CUSMA পৃথক চুক্তি নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত দিয়েছে। কানাডা–মার্কিন বাণিজ্য ভবিষ্যৎ নিয়ে কী পরিবর্তন আসছে, জেনে নিন বিস্তারিত।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন CUSMA পৃথক চুক্তি নিয়ে নতুন দিক নির্দেশনা দিচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান বাণিজ্য আলোচক জেমিসন গ্রিয়ার জানিয়েছেন, উত্তর আমেরিকার বর্তমান তিন-পাক্ষিক বাণিজ্য কাঠামো ভেঙে কানাডা ও মেক্সিকোর সঙ্গে আলাদা আলাদা দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য চুক্তির সম্ভাবনা খতিয়ে দেখছে হোয়াইট হাউস।
এই অবস্থান উত্তর আমেরিকান বাণিজ্যের ভবিষ্যৎ নিয়ে বড় প্রশ্ন তৈরি করেছে।
যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোর মধ্যে বিদ্যমান Canada-U.S.-Mexico Agreement (CUSMA) ২০২৬ সালে নবায়নের সময়সীমায় পৌঁছাবে। তবে এখনই ভিন্ন স্বর শোনা যাচ্ছে মার্কিন প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ নীতি-ব্যক্তিদের কাছ থেকে।
CUSMA পৃথক চুক্তি নিয়ে গ্রিয়ারের স্পষ্ট বার্তা
ওয়াশিংটনভিত্তিক আন্তর্জাতিক নীতি গবেষণা প্রতিষ্ঠান Atlantic Council-এর আয়োজিত এক আলোচনায় জেমিসন গ্রিয়ার বলেন যে আমেরিকার কানাডার সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক ও মেক্সিকোর সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রকৃতির।
গ্রিয়ারের ভাষায়:
“আমাদের শ্রম পরিস্থিতি ভিন্ন, আমদানি–রফতানি কাঠামো ভিন্ন, এমনকি আইনের শাসন ব্যবস্থাও ভিন্ন। তাই দুই দেশকে আলাদা আলাদাভাবে আলোচনায় বসা যৌক্তিক।”
গ্রিয়ারের এই মন্তব্য কার্যত তিন দশক ধরে এক ছাতার নিচে উত্তর আমেরিকার বাণিজ্য ব্যবস্থার যাত্রাকে নতুন দিকে নিয়ে যাচ্ছে। NAFTA থেকে CUSMA—উত্তর আমেরিকার বাণিজ্য সহযোগিতা দীর্ঘদিন ধরে তিন দেশের ঐক্যবদ্ধ কাঠামোর ওপরই দাঁড়িয়ে ছিল।
কিন্তু এখন পরিস্থিতি বদলাতে পারে।
কেন কানাডা-মার্কিন সম্পর্ক আলাদা আলোচনার দাবি রাখে

গ্রিয়ারের মতে, কানাডা যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম নির্ভরযোগ্য বাণিজ্য অংশীদার। দুই দেশের মধ্যে বিনিয়োগ প্রবাহ স্থিতিশীল। শিল্প-বাণিজ্যের বহু খাতে প্রযুক্তিগত মান, শ্রম নীতি ও আইনগত সুরক্ষা একে অপরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
এই কারণে মার্কিন প্রশাসনের কাছে কানাডার সঙ্গে CUSMA পৃথক চুক্তি বাস্তবায়ন অপেক্ষাকৃত সহজ ও কার্যকর হতে পারে।
অন্যদিকে মেক্সিকোতে শ্রমবাজারের কাঠামো ভিন্ন, উৎপাদন খরচ ভিন্ন এবং আইন প্রয়োগের অবস্থাও বহু ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারে না বলে ট্রাম্প প্রশাসনের একাধিক কর্মকর্তা আগেই দাবি করে এসেছেন।
মেক্সিকোর সঙ্গে সম্পর্ক কেন আলাদা পথে
ট্রাম্প প্রশাসনের ধারাবাহিক বক্তব্য অনুযায়ী:
-
মেক্সিকোর শ্রমমান অনেক ক্ষেত্রে নিম্ন
-
উৎপাদনচক্রে কম খরচে অপ্রতিযোগিতামূলক সুবিধা পায় মেক্সিকো
-
যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানিকারক অনেক সংস্থা নিয়ম-নীতি এড়িয়ে সুবিধা নেয়
-
সাপ্লাই চেইনে স্বচ্ছতার ঘাটতি রয়েছে
এই কারণে মেক্সিকোর সঙ্গে নতুন কোনও দ্বিপাক্ষিক চুক্তি করতে চাইলে সেটা আরও কঠোর নীতি বা কঠোর শুল্ক কাঠামো অনুসরণ করতে হতে পারে।
২০২৬ নবায়নকে সামনে রেখে সময়ের চাপ
CUSMA-এর ভবিষ্যৎ নির্ধারণের সময়সীমা ২০২৬। তিন দেশকে আগামী ১ জুলাইয়ের মধ্যে স্পষ্ট করতে হবে তারা—
-
চুক্তি বাড়াতে চায় কি না
-
শর্ত সংশোধন করতে চায় কি না
-
নাকি চুক্তি পুরোপুরি বাতিল করতে চায়
মার্কিন কংগ্রেসকে জানাতে গ্রিয়ারের হাতে সময় রয়েছে ২০২৫ সালের ২ জানুয়ারি পর্যন্ত। তাঁর রিপোর্টই মূলত ট্রাম্প প্রশাসনের ভবিষ্যৎ অবস্থান নির্ধারণ করবে।
গ্রিয়ার বলেন,
“চুক্তি থেকে বের হওয়াও সম্ভব, সংশোধন করাও সম্ভব, আবার সম্পূর্ণভাবে পুনরায় আলোচনাও সম্ভব।”
CUSMA পৃথক চুক্তি—২০১৯–২০২৫ সময়ের উত্তেজনার ফলাফল
গত কয়েক বছরে বিভিন্ন শিল্পখাত যুক্তরাষ্ট্রের সামনে অভিযোগ নিয়ে এসেছে।
নিয়ম-নীতি ভাঙার অভিযোগ
অনেক মার্কিন শিল্প দাবি করছে, কিছু কানাডিয়ান কোম্পানি চীনের সস্তা পণ্য উৎপাদন চেইনে যুক্ত করে অবশেষে CUSMA-এর ট্যারিফ-ফ্রি সুবিধা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে সেসব পণ্য পাঠাচ্ছে।
এই অভিযোগকে কেন্দ্র করে “rules of origin”—অর্থাৎ কোনও পণ্য আসলে কোন দেশে উৎপাদিত—তা নির্ধারণের জটিল নিয়ম আরও কঠোর করার পক্ষে যুক্তি তুলে ধরছেন গ্রিয়ার।
তিন দেশের শিল্পখাতের দাবিদাওয়া
ঠিক এক সপ্তাহ আগে ওয়াশিংটনে অনুষ্ঠিত পাবলিক কনসালটেশনে উত্তর আমেরিকার বিভিন্ন শিল্পখাত CUSMA ধরে রাখার পক্ষে জোরালো অবস্থান নেয়। তাঁদের দাবি—CUSMA ভেঙে গেলে সাপ্লাই চেইনে বড় ধাক্কা লাগবে এবং বিনিয়োগ অনিশ্চয়তা তৈরি হবে।
আমেরিকার অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক প্রভাব
মার্কিন নির্বাচনী রাজনীতিতে বাণিজ্য সবসময়ই গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু।
ট্রাম্প প্রশাসন “আমেরিকা ফার্স্ট” নীতি সামনে রেখে চুক্তির পুনঃমূল্যায়নকে রাজনৈতিক সুবিধায় পরিণত করার কৌশলও নিতে পারে।
গ্রিয়ার সম্প্রতি Politico-কে বলেন,
“প্রেসিডেন্ট শুধু ভালো চুক্তিই চান। তাই USMCA/CUSMA-তে রিভিউ পিরিয়ড রাখা হয়েছিল—যদি প্রয়োজন হয় সংশোধন, পুনর্বিবেচনা বা চুক্তি থেকে বের হওয়ার জন্য।”
কিরস্টিন হিলম্যানের পদত্যাগও আলোচনায়
এদিকে কানাডার দীর্ঘদিনের মার্কিন রাষ্ট্রদূত কিরস্টিন হিলম্যান সম্প্রতি পদত্যাগের ঘোষণা দিয়েছেন। সময়ের সঙ্গে ঘটনাটিকে অনেকে CUSMA–সংক্রান্ত অনিশ্চয়তার সঙ্গে যুক্ত করে দেখছেন, যদিও হিলম্যান বলেছেন সিদ্ধান্ত সম্পূর্ণ তাঁর নিজস্ব।
CUSMA পৃথক চুক্তি—বাণিজ্যের ভবিষ্যতে সম্ভাব্য প্রভাব
যদি যুক্তরাষ্ট্র সত্যিই পৃথক দ্বিপাক্ষিক চুক্তির পথে এগোয়, তাহলে— সাপ্লাই চেইন পুনর্বিন্যাস
কানাডার অনেক নির্মাতা প্রতিষ্ঠান যুক্তরাষ্ট্রকে প্রধান বাজার হিসেবে দেখে। দ্বিপাক্ষিক আলাদা নিয়ম প্রয়োগ হলে খরচ বাড়তে পারে।
মেক্সিকোর শ্রমনীতি চাপের মুখে
মেক্সিকোর শ্রমমান উন্নয়ন ও সাপ্লাই চেইনে স্বচ্ছতা বাড়ানোর চাপ আরও বাড়বে।
বিনিয়োগ বাজারে অস্থিরতা
নতুন চুক্তি বা পুরনো চুক্তি বাতিল—দুই পরিস্থিতিতেই নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে।
কানাডা–মার্কিন সম্পর্ক তুলনামূলক স্থিতিশীল
দুই দেশের সম্পর্ক ঐতিহাসিকভাবে ঘনিষ্ঠ। তাই আলাদা চুক্তি হলেও আলোচনাগুলো ইতিবাচক পরিবেশে হবে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।
উত্তর আমেরিকার বাণিজ্য কাঠামো আগামী বছর বড় মোড় নিতে পারে। CUSMA পৃথক চুক্তি নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের ইঙ্গিত আন্তর্জাতিক বাজারে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। তিন দেশের সিদ্ধান্ত এখন নজর কাড়ছে বিশ্ব অর্থনীতির পর্যবেক্ষকদের কাছে।
আগামী কয়েক মাসে হোয়াইট হাউস কী অবস্থান নেয়—সেটাই এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু।



