৮ থেকে ১৩ ফেব্রুয়ারি ডিজিটাল লেনদেনে ‘রেড অ্যালার্ট’, জারি করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ৮–১৩ ফেব্রুয়ারি মোবাইল ও ইন্টারনেট ব্যাংকিংয়ে কঠোর সীমা কার্যকর হচ্ছে।
ডিজিটাল লেনদেনে রেড অ্যালার্ট জারি করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে অর্থের অপব্যবহার ঠেকাতে নেওয়া হয়েছে এই কঠোর সিদ্ধান্ত। আগামী ৮ থেকে ১৩ ফেব্রুয়ারি, টানা ছয় দিন দেশের সব ধরনের মোবাইল ব্যাংকিং ও ইন্টারনেট ব্যাংকিং কার্যক্রমে বড় ধরনের সীমাবদ্ধতা কার্যকর হবে।
এই সময়ের মধ্যে বিকাশ, নগদ, রকেটসহ সব মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (MFS) ব্যবহারে দৈনিক লেনদেনের সীমা কমিয়ে আনা হয়েছে। একই সঙ্গে ইন্টারনেট ব্যাংকিংয়ের ব্যক্তি থেকে ব্যক্তি টাকা পাঠানোর সুবিধা পুরোপুরি বন্ধ রাখার প্রস্তুতিও চলছে।
নির্বাচনের আগে ডিজিটাল টাকার চলাচলে এমন কড়াকড়ি বাংলাদেশে এই প্রথম। ফলে গ্রাহক, ব্যবসায়ী ও আর্থিক খাতে তৈরি হয়েছে নতুন আলোচনা।
৮–১৩ ফেব্রুয়ারি কেন ডিজিটাল লেনদেনে রেড অ্যালার্ট
বাংলাদেশ ব্যাংক ও বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) সূত্র জানিয়েছে, নির্বাচন কমিশনের অনুরোধেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। মূল লক্ষ্য একটাই—ভোটের আগে অর্থ ব্যবহার করে ভোটার প্রভাবিত করার সুযোগ বন্ধ করা।
নির্বাচনী সময়ে অতীতে নগদ ও ডিজিটাল উভয় মাধ্যমেই অবৈধ লেনদেনের অভিযোগ উঠেছিল। এবার সেই ঝুঁকি কমাতেই আগেভাগে সতর্কতা জারি করা হয়েছে। তাই ডিজিটাল লেনদেনে রেড অ্যালার্ট কার্যকর করে পুরো ব্যবস্থাকে কড়া নজরদারিতে আনা হচ্ছে।
মোবাইল ব্যাংকিংয়ে কত টাকা লেনদেন করা যাবে
নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী—
-
দিনে সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা পাঠানো যাবে
-
একবারে লেনদেনের সীমা ১ হাজার টাকা
-
বিকাশ, নগদ, রকেটসহ সব এমএফএসে এই নিয়ম প্রযোজ্য
অর্থাৎ বড় অঙ্কের টাকা পাঠানো কার্যত অসম্ভব হয়ে পড়ছে। আগে যেখানে দিনে সর্বোচ্চ ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত লেনদেন করা যেত, সেখানে হঠাৎ এমন কড়াকড়ি গ্রাহকদের জন্য বড় পরিবর্তন।
বিশেষ করে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও অনলাইন উদ্যোক্তাদের জন্য এই সময়টা বেশ চ্যালেঞ্জিং হতে পারে।
ইন্টারনেট ব্যাংকিংয়ে ব্যক্তি থেকে ব্যক্তি লেনদেন বন্ধ
ডিজিটাল লেনদেনে রেড অ্যালার্টের আওতায় আরও কঠোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে ইন্টারনেট ব্যাংকিংয়ে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে—
-
ব্যক্তি থেকে ব্যক্তি টাকা পাঠানো সম্পূর্ণ বন্ধ থাকতে পারে
-
জনপ্রিয় ব্যাংকিং অ্যাপগুলোও এর বাইরে নয়
যেসব অ্যাপে এই নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হতে পারে—
-
ব্র্যাক ব্যাংকের আস্থা
-
সিটি ব্যাংকের সিটিটাচ
-
ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের নেক্সাস পে
এতে করে অনেক নিয়মিত গ্রাহক বিকল্প উপায়ের দিকে ঝুঁকতে বাধ্য হতে পারেন।
নগদ টাকা উত্তোলন ও জমায় কড়া নজরদারি
ডিজিটাল লেনদেনে রেড অ্যালার্ট শুধু অনলাইন লেনদেনেই সীমাবদ্ধ নয়। একই সঙ্গে নগদ অর্থের ওপরও কড়া নজরদারি শুরু হয়েছে।
নতুন নিয়ম অনুযায়ী—
-
এক দিনে ১০ লাখ টাকা বা তার বেশি লেনদেন হলে
-
তা বাধ্যতামূলকভাবে বিএফআইইউকে রিপোর্ট করতে হবে
যদি রিপোর্টে কোনো অসঙ্গতি ধরা পড়ে, তাহলে সংশ্লিষ্ট ব্যাংককেও শাস্তির মুখে পড়তে হতে পারে। ফলে ব্যাংকগুলো এখন অতিরিক্ত সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রজ্ঞাপন আসছে
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র জানিয়েছেন, নির্বাচন কমিশনের চাহিদা অনুযায়ী খুব শিগগিরই এ বিষয়ে সরকারি প্রজ্ঞাপন জারি করা হবে। প্রয়োজনে পরিস্থিতি বিবেচনায় লেনদেনের সীমা আরও কমানো বা বাড়ানো হতে পারে।
এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে বাংলাদেশ ব্যাংক, বিএফআইইউ এবং বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো একযোগে কাজ করছে।
গ্রাহক ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে প্রতিক্রিয়া
ডিজিটাল লেনদেনে রেড অ্যালার্ট ঘোষণার পর থেকেই গ্রাহক ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে।
অনেকে মনে করছেন, নির্বাচনের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে এই পদক্ষেপ জরুরি। আবার কেউ কেউ বলছেন, হঠাৎ এমন সিদ্ধান্তে দৈনন্দিন ব্যবসা ও অনলাইন লেনদেন ব্যাহত হবে।
বিশেষ করে—
-
ই-কমার্স ব্যবসা
-
ফ্রিল্যান্সার
-
ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা
এই শ্রেণির মানুষের জন্য ছয় দিনের এই সময়টা বেশ চাপের হতে পারে।
নির্বাচন ঘিরে নজিরবিহীন ডিজিটাল নিয়ন্ত্রণ

বিশ্লেষকদের মতে, এবার নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ডিজিটাল অর্থনীতিতে যে নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়েছে, তা সত্যিই নজিরবিহীন। আগে কখনো মোবাইল ব্যাংকিং ও ইন্টারনেট ব্যাংকিং একসঙ্গে এত কঠোরভাবে সীমিত করা হয়নি।
ডিজিটাল লেনদেনে রেড অ্যালার্ট কার্যকর হওয়ায় নির্বাচনী সময়ে অর্থের প্রবাহ অনেকটাই নিয়ন্ত্রিত থাকবে—এমনটাই আশা সংশ্লিষ্টদের।
কীভাবে প্রস্তুতি নেবেন গ্রাহকরা
এই ছয় দিনের জন্য গ্রাহকদের কিছু বিষয়ে আগেভাগে প্রস্তুতি নেওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা—
-
জরুরি লেনদেন আগে থেকেই সম্পন্ন করা
-
বিকল্প পেমেন্ট পদ্ধতির পরিকল্পনা রাখা
-
বড় অঙ্কের লেনদেন এ সময় এড়িয়ে চলা
সচেতন থাকলে এই সাময়িক সীমাবদ্ধতা সহজেই সামাল দেওয়া সম্ভব।
ডিজিটাল নিরাপত্তা ও নির্বাচন: সরকারের বার্তা
ডিজিটাল লেনদেনে রেড অ্যালার্টের মাধ্যমে সরকার ও নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো স্পষ্ট বার্তা দিতে চাচ্ছে—নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় কোনো ধরনের অর্থনৈতিক অনিয়ম সহ্য করা হবে না।
এই উদ্যোগ সফল হলে ভবিষ্যতে নির্বাচনকেন্দ্রিক আর্থিক নজরদারির নতুন দৃষ্টান্ত তৈরি হতে পারে।




