চট্টগ্রাম বন্দরে লাগাতার ধর্মঘট শুরু হচ্ছে রবিবার থেকে। ৪ দফা দাবিতে ভয়াবহ অচলাবস্থার আশঙ্কা, বাণিজ্য ও রাজস্বে বড় ক্ষতির সতর্কতা।
চট্টগ্রাম বন্দরে লাগাতার ধর্মঘট শুরু হতে যাচ্ছে রবিবার (৮ ফেব্রুয়ারি) সকাল ৮টা থেকে। নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) বিদেশি অপারেটর ডিপি ওয়ার্ল্ডকে ইজারা দেওয়ার প্রক্রিয়া বাতিলসহ চার দফা দাবিতে এই কর্মসূচির ডাক দিয়েছে চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদ ও শ্রমিক-কর্মচারী ঐক্য পরিষদ (স্কপ)। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রধান সমুদ্রবন্দরটি আবারও চরম অচলাবস্থায় পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
শনিবার দুপুরে চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবের এস রহমান হলে আয়োজিত এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে এ ঘোষণা দেন চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের সমন্বয়ক মো. হুমায়ুন কবীর ও মো. ইব্রাহিম খোকন। তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, কর্মবিরতি স্থগিতের মাত্র দুই দিন পরই ফের এই লাগাতার ধর্মঘট শুরু হতে যাচ্ছে।
কী কারণে আবার ধর্মঘটের ডাক

সংবাদ সম্মেলনে নেতারা জানান, নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল বিদেশি প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ডকে ইজারা দেওয়ার উদ্যোগ অবিলম্বে বাতিল করতে হবে। একই সঙ্গে চট্টগ্রাম বন্দরের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এস এম মনিরুজ্জামানকে অপসারণ এবং তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির তদন্তের দাবি জানানো হয়।
এছাড়া আন্দোলনে অংশ নেওয়া শ্রমিক-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে নেওয়া সব শাস্তিমূলক ব্যবস্থা—বদলি, সাময়িক বরখাস্ত ও চার্জশিট—প্রত্যাহারের দাবি তোলা হয়। শ্রমিক নেতাদের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের মামলা বা আইনি হয়রানি না করার বিষয়টিও দাবির অন্তর্ভুক্ত।
আগের আলোচনা কেন ভেঙে গেল
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, গত ৫ ফেব্রুয়ারি নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেনের সঙ্গে আলোচনার পর পরিস্থিতি সাময়িকভাবে শান্ত হয়েছিল। উপদেষ্টার আশ্বাসে শ্রমিকরা রমজান মাস ও আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন বিবেচনায় রেখে দুই দিনের জন্য কর্মসূচি স্থগিত করেছিলেন।
তবে শ্রমিক নেতাদের অভিযোগ, আলোচনার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই বন্দর চেয়ারম্যান এস এম মনিরুজ্জামান আন্দোলনে যুক্ত ১৫ জন নেতার দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা ও সম্পদ তদন্তের জন্য দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) চিঠি দেন।
শ্রমিক নেতাদের অভিযোগ ও প্রতিক্রিয়া
এই পদক্ষেপকে শ্রমিক নেতারা ‘অনৈতিক’ ও ‘আগুন নিয়ে খেলা’ বলে উল্লেখ করেন। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, বন্দর চেয়ারম্যান পতিত সরকারের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করে চট্টগ্রাম বন্দরকে অস্থিতিশীল করতে চাইছেন।
চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের সমন্বয়ক মো. হুমায়ুন কবীর বলেন, যতক্ষণ পর্যন্ত এনসিটি ইজারা বাতিলের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা এবং শ্রমিকদের ওপর থেকে সব হয়রানিমূলক ব্যবস্থা প্রত্যাহার না করা হবে, ততক্ষণ বন্দরে কোনো কাজ চলবে না।
চট্টগ্রাম বন্দরে লাগাতার ধর্মঘটের সম্ভাব্য প্রভাব
বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, চট্টগ্রাম বন্দরে লাগাতার ধর্মঘট শুরু হলে আমদানিকৃত খাদ্যশস্য, শিল্প কারখানার কাঁচামাল এবং রপ্তানিজাত তৈরি পোশাকবাহী কনটেইনার খালাস পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যেতে পারে।
কয়েক দিন টানা ধর্মঘট চললে—
-
জেটিতে জাহাজের জট সৃষ্টি হবে
-
ইয়ার্ডে কনটেইনার জট ভয়াবহ আকার ধারণ করবে
-
প্রতিদিন শত কোটি টাকার রাজস্ব হারাবে সরকার
শিপিং এজেন্ট ও ব্যবসায়ীদের অতিরিক্ত ডেমারেজ চার্জ গুনতে হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
রমজান মাসে বাজারে চাপের শঙ্কা
রমজান মাস সামনে রেখে এই ধর্মঘট নিত্যপণ্যের সরবরাহ ব্যবস্থায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, খাদ্যপণ্য খালাস ব্যাহত হলে বাজারমূল্য স্থিতিশীল রাখা কঠিন হয়ে পড়বে, যা সাধারণ ভোক্তাদের জন্য চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
কারা ছিলেন সংবাদ সম্মেলনে
সংবাদ সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের সমন্বয়ক ইফতেখার কামাল খান, এস কে খোদা তোতন, মো. হারুন, তসলিম হোসেন সেলিম ও ফজলুল কবির মিন্টুসহ অন্যান্য নেতৃবৃন্দ।
জাতীয় বাণিজ্যের জন্য উদ্বেগ
দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর হিসেবে চট্টগ্রাম বন্দরের কার্যক্রম দেশের আমদানি-রপ্তানি ও সামগ্রিক অর্থনীতির সঙ্গে সরাসরি জড়িত। ফলে চট্টগ্রাম বন্দরে লাগাতার ধর্মঘট দীর্ঘ হলে জাতীয় বাণিজ্য, শিল্প উৎপাদন ও রাজস্ব আদায়ে বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট মহল।
এ ধরনের শ্রমিক আন্দোলন ও বন্দর সংকট নিয়ে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলোও অতীতে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। উদাহরণ হিসেবে চট্টগ্রাম বন্দরে লাগাতার ধর্মঘট সংক্রান্ত বাণিজ্যিক প্রভাব নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ পাওয়া যায় (এখানে BBC/Reuters ধরনের বিশ্লেষণমূলক প্রতিবেদন বোঝানো হয়েছে)।




