কানাডার সন্ত্রাসী তালিকায় 764 নেটওয়ার্ক যুক্ত হওয়ায় বাড়ছে নজরদারি। যুবসমাজকে টার্গেট করা এই গ্রুপ ঠেকাতে সরকার শক্ত পদক্ষেপ নিয়েছে।
কানাডার সন্ত্রাসী তালিকায় 764 নেটওয়ার্ক যুক্ত হওয়ায় দেশে নতুন করে সতর্কতা জোরদার হয়েছে। বিশেষ করে অনলাইনে সক্রিয় এই নেটওয়ার্ক অল্প বয়সী তরুণদের টার্গেট করায় অভিভাবকদের উদ্বেগ বেড়েছে। কানাডার সন্ত্রাসী তালিকায় 764 নেটওয়ার্ক যুক্ত করা—এই সিদ্ধান্তকে সরকার “বাচ্চাদের সুরক্ষায় প্রয়োজনীয় ও সময়োপযোগী” পদক্ষেপ বলে উল্লেখ করেছে।
সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, অনলাইন গেমিং প্ল্যাটফর্ম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং অল্প বয়সী ব্যবহারকারী বেশি থাকে এমন কমিউনিটিগুলোতে এই গোষ্ঠীর সক্রিয়তা ছিল দীর্ঘদিন ধরে। সরকার বলছে, শুধু কানাডা নয়, আন্তর্জাতিকভাবে এই নেটওয়ার্কের শাখা–প্রশাখা রয়েছে এবং বহু দেশ এখন বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে পর্যবেক্ষণ করছে।
কানাডার সন্ত্রাসী তালিকায় 764 নেটওয়ার্ক যুক্ত হওয়ার পটভূমি

কানাডা সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেছে—764, Maniac Murder Cult, Terrorgram Collective এবং Islamic State–Mozambique—এই চারটি সংগঠনকে সন্ত্রাসী সত্তা হিসেবে Criminal Code-এ অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় রয়েছে 764 নেটওয়ার্ক।
সরকার বলেছে, এই নেটওয়ার্ক অনলাইন প্ল্যাটফর্মে তরুণদের টার্গেট করে। তাদেরকে ভয় দেখানো, নিয়ন্ত্রণ করা, প্রশিক্ষণ দেওয়া এবং অনেক ক্ষেত্রে সহিংস কার্যক্রমে উৎসাহিত করার অভিযোগ রয়েছে। 764-এর আদর্শিক ভিত্তি এসেছে Order of Nine Angles (O9A) নামের এক নব্য নাৎসি–ধারণা থেকে।
এই গোষ্ঠীকে “নৈরাজ্যবাদী, অরাজকতা–কেন্দ্রিক এবং সভ্যতা ধ্বংসে আগ্রহী” বলে উল্লেখ করেছে সরকার।
কানাডার সন্ত্রাসী তালিকায় 764 নেটওয়ার্ক কেন উদ্বেগের কারণ
কানাডার সন্ত্রাসী তালিকায় 764 নেটওয়ার্ক যুক্ত হওয়ার প্রধান কারণ হলো—এটি শিশু ও কিশোরদের লক্ষ্য করে পরিচালিত একটি চরমপন্থী নেটওয়ার্ক।
সরকার ও নিরাপত্তা সংস্থার তথ্য থেকে জানা যায়—
১. অনলাইন গেমিং প্ল্যাটফর্মে সক্রিয়তা
764 সাধারণত এমন প্ল্যাটফর্মে ঘোরাফেরা করে যেখানে কিশোরেরা বেশি থাকে। তারা—
-
ব্যক্তিগত চ্যাটে মেসেজ পাঠায়
-
ভীতি দেখায়
-
মানসিকভাবে প্রভাবিত করে
-
অশালীন বা সহিংস কাজ করিয়ে নেয়
২. অল্প বয়সীদের দিয়ে অপরাধ করানো
সরকারের রিপোর্ট বলছে, গ্রুপের সদস্যরা অনেক সময় বাচ্চাদের দিয়ে—
-
সহিংসতা
-
আত্মক্ষতি
-
প্রাণী নির্যাতন
-
কিংবা যৌন শোষণমূলক কাজে বাধ্য করে
৩. আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক
764 কেবল কানাডাতেই সীমাবদ্ধ নয়। যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপসহ বিভিন্ন দেশে এদের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। এতে নেটওয়ার্কটি আরও জটিল ও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
অপরাধের বাস্তব উদাহরণ: ১৪ বছরের কিশোর গ্রেফতার
২০২4 সালে আলবার্টার লেথব্রিজ শহরে ১৪ বছর বয়সী এক কিশোরকে গ্রেফতার করা হয়। তার বিরুদ্ধে—
-
শিশু পর্নোগ্রাফি তৈরি
-
অনলাইনে ছড়িয়ে দেওয়া
-
এবং 764 নেটওয়ার্কের সদস্য হিসেবে সক্রিয় থাকার অভিযোগ আনা হয়।
আরও একটি ঘটনায়, হ্যালিফ্যাক্সে পুলিশ আরেকজন কিশোরকে গ্রেফতার করে। অভিযোগ—
সে বিশ্বব্যাপী শত শত কিশোরের সঙ্গে যোগাযোগ করে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়ানোর চেষ্টা করেছিল।
CSIS-এর সতর্কবার্তা: ১০টির মধ্যে ১টি সন্ত্রাস তদন্তে কিশোর জড়িত
কানাডার গোয়েন্দা সংস্থা CSIS-এর প্রধান ড্যান রজার্স জানিয়েছেন—
“আজকের দিনে সন্ত্রাস সংক্রান্ত তদন্তের প্রায় ১০%-এ অন্তত একজন অপ্রাপ্তবয়স্ক জড়িত।”
এটি কানাডার জন্য নতুন ধরনের হুমকি, কারণ কিশোররা সহজেই অনলাইন নেটওয়ার্কের টার্গেটে পরিণত হয়।
রজার্স আরও বলেছেন—
-
চরমপন্থী মতাদর্শে আকৃষ্ট হওয়া তরুণের সংখ্যা বাড়ছে
-
যদিও খুব কমই শেষ পর্যন্ত সহিংসতায় নামে
-
কিন্তু যারা নামে, তাদের কারণে ক্ষতির মাত্রা ভয়াবহ
সরকারের নতুন ক্ষমতা: সম্পদ জব্দ ও অভিযানে সুবিধা
Criminal Code-এ তালিকাভুক্ত হওয়ায় এখন সরকার—
-
764-এর সম্পদ জব্দ
-
ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ব্লক
-
গাড়ি বা সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত
-
আইনগতভাবে আরও কঠোর মামলার ব্যবস্থা
করতে পারবে।
পাবলিক সেফটি মিনিস্টার গ্যারি আনন্দাসঙ্গারী বলেছেন—
“এই সিদ্ধান্ত আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে আরও বেশি ক্ষমতা দেবে। বিশেষ করে শিশুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা এখন আমাদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার।”
764 নেটওয়ার্কের লক্ষ্য: ‘ধ্বংসই চূড়ান্ত উদ্দেশ্য’

কানাডা সরকারের ভাষায়—
-
764 কোনও রাজনৈতিক বা ধর্মীয় রাষ্ট্র গঠনের চেষ্টা করছে না
-
বরং তারা “সহিংসতা ও বিশৃঙ্খলাই” চূড়ান্ত লক্ষ্য হিসেবে দেখে
-
তাদের উদ্দেশ্য হলো সভ্য সমাজকে নৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিকভাবে ধ্বংস করা
এই মতাদর্শই 764 নেটওয়ার্ককে আরও ভয়ংকর করে তুলেছে।
বিশেষজ্ঞদের মত: কেন কিশোররা সহজ শিকার?
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন—
• বয়সগত মানসিক দুর্বলতা
কিশোররা আবেগপ্রবণ হয়। সহজেই প্রভাবিত হয়।
• অনলাইন গেমিং কমিউনিটি
যেখানে বন্ধুত্ব বা গ্রুপে থাকা গুরুত্বপূর্ণ—এটি চরমপন্থীদের জন্য আদর্শ জায়গা।
• পরিচয় সংকট
নিজেকে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ করতে চাইলেই এরা ফাঁদে পড়ে।
• ভয় দেখানো ও ব্ল্যাকমেইল
একবার ব্যক্তিগত ছবি বা ভিডিও নেওয়া হলে কিশোরেরা ভয়ে বাধ্য হয়।
অভিভাবকদের জন্য সতর্কতা
বিশেষজ্ঞ ও পুলিশ বলছেন—
-
বাচ্চারা কোন গেম খেলছে নিয়মিত খোঁজ নিন
-
অচেনা লোকের বার্তা উত্তর না দিতে শেখান
-
ফোনে প্যারেন্টাল কন্ট্রোল রাখুন
-
আচরণে হঠাৎ পরিবর্তন দেখলে গুরুত্ব দিন
হুমকি কি বাড়ছে?
সরকার মনে করছে—হ্যাঁ, হুমকি বাড়ছে।
বিশেষ করে ভয়ঙ্কর অংশ হলো—
“অনলাইনে নতুন সদস্যদের ৫০%–এর বেশি বয়স ১৩–১৭ বছরের মধ্যে।”
এখন কানাডা কী করছে?
-
CSIS নজরদারি বাড়িয়েছে
-
পুলিশ ইউনিট বিশেষ প্রশিক্ষণ পেয়েছে
-
অভিভাবকদের সচেতন করতে নতুন ক্যাম্পেইন চলছে
-
স্কুল বোর্ডগুলোকে সতর্ক করা হয়েছে
-
অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলোর সঙ্গে যৌথভাবে কাজ বাড়ানো হয়েছে
অনলাইন চরমপন্থা মোকাবিলায় এটি কানাডার অন্যতম বড় পদক্ষেপ বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।



