ইসি সাংবিধানিক দায়িত্বে দুর্বলতা নিয়ে টিআইবির ৮টি গুরুত্বপূর্ণ নেতিবাচক পর্যবেক্ষণ প্রকাশ। গণভোট ও প্রাক-নির্বাচন পরিস্থিতিতে ইসির ভূমিকা বিশ্লেষণ।
নির্বাচন কমিশন (ইসি) তাদের ওপর অর্পিত সাংবিধানিক দায়িত্ব ও ক্ষমতা কার্যকরভাবে প্রয়োগে দৃশ্যমান দুর্বলতা দেখাচ্ছে বলে মন্তব্য করেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। রাজধানী ঢাকার ধানমণ্ডিতে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, রাজনৈতিক চাপ, প্রশাসনিক নিষ্ক্রিয়তা এবং আইনি বিভ্রান্তির কারণে নির্বাচন কমিশন কাঙ্ক্ষিত ভূমিকা রাখতে পারছে না। এই প্রেক্ষাপটে ইসি সাংবিধানিক দায়িত্বে দুর্বলতা বিষয়টি নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রে এসেছে।
সংবাদ সম্মেলনের প্রেক্ষাপট ও প্রতিবেদন

রবিবার (৮ ফেব্রুয়ারি) ধানমণ্ডিতে টিআইবির কার্যালয়ে ‘গণভোট ও প্রাক-নির্বাচন পরিস্থিতি : টিআইবির পর্যবেক্ষণ’ শীর্ষক একটি প্রতিবেদন উপস্থাপন করা হয়। ওই প্রতিবেদনের মূল আলোচ্য বিষয় ছিল নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা, গণভোট ঘিরে সরকারের অবস্থান এবং সামগ্রিক নির্বাচনী পরিবেশ।
ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ইসি সাংবিধানিকভাবে স্বাধীন হলেও বাস্তবে সেই ক্ষমতার প্রয়োগে ঘাটতি স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
রাজনৈতিক চাপ ও আচরণবিধি লঙ্ঘন
টিআইবির নির্বাহী পরিচালক জানান, রাজনৈতিক দলগুলোর চাপের মুখে নির্বাচন কমিশন বহু ক্ষেত্রে দৃঢ় অবস্থান নিতে ব্যর্থ হচ্ছে। অনলাইন ও অফলাইন—উভয় ক্ষেত্রেই আচরণবিধির ব্যাপক লঙ্ঘন এবং অনিয়মের ঘটনা ঘটলেও কার্যকর ব্যবস্থা নিতে ইসি সক্ষম হয়নি।
তার ভাষায়, এ ধরনের পরিস্থিতি ইসি সাংবিধানিক দায়িত্বে দুর্বলতাকে আরও প্রকট করে তুলছে এবং নির্বাচনী প্রক্রিয়ার বিশ্বাসযোগ্যতা প্রশ্নের মুখে ফেলছে।
প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একটি অংশ নিরপেক্ষ ও প্রভাবমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করতে নিষ্ক্রিয় ভূমিকা পালন করছে। এতে করে মাঠপর্যায়ে নির্বাচন পর্যবেক্ষণ ও তথ্য সংগ্রহের কাজ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
টিআইবি জানায়, তথ্য সংগ্রাহকদের হয়রানি ও হুমকির ঘটনাও উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে, যা গণতান্ত্রিক পরিবেশের জন্য নেতিবাচক ইঙ্গিত।
গণভোট ইস্যুতে সরকারের দোদুল্যমান অবস্থান
গণভোট নিয়ে সরকারের ভূমিকা নিয়েও গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন ড. ইফতেখারুজ্জামান। তিনি বলেন, প্রভাবশালী রাজনৈতিক দলগুলোর বিপরীতমুখী অবস্থানের কারণে সরকার শুরু থেকেই দোদুল্যমান ছিল।
উভয় পক্ষকে সন্তুষ্ট করার চেষ্টায় যে অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছে, তা গণভোটের প্রশ্ন ও উদ্দেশ্যকে আরও অস্পষ্ট করেছে বলে টিআইবি মনে করে।
একই দিনে নির্বাচন ও গণভোট: জটিলতা বাড়ার অভিযোগ
টিআইবির পর্যবেক্ষণে বলা হয়, একই দিনে নির্বাচন ও গণভোট আয়োজনের সিদ্ধান্ত পুরো প্রক্রিয়াকে অপ্রয়োজনীয়ভাবে জটিল করে তুলেছে।
ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, এটি একটি বড় ধরনের কাঠামোগত সমস্যা তৈরি করেছে, যা বাস্তবায়ন ও তদারকির ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনের সক্ষমতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।
গণভোটকে ‘নির্বাচন’ হিসেবে বিবেচনার আইনি বিতর্ক
সবচেয়ে বড় আইনি বিচ্যুতি হিসেবে টিআইবি উল্লেখ করে যে, নির্বাচন কমিশন গণভোটকে ‘নির্বাচন’-এর সমার্থক হিসেবে বিবেচনা করছে।
তিনি ব্যাখ্যা করেন, গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) অনুযায়ী গণভোট কোনোভাবেই নির্বাচনের সমার্থক নয়। কারণ গণভোটে কোনো ব্যক্তি বা আসনের পক্ষে ভোট প্রদান করা হয় না। এই ভুল ব্যাখ্যা ইসি সাংবিধানিক দায়িত্বে দুর্বলতাকে আরও স্পষ্ট করেছে।
সরকারি কর্মচারী ও প্রচারণা বিতর্ক
তফসিল ঘোষণার পর সরকারি কর্মচারীরা আইনত নির্বাচন কমিশনের অধীনে থাকলেও সরকার তাদের গণভোটের পক্ষে প্রচারণার নির্দেশনা দিয়েছে—এ নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে বলে মন্তব্য করেন ড. ইফতেখারুজ্জামান।
তার মতে, এ ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে নির্বাচন কমিশনের সম্মতি নেওয়া প্রয়োজন ছিল, যা করা হয়নি।
ইসির নিষ্ক্রিয়তা ও আর্থিক স্বচ্ছতার প্রশ্ন
টিআইবির অভিযোগ, নির্বাচন কমিশন এ ক্ষেত্রে আইনের ভুল ব্যাখ্যার ওপর নির্ভর করে কার্যত নিষ্ক্রিয় ভূমিকা পালন করেছে।
এছাড়া ব্যাংক, এনজিওসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ওপর সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া, গণভোট পরিচালনায় অর্থায়ন এবং ব্যয়ের স্বচ্ছতা নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে সংস্থাটি।
রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনতা ও গণতন্ত্র
ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, জুলাই অভ্যুত্থানের মূল প্রত্যাশা অনুযায়ী জবাবদিহিমূলক গণতন্ত্র ও সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য বিচার বিভাগসহ সব রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের পূর্ণ স্বাধীনতা নিশ্চিত করা ছাড়া বিকল্প নেই।
তার মতে, নির্বাচন কমিশনের কার্যকর ও স্বাধীন ভূমিকা ছাড়া গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া টেকসই হতে পারে না।
নাগরিকদের প্রতি টিআইবির আহ্বান
সংবাদ সম্মেলনের শেষাংশে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক দেশবাসীকে দুর্নীতির বিরুদ্ধে স্পষ্টভাবে ‘না’ এবং জুলাই সনদের আলোকে রাষ্ট্র সংস্কারের পক্ষে ‘হ্যাঁ’ বলার আহ্বান জানান।
এই আহ্বানের মধ্য দিয়েই ইসি সাংবিধানিক দায়িত্বে দুর্বলতা প্রসঙ্গে নাগরিক সচেতনতার গুরুত্ব তুলে ধরে টিআইবি।
নির্বাচন কমিশন নিয়ে আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট
বিশ্বব্যাপী নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতা গণতন্ত্রের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ হিসেবে বিবেচিত। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার বিশ্লেষণেও দেখা যায়, শক্তিশালী ও স্বাধীন নির্বাচন কমিশন ছাড়া বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন সম্ভব নয়।




