ডিসেম্বর রেমিট্যান্স প্রবাহ ইতিবাচকভাবে বেড়ে প্রথম সাত দিনে এসেছে ৮৭ কোটি ডলার। বছর ব্যবধানে প্রবৃদ্ধি উল্লেখযোগ্য হওয়ায় অর্থনীতিতে নতুন গতি যোগ হয়েছে।
চলতি ডিসেম্বরের প্রথম সাত দিনে ডিসেম্বর রেমিট্যান্স প্রবাহ নতুন গতি পেয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদন বলছে, মাত্র সাত দিনে দেশে এসেছে ৮৭ কোটি ৬০ লাখ মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স। দৈনিক গড় হিসেবে এটি দাঁড়ায় ১২ কোটি ৫১ লাখ ডলার। এই প্রবাহ শুধু মাসের শুরুতেই প্রবাসী আয়ের ইতিবাচক ধারা তৈরি করেছে নয়, বরং বছর ব্যবধানে একটি শক্তিশালী অগ্রগতি হিসেবে দেখা দিচ্ছে।
সোমবার (৮ ডিসেম্বর) প্রকাশিত কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হালনাগাদ প্রতিবেদনে এই তথ্য আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করা হয়েছে। গত বছরের একই সময়ের তুলনায় এ বছর রেমিট্যান্স প্রবাহ অনেক বেশি। গত বছরের প্রথম সাত দিনে যেখানে এসেছিল ৬১ কোটি ৬০ লাখ ডলার, সেখানে এবার এসেছে ৮৭ কোটি ৬০ লাখ ডলার—অর্থাৎ প্রবৃদ্ধির হার উল্লেখযোগ্য।
দেশের অর্থনীতিতে প্রবাসী আয়ের এই ধারাবাহিকতা একদিকে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভকে শক্তিশালী করছে, অন্যদিকে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ধরে রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
ডিসেম্বর রেমিট্যান্স প্রবাহ: প্রথম সাত দিনে শক্তিশালী অগ্রগতি
এই সময়ে রেমিট্যান্স প্রবাহ বৃদ্ধির পেছনে বেশ কিছু প্রভাবশালী কারণ কাজ করছে। প্রথমত, বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে অর্থ পাঠানোর ক্ষেত্রে সরকারের দেওয়া প্রণোদনা ও উৎসাহমূলক ব্যবস্থা। দ্বিতীয়ত, এক্সচেঞ্জ হাউজগুলোর সক্রিয় তৎপরতা প্রবাসীদের এ উৎসাহকে আরও বাড়িয়েছে।
এছাড়া ডিসেম্বরের বিভিন্ন উৎসব ও বছরের শেষ দিকে দেশে অর্থ পাঠানোর প্রবণতাও রেমিট্যান্স বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখছে। বিশেষ করে বিদেশফেরতদের আস্থা বাড়ায় বৈধ পথে লেনদেনে স্বচ্ছতা।

গত ৭ ডিসেম্বর একদিনেই দেশে এসেছে ২৪ কোটি ৪০ লাখ ডলার রেমিট্যান্স, যা চলমান প্রবাহের একটি শক্ত প্রতিফলন।
অর্থবছরের হিসেবে উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি
চলতি অর্থবছর (২০২৫–২৬) এর জুলাই থেকে ৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত মোট রেমিট্যান্স এসেছে ১ হাজার ৩৬৭ কোটি ১০ লাখ মার্কিন ডলার। গত বছরের একই সময়ে এই অঙ্ক ছিল ১ হাজার ১৭৩ কোটি ২০ লাখ ডলার। অর্থাৎ এ বছর এ সময়ে বৃদ্ধি হয়েছে ১৯৩ কোটি ৯০ লাখ ডলার, যা প্রবৃদ্ধির হারে দাঁড়ায় ১৬ দশমিক ৫ শতাংশ।
এই পরিসংখ্যান দেখায় যে প্রবাসী আয়ের এই ঊর্ধ্বমুখী ধারা কেবল মাসিক ভিত্তিতেই নয়, বরং সমগ্র অর্থবছরেই অব্যাহত রয়েছে।
মাসভিত্তিক রেমিট্যান্সে ঊর্ধ্বমুখী ধারা
বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়—
-
জুলাই: ২৪৭ কোটি ৭৮ লাখ ডলার
-
আগস্ট: ২৪২ কোটি ১৯ লাখ ডলার
-
সেপ্টেম্বর: ২৬৮ কোটি ৫৮ লাখ ডলার
-
অক্টোবর: ২৫৬ কোটি ৩৫ লাখ ডলার
-
নভেম্বর: ২৮৮ কোটি ৯৫ লাখ ২০ হাজার ডলার
নভেম্বর মাসে রেমিট্যান্স অঙ্ক সাম্প্রতিক মাসগুলোর তুলনায় বেশি হওয়ায় ডিসেম্বরেও ধারাবাহিকতা বজায় থাকবে বলে আশা করা হচ্ছে।
গত অর্থবছরের রেকর্ড এখনও প্রাসঙ্গিক
২০২৪–২৫ অর্থবছরের মার্চ মাসে রেমিট্যান্স পৌঁছেছিল সর্বোচ্চ ৩২৯ কোটি ডলারে—যা ছিল ওই অর্থবছরের সর্বোচ্চ রেকর্ড। পুরো অর্থবছরে প্রবাসী আয়ের পরিমাণ দাঁড়িয়েছিল ৩০ দশমিক ৩৩ বিলিয়ন ডলার। আগের বছরের তুলনায় এটি ২৬ দশমিক ৮ শতাংশ বেশি ছিল।
এই রেকর্ড শুধুমাত্র আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক অবস্থার মধ্যেও বাংলাদেশের প্রবাসী আয়ের সক্ষমতা তুলে ধরে।
রেমিট্যান্স বৃদ্ধির কারণ: বিশেষজ্ঞদের দৃষ্টিভঙ্গি
অর্থনীতিবিদদের মতে, কয়েকটি কারণ রেমিট্যান্স প্রবাহকে শক্তিশালী করেছে:
-
ব্যাংকিং চ্যানেলে প্রণোদনা বৃদ্ধি
-
হুন্ডি কমে বৈধ পথে অর্থপ্রেরণ বৃদ্ধি
-
ডিজিটাল ব্যাংকিং সুবিধা
-
এক্সচেঞ্জ রেটের সমন্বয়
-
আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে বাংলাদেশি শ্রমিকের চাহিদা বৃদ্ধি
এছাড়া ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য, মালয়েশিয়া ও দক্ষিণ কোরিয়ায় নতুন কর্মসংস্থান সুযোগও প্রবাসী আয়ের টেকসই বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখছে।
অর্থনীতিতে সম্ভাব্য প্রভাব
রেমিট্যান্স হচ্ছে বৈদেশিক মুদ্রার সবচেয়ে স্থিতিশীল উৎসগুলোর একটি। ডিসেম্বরের প্রথম সাত দিনে এ পরিমাণ রেমিট্যান্স আসা অর্থনীতিতে কয়েকটি ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে:
-
বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী হবে
-
আমদানি ব্যয় ব্যবস্থাপনায় স্বস্তি বাড়বে
-
টাকার স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সহায়তা করবে
-
ভোক্তা বাজারে ইতিবাচক চাপ সৃষ্টি করবে
-
ব্যাংকিং চ্যানেলের আস্থা বাড়াবে
সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংক মনে করছে, রেমিট্যান্স বৃদ্ধির এই ধারা চলতি অর্থবছরের সামগ্রিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে বড় ভূমিকা পালন করবে।
ভবিষ্যৎ প্রত্যাশা
বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণে দেখা যায়, ডিসেম্বর মাসে রেমিট্যান্স প্রবাহ আরও বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। কারণ প্রবাসীরা সাধারণত বছরের শেষ দিকে পরিবার ও আত্মীয়স্বজনের প্রয়োজনীয়তা এবং বিনিয়োগ–সংক্রান্ত কারণে বেশি অর্থ পাঠান।
এছাড়া মালয়েশিয়া, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে নতুন শ্রমবাজার খোলায় আগামী মাসগুলোতে রেমিট্যান্স আয় আরও বৃদ্ধি পেতে পারে।




