নির্বাচনী প্রচারণা শুরু নির্দেশনা অনুযায়ী প্রার্থীদের জন্য নতুন নিয়ম, জনসভা, মাইক ব্যবহার ও শাস্তির বিস্তারিত জানুন এক প্রতিবেদনে।
নির্বাচনী প্রচারণা শুরু নির্দেশনা অনুযায়ী আজ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রচারণা। নির্বাচন কমিশনের (ইসি) ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হবে জাতীয় সংসদ নির্বাচন। একই দিনে অনুষ্ঠিত হবে গণভোটও। এই প্রেক্ষাপটে নির্বাচনী পরিবেশ শান্তিপূর্ণ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ রাখতে প্রার্থীদের জন্য একগুচ্ছ নতুন ও সংশোধিত নির্দেশনা জারি করেছে ইসি।
নির্বাচনী প্রচারণা শুরু নির্দেশনা কার্যকরের মাধ্যমে প্রার্থীদের আচরণ, জনসভা, মাইক ব্যবহার, পোস্টার-ব্যানার এবং সরকারি প্রকল্পসংক্রান্ত কর্মকাণ্ডে আরও কঠোর সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে। এসব নিয়ম লঙ্ঘন করলে এবার শাস্তির মাত্রাও আগের তুলনায় কঠোর করা হয়েছে।
সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করতে ইসির কঠোর অবস্থান
নির্বাচন কমিশন স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, নির্বাচনী প্রচারণা শুরু নির্দেশনা মূলত অবাধ ও সমান সুযোগ নিশ্চিত করার জন্যই জারি করা হয়েছে। কোনো প্রার্থী যেন ক্ষমতা বা প্রভাব খাটিয়ে বাড়তি সুবিধা না নিতে পারেন, সেদিকেই নজর দিয়েছে কমিশন।
ইসির পক্ষ থেকে সব প্রার্থী, রাজনৈতিক দল এবং সংশ্লিষ্টদের আচরণবিধি কঠোরভাবে মেনে চলার আহ্বান জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে বলা হয়েছে, নতুন প্রজ্ঞাপন জারির পর থেকেই বিধি ভঙ্গের ক্ষেত্রে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সরকারি প্রকল্প ঘোষণা ও ফলক উন্মোচনে নিষেধাজ্ঞা
সংশোধিত বিধিমালার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের প্রকল্পসংক্রান্ত নিষেধাজ্ঞা। বিধি ৪-এর উপবিধি (৩) সংশোধন করে আগের তুলনায় ভাষা আরও কঠোর করা হয়েছে।
আগে যেখানে বলা ছিল— “করা যাইবে না”, সেখানে নতুন নির্দেশনায় বলা হয়েছে— “করিতে পারিবেন না”। অর্থাৎ, কোনো প্রার্থী ব্যক্তিগতভাবে বা প্রভাব খাটিয়ে সরকারি প্রকল্পের অনুমোদন, ঘোষণা কিংবা ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করতে পারবেন না।
এই পরিবর্তনের মাধ্যমে প্রার্থীদের দায়বদ্ধতা আরও স্পষ্ট করা হয়েছে বলে মনে করছে নির্বাচন কমিশন।
জনসভা করতে চাইলে ২৪ ঘণ্টা আগে জানাতে হবে

নির্বাচনী প্রচারণা শুরু নির্দেশনা অনুযায়ী, কোনো প্রার্থী বা রাজনৈতিক দল জনসভা আয়োজন করতে চাইলে অবশ্যই সভার কমপক্ষে ২৪ ঘণ্টা আগে স্থানীয় পুলিশ কর্তৃপক্ষকে সময় ও স্থান সম্পর্কে জানাতে হবে।
পুলিশ কর্তৃপক্ষ জনসভাস্থলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা এবং যান চলাচলের স্বাভাবিক অবস্থা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে। এতে করে জনদুর্ভোগ কমবে এবং সহিংসতার ঝুঁকিও হ্রাস পাবে বলে মনে করছে সংশ্লিষ্টরা।
একই জায়গায় একাধিক কর্মসূচির আবেদন হলে কী হবে
ইসি জানিয়েছে, প্রচারণা শুরুর আগে রাজনৈতিক দল বা প্রার্থীকে তাদের কর্মসূচির প্রস্তাব সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে জমা দিতে হবে। যদি একই স্থানে ও একই সময়ে একাধিক দল বা প্রার্থী কর্মসূচির আবেদন করে, তাহলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সমন্বয়ের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নেবে।
এই নিয়মের ফলে সংঘাত এড়ানো সম্ভব হবে বলে আশা করছে নির্বাচন কমিশন।
পোস্টার, ব্যানার ও বিলবোর্ড ব্যবহারে নতুন সীমা
নির্বাচনী প্রচারণা শুরু নির্দেশনায় পোস্টার, ব্যানার ও বিলবোর্ড ব্যবহারের ক্ষেত্রেও স্পষ্ট সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে। সংশোধিত বিধি অনুযায়ী—
-
এক প্রার্থীর ফেস্টুন বা ব্যানারের ওপর অন্য প্রার্থীর প্রচারণা সামগ্রী টাঙানো যাবে না
-
প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর প্রচারসামগ্রী বিকৃতি বা বিনষ্ট করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ
-
সংসদীয় আসনের প্রতিটি ইউনিয়ন, পৌরসভা বা ওয়ার্ডে সর্বোচ্চ একটি অথবা পুরো নির্বাচনী এলাকায় মোট ২০টির বেশি বিলবোর্ড ব্যবহার করা যাবে না
এই সীমাবদ্ধতার মাধ্যমে প্রচারণায় শৃঙ্খলা ফেরানোর উদ্যোগ নিয়েছে ইসি।
মাইক ও লাউড স্পিকার ব্যবহারে কড়াকড়ি
নির্বাচনী জনসভায় শব্দদূষণ ও জনভোগান্তি কমাতে মাইক ব্যবহারের ক্ষেত্রেও নতুন নিয়ম জারি করা হয়েছে। কোনো প্রার্থী বা তার পক্ষে অন্য কেউ একক জনসভায় ৩টির বেশি মাইক্রোফোন বা লাউড স্পিকার ব্যবহার করতে পারবেন না।
তবে সাধারণ প্রচারণা, যেমন— রিকশা বা ভ্রাম্যমাণ প্রচারের ক্ষেত্রে এই সংখ্যাগত সীমাবদ্ধতা প্রযোজ্য হবে না।
লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত করাই মূল লক্ষ্য
ইসি জানিয়েছে, নির্বাচনী প্রচারণা শুরু নির্দেশনা মূলত সব প্রার্থীর জন্য সমান সুযোগ বা লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যেই প্রণয়ন করা হয়েছে।
ক্ষমতাসীন বা প্রভাবশালী কোনো প্রার্থী যেন প্রশাসনিক সুবিধা বা আর্থিক শক্তি ব্যবহার করে বাড়তি সুবিধা নিতে না পারেন, সে বিষয়টি নিশ্চিত করাই কমিশনের মূল লক্ষ্য।
আচরণবিধি লঙ্ঘনে কঠোর শাস্তির বিধান
এবারের সংশোধিত আচরণবিধিতে শাস্তির বিষয়টিও আরও কঠোর করা হয়েছে। কোনো প্রার্থী বা রাজনৈতিক দল বিধি ভঙ্গ করলে—
-
সর্বোচ্চ ৬ মাসের কারাদণ্ড
-
অথবা ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা জরিমানা
-
অথবা উভয় দণ্ড একসঙ্গে দেওয়া হতে পারে
দলের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ১ লাখ টাকা অর্থদণ্ড করার বিধানও রাখা হয়েছে। এমনকি তদন্তে গুরুতর অপরাধ প্রমাণিত হলে প্রার্থিতা বাতিল করার ক্ষমতাও রাখা হয়েছে নির্বাচন কমিশনের হাতে।
প্রার্থীদের জন্য কেন এই নির্দেশনা গুরুত্বপূর্ণ
নির্বাচনী প্রচারণা শুরু নির্দেশনা কেবল আইনগত বাধ্যবাধকতা নয়, বরং এটি একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের পূর্বশর্ত। নিয়ম মেনে প্রচারণা চালালে যেমন সহিংসতা কমবে, তেমনি ভোটারদের আস্থাও বাড়বে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই নির্দেশনা বাস্তবায়ন সঠিকভাবে হলে নির্বাচনী পরিবেশ অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হবে।
নির্বাচনী প্রচারণা শুরু নির্দেশনা মেনে চলাই এখন প্রার্থীদের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। কঠোর নজরদারি ও শাস্তির বিধান থাকায় সামান্য ভুলও বড় বিপদ ডেকে আনতে পারে। তাই নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী সব প্রার্থী ও দলকে দায়িত্বশীল আচরণের মাধ্যমেই ভোটারদের আস্থা অর্জনের পথ বেছে নিতে হবে।




