ডাক’ ও ‘আমরা বিএনপি পরিবার’—এই দুটি সংগঠনের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত সভায় গুম থেকে ফিরে আসা ও গুমের শিকার পরিবারের সদস্যরা বক্তব্য রাখেন।
সভায় উপস্থিত ছিলেন—
-
সালাহউদ্দিন আহমদ
-
হুম্মাম কাদের চৌধুরী
-
আনিসুর রহমান তালুকদার খোকন
-
রুহুল কবির রিজভী
-
এম. ইলিয়াস আলীর সহধর্মিণী তাহসিনা রুশদী লুনা
তাঁরা প্রত্যেকে নিজেদের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে রাষ্ট্রীয় সহিংসতার ভয়াবহতা বর্ণনা করেন।
বিএনপি গুম ও রাষ্ট্রীয় সহিংসতা: গুপ্ত রাজনীতির অভিযোগ নাকচ

তারেক রহমান স্পষ্ট করে বলেন, বিএনপি গুম ও রাষ্ট্রীয় সহিংসতা বিষয়ে কোনো কৌশলের নামে গুপ্ত বা সুপ্ত রাজনীতি করেনি। বরং অন্যায় ও অত্যাচারের বিরুদ্ধে দলটি সবসময় প্রকাশ্য ও আপসহীন ভূমিকা পালন করেছে।
তিনি বলেন, একই পরিবারের একজন সদস্য গুম হয়েছেন, আরেকজন পরদিন রাজপথে নেমে আন্দোলন চালিয়ে গেছেন। এই দৃঢ়তা বিএনপিকে ষড়যন্ত্র বা অপপ্রচারে দমিয়ে রাখা যাবে না—এমন বিশ্বাস তাঁর।
নির্বাচন কমিশন ও গণতন্ত্র প্রসঙ্গে সতর্ক বার্তা
নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়েও মন্তব্য করেন বিএনপি চেয়ারম্যান। তিনি বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে ইসির বিতর্কিত ভূমিকা লক্ষ করা যাচ্ছে। তবে দায়িত্বশীল রাজনৈতিক দল হিসেবে বিএনপি ধৈর্যের পরিচয় দিচ্ছে।
তারেক রহমানের মতে, বিতর্ক তৈরি করে গণতন্ত্রের পথ যারা ব্যাহত করতে চায়, তাদের বিষয়ে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে। গণতন্ত্র ব্যাহত হলে তা শহীদদের আত্মত্যাগের প্রতি চরম অবিচার হবে।
বিচার ও গণতান্ত্রিক সরকারের অঙ্গীকার
বিএনপি গুম ও রাষ্ট্রীয় সহিংসতা বিষয়ে দলের অবস্থান তুলে ধরে তারেক রহমান বলেন, ১৯৭১ থেকে শুরু করে ৯০-এর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন, বিগত ১৬ বছর এবং সাম্প্রতিক আন্দোলনে যারা শহীদ হয়েছেন—প্রতিটি অন্যায়ের বিচার নিশ্চিত করতে হলে দেশে গণতান্ত্রিক সরকার অপরিহার্য।
তিনি বলেন, বিএনপি সরকার গঠন করতে সক্ষম হলে—
-
গুম ও হত্যার বিচার নিশ্চিত করা হবে
-
শহীদ ও গুমের শিকারদের আত্মত্যাগ রাষ্ট্রীয়ভাবে সংরক্ষণ করা হবে
-
শহীদ পরিবারদের নামে গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও স্থাপনার নামকরণ করা হবে
রাষ্ট্রের দায় এড়ানোর সুযোগ নেই
তারেক রহমান বলেন, গুমখুনের শিকার ব্যক্তিদের দায় রাষ্ট্র কখনো এড়াতে পারে না। ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে যারা স্বজন হারিয়েছেন, ভবিষ্যতের গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র তাদের প্রতি দায়বদ্ধ থাকবে।
তিনি আরও বলেন, রাষ্ট্র কখনোই এই পরিবারগুলোকে ভুলে যেতে পারে না। এটি শুধু রাজনৈতিক অঙ্গীকার নয়, এটি মানবিক দায়িত্ব।
আবেগঘন মুহূর্তে তারেক রহমান
অনুষ্ঠানের শুরুতে গুমের শিকার সন্তানের এক মা তারেক রহমানের সঙ্গে দেখা করতে আসেন। কাছে পেয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি। তারেক রহমান তাঁকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করেন।
এই সময় বিএনপি চেয়ারম্যান নিজেও আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। তাঁকে বারবার টিস্যু দিয়ে চোখ মুছতে দেখা যায়। এই দৃশ্য সভায় উপস্থিত সবার হৃদয় ছুঁয়ে যায়।
রাজনৈতিক মামলার অভিযোগ ও প্রতিবাদ
বিগত সরকারের আমলে বিএনপি নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে করা মামলাগুলো রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে মন্তব্য করেন তারেক রহমান।
তিনি বলেন, গুম, খুন ও নির্যাতনের শিকার হয়েও বিএনপি নেতা-কর্মীরা রাজপথ ছাড়েননি। গণতন্ত্রের অগ্রযাত্রা থামাতে যারা ষড়যন্ত্র করছে, তারা যেন সফল না হয়—এ বিষয়ে সবাইকে সজাগ থাকতে হবে।
প্রধান উপদেষ্টাকে ফুলেল শুভেচ্ছা
এদিকে, বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান ও তাঁর পরিবারের পক্ষ থেকে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে ফুলেল শুভেচ্ছা জানানো হয়েছে।
তারেক রহমানের একান্ত সচিব এ বি এম আবদুস সাত্তার তাঁর পক্ষে এই শুভেচ্ছা প্রধান উপদেষ্টার হাতে তুলে দেন। এ সময় ড. ইউনূসের কন্যা লামিয়া ইউনূস উপস্থিত ছিলেন।
এই সৌজন্য সাক্ষাৎ রাজনৈতিক সৌহার্দ্য ও দায়িত্বশীল আচরণের বার্তা বহন করে।
আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে গুম ও রাষ্ট্রীয় সহিংসতা
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো দীর্ঘদিন ধরেই গুম ও রাষ্ট্রীয় সহিংসতাকে গুরুতর অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করে আসছে।
উদাহরণ হিসেবে Human Rights Watch গুমকে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার লঙ্ঘনের অন্যতম ভয়াবহ রূপ হিসেবে উল্লেখ করেছে।
তারেক রহমান বলেন, স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রপ্রিয় মানুষের সামনে এখন একটি মানবিক ও দায়িত্বশীল রাষ্ট্র গঠনের সুযোগ এসেছে। এই সুযোগ যেন নষ্ট না হয়, সে বিষয়ে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে।
গণতন্ত্রের পথ রুদ্ধ হলে তা শুধু রাজনৈতিক ক্ষতি নয়, বরং শহীদ ও গুমের শিকার মানুষগুলোর আত্মত্যাগের প্রতি চরম অবিচার হবে।




