কানাডার ওপর ১০০ শতাংশ শুল্কের হুমকি দিয়ে ট্রাম্প চীনের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি না করার সতর্কতা দিয়েছেন। কী প্রভাব পড়বে কানাডার অর্থনীতিতে?
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আবারও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য অঙ্গনে উত্তেজনা সৃষ্টি করেছেন। কানাডার ওপর ১০০ শতাংশ শুল্কের হুমকি দিয়ে তিনি স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন—চীনের সঙ্গে কোনো ধরনের বাণিজ্য চুক্তি করলে তার পরিণতি হবে ভয়াবহ। এই হুঁশিয়ারি শুধু দুই দেশের সম্পর্কেই নয়, বরং উত্তর আমেরিকার সামগ্রিক অর্থনৈতিক ভারসাম্য নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।
শনিবার নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম Truth Social-এ দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প সরাসরি কানাডার অবস্থান নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তার মতে, চীনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ বাণিজ্যিক সম্পর্ক কানাডার জন্য বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে।
ট্রাম্পের বক্তব্যে কেন গুরুত্ব পাচ্ছে কানাডার ওপর ১০০ শতাংশ শুল্কের হুমকি

ট্রাম্প তার বার্তায় বলেন, চীন ধীরে ধীরে কানাডাকে “জ্যান্ত গিলে খাবে”। তিনি দাবি করেন, এতে কানাডার ব্যবসা-বাণিজ্য, সামাজিক কাঠামো এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো—কানাডার ওপর ১০০ শতাংশ শুল্কের হুমকি কার্যকর হলে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশকারী প্রতিটি কানাডিয়ান পণ্যের দাম দ্বিগুণ হয়ে যেতে পারে। এতে সীমান্তবর্তী ব্যবসা, শিল্পখাত ও ভোক্তারা সরাসরি ক্ষতির মুখে পড়বেন।
এই হুমকির মধ্য দিয়ে ট্রাম্প মূলত তিনটি বার্তা দিয়েছেন—
-
যুক্তরাষ্ট্র তার বাণিজ্য স্বার্থে আপস করবে না
-
চীনের প্রভাব বিস্তার ঠেকাতে কঠোর অবস্থান নেবে
-
মিত্র দেশ হলেও কানাডাকে ছাড় দেওয়া হবে না
ট্রুথ সোশ্যাল পোস্টে ট্রাম্প কী লিখেছেন
ট্রাম্প তার পোস্টে উল্লেখ করেন,
“চীন কানাডার বাজারে প্রবেশ করলে তারা দেশটির অর্থনৈতিক ভিত ভেঙে দেবে।”
তিনি আরও বলেন, কানাডা যদি চীনের সঙ্গে কোনো চুক্তিতে যায়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করা সব কানাডিয়ান পণ্যের ওপর তাৎক্ষণিকভাবে শতভাগ শুল্ক আরোপ করা হবে।
এই বক্তব্যের মাধ্যমে কানাডার ওপর ১০০ শতাংশ শুল্কের হুমকি শুধু রাজনৈতিক কৌশল নয়, বরং সম্ভাব্য নীতিগত সিদ্ধান্ত হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নির প্রতিক্রিয়া
ট্রাম্পের নাম সরাসরি উল্লেখ না করলেও কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি একটি ভিডিও বার্তায় নিজের অবস্থান পরিষ্কার করেন। তিনি কানাডার জনগণকে দেশীয় পণ্য কেনার আহ্বান জানান।
কার্নি বলেন,
“বিদেশি হুমকির মুখে আমাদের অর্থনীতি এখন চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন। আমরা অন্য দেশের সিদ্ধান্ত নিয়ন্ত্রণ করতে পারি না, তবে নিজেদের সেরা গ্রাহক হয়ে উঠতে পারি।”
এই বক্তব্য থেকে স্পষ্ট, কানাডার ওপর ১০০ শতাংশ শুল্কের হুমকি সরকারকে আত্মনির্ভরতার দিকে আরও জোরালোভাবে ঠেলে দিচ্ছে।
কানাডার অর্থনীতিতে সম্ভাব্য ৩টি বড় প্রভাব
এই শুল্ক কার্যকর হলে কানাডার অর্থনীতিতে অন্তত তিনটি বড় প্রভাব পড়তে পারে—
১. রপ্তানি খাতে বড় ধাক্কা
যুক্তরাষ্ট্র কানাডার সবচেয়ে বড় বাণিজ্য অংশীদার। শুল্ক বাড়লে গাড়ি, কৃষিপণ্য ও শিল্পপণ্য রপ্তানি ব্যয়বহুল হয়ে উঠবে।
২. কর্মসংস্থানে চাপ
রপ্তানিনির্ভর শিল্পে অর্ডার কমলে কর্মসংস্থান ঝুঁকিতে পড়তে পারে। এতে বেকারত্ব বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
৩. ভোক্তা মূল্য বৃদ্ধি
শুল্কের চাপ শেষ পর্যন্ত সাধারণ ভোক্তার ঘাড়েই পড়বে। পণ্যের দাম বাড়লে জীবনযাত্রার ব্যয়ও বৃদ্ধি পাবে।
এই কারণেই কানাডার ওপর ১০০ শতাংশ শুল্কের হুমকি শুধু কূটনৈতিক বিষয় নয়, বরং সরাসরি জনজীবনের সঙ্গে জড়িত।
যুক্তরাষ্ট্র–চীন–কানাডা: বাণিজ্য রাজনীতির নতুন সমীকরণ
বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের এই অবস্থান মূলত চীনের প্রভাব ঠেকানোর কৌশল। যুক্তরাষ্ট্র চায় না, চীন উত্তর আমেরিকার বাজারে শক্ত অবস্থান তৈরি করুক।
বিশ্ব বাণিজ্য সংক্রান্ত তথ্য অনুযায়ী, চীন ও কানাডার মধ্যে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাণিজ্য বাড়ছে। বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যাবে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার বিশ্লেষণে
এই প্রেক্ষাপটে কানাডার ওপর ১০০ শতাংশ শুল্কের হুমকি একটি চাপ সৃষ্টির কৌশল হিসেবেই দেখছেন অনেক বিশেষজ্ঞ।
কানাডার সামনে কী বিকল্প পথ রয়েছে
কানাডার সামনে এখন কয়েকটি বাস্তবসম্মত বিকল্প—
-
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে সমঝোতার চেষ্টা
-
ইউরোপ ও এশিয়ার বিকল্প বাজার খোঁজা
-
দেশীয় উৎপাদন ও ভোক্তা নির্ভরতা বাড়ানো
এই কৌশলগুলো বাস্তবায়ন করতে পারলে কানাডার ওপর ১০০ শতাংশ শুল্কের হুমকি কিছুটা হলেও সামাল দেওয়া সম্ভব হতে পারে।
আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া ও ভবিষ্যৎ পরিস্থিতি
আন্তর্জাতিক মহলে এই বক্তব্য ইতোমধ্যে আলোড়ন তুলেছে। অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, যদি সত্যিই কানাডার ওপর ১০০ শতাংশ শুল্কের হুমকি বাস্তবায়ন হয়, তবে তা বিশ্ব বাণিজ্য ব্যবস্থায় নতুন অস্থিরতা তৈরি করবে।
বিশ্ব অর্থনীতি যখন ধীরে ধীরে স্থিতিশীলতার দিকে যাচ্ছে, তখন এমন কঠোর সিদ্ধান্ত নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি করতে পারে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, কানাডার ওপর ১০০ শতাংশ শুল্কের হুমকি শুধু একটি রাজনৈতিক বক্তব্য নয়। এটি কানাডার অর্থনীতি, যুক্তরাষ্ট্রের কৌশল এবং বৈশ্বিক বাণিজ্যের ভবিষ্যৎ নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত দিচ্ছে। এখন দেখার বিষয়, এই হুমকি বাস্তবায়িত হয় নাকি কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সম্ভব হয়।




