নির্বাচন বাধাগ্রস্ত করতে ষড়যন্ত্র চলছে—বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের কঠোর সতর্কবার্তা, ভোটাধিকার, নির্বাচন নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক বাস্তবতা বিশ্লেষণ।
আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে নির্বাচন বাধাগ্রস্ত করতে ষড়যন্ত্র চলছে বলে অভিযোগ করেছেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, একটি গোষ্ঠী পরিকল্পিতভাবে নির্বাচন প্রক্রিয়াকে প্রশ্নবিদ্ধ ও বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা করছে। এই ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে দেশবাসীকে সজাগ ও ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানান তিনি।
নোয়াখালীর হাতিয়ার দ্বীপ সরকারি কলেজ মাঠে আয়োজিত এক নির্বাচনি জনসভায় ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তারেক রহমান এসব কথা বলেন। তার বক্তব্যে উঠে আসে দীর্ঘ সময় ধরে ভোটাধিকার হরণ, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং সামনে আসা সম্ভাব্য ঝুঁকির বাস্তব চিত্র।
দীর্ঘদিন ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত জনগণ
তারেক রহমান বলেন, গত ১৫ থেকে ১৬ বছর ধরে দেশের মানুষ প্রকৃত অর্থে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেনি। ভোটের অধিকার এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ধীরে ধীরে কেড়ে নেওয়া হয়েছে বলে তিনি অভিযোগ করেন। তার ভাষায়, যারা এসব কাজ করেছে তারা অনেকেই দেশ ছেড়ে চলে গেছে, কিন্তু এখন নতুন করে আবার একটি গোষ্ঠী নির্বাচন বাধাগ্রস্ত করতে ষড়যন্ত্র শুরু করেছে।
তিনি মনে করেন, নির্বাচন শুধু একটি আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া নয়; এটি মানুষের মৌলিক অধিকার। এই অধিকার রক্ষায় সবাইকে সচেতন থাকতে হবে এবং মাঠে সক্রিয় ভূমিকা রাখতে হবে।
শুধু ভোট নয়, কেন্দ্রে থাকার আহ্বান
নেতা-কর্মীদের উদ্দেশ করে তারেক রহমান স্পষ্টভাবে বলেন, “শুধু ভোট দিলেই চলবে না, ভোটকেন্দ্রে থাকতে হবে।” তিনি জোর দিয়ে বলেন, ভোটের হিসাব কড়ায়গণ্ডায় বুঝে নিতে হবে। কারণ, ভোটের দিন ও ফলাফল ঘোষণার আগপর্যন্ত ষড়যন্ত্রকারীরা সক্রিয় থাকতে পারে।
এই প্রেক্ষাপটে তিনি মনে করেন, নির্বাচন বাধাগ্রস্ত করতে ষড়যন্ত্র রুখতে সাংগঠনিক শক্তি ও সচেতন উপস্থিতি সবচেয়ে কার্যকর উপায়।
ধানের শীষে বিজয়ের আহ্বান

তারেক রহমান বলেন, দেশের চলমান সংকট ও সমস্যার সমাধান করতে হলে নির্বাচনে বিএনপির প্রতীক ধানের শীষকে জয়ী করতে হবে। তিনি দাবি করেন, মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ ও ভোট দেওয়ার আগ্রহ দেখে অনেকের মাথা খারাপ হয়ে গেছে। আর সেখান থেকেই নতুন করে ষড়যন্ত্রের জন্ম হয়েছে।
তিনি বলেন, “দেশটা আমাদের সবার। সব ধর্ম, সব শ্রেণির মানুষকে একসাথে নিয়ে দেশ গড়তে হবে। এই দেশই আমাদের প্রথম ও শেষ ঠিকানা।”
নতুন করে ষড়যন্ত্রের অভিযোগ
এর আগে নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁ উপজেলার কাঁচপুর বালুর মাঠে আয়োজিত এক জনসভায়ও একই অভিযোগ করেন তারেক রহমান। সেখানে তিনি বলেন, বিগত বছরগুলোতে নির্বাচনের নামে প্রহসন হয়েছে। নিশিরাতের নির্বাচন হয়েছে, মানুষের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়া হয়েছে। এখন আবার নতুন করে একটি দল নির্বাচন বাধাগ্রস্ত করতে ষড়যন্ত্র শুরু করেছে।
তিনি আগামী নির্বাচনের দিন ভোর থেকে ফলাফল ঘোষণার আগ পর্যন্ত নেতা-কর্মীদের সক্রিয় থাকার নির্দেশ দেন।
সময়সূচিভিত্তিক রাজনৈতিক কর্মসূচি
চট্টগ্রামে জনসভা শেষে ঢাকায় ফেরার পথে একাধিক জনসভায় বক্তব্য দেন তারেক রহমান। কুমিল্লার দাউদকান্দি হয়ে রাত ২টার দিকে নারায়ণগঞ্জের কাঁচপুরে পৌঁছে প্রায় ১৫ মিনিট বক্তব্য দেন তিনি। এসব কর্মসূচিতে নির্বাচনী পরিবেশ ও ভোটাধিকার রক্ষার বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পায়।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এসব ধারাবাহিক কর্মসূচি মাঠপর্যায়ে বিএনপির সাংগঠনিক শক্তি প্রদর্শনের পাশাপাশি নির্বাচন নিয়ে তৈরি হওয়া শঙ্কার প্রতিফলন।
নারীদের অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতা পরিকল্পনা
তারেক রহমান তার বক্তব্যে নারীদের অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের ওপর জোর দেন। তিনি বলেন, বিএনপি ক্ষমতায় এলে নারীদের জন্য ‘ফ্যামিলি কার্ড’ চালু করা হবে। এই কার্ডের মাধ্যমে শহর ও গ্রামের খেটে খাওয়া মানুষের পরিবারের গৃহিণীরা প্রতি মাসে ৭ থেকে ১০ দিনের নগদ অর্থ বা প্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রী পাবেন।
তার মতে, কয়েক বছর এই কার্যক্রম চালু থাকলে নারীরা আত্মনির্ভরশীল হয়ে উঠবেন, যা সামাজিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বাড়াবে।
কৃষকদের জন্য কৃষক কার্ড পরিকল্পনা
কৃষকদের জন্যও আলাদা পরিকল্পনার কথা জানান বিএনপি চেয়ারম্যান। তিনি বলেন, ক্ষমতায় গেলে কৃষকদের তালিকা করে ‘কৃষক কার্ড’ দেওয়া হবে। এই কার্ডের মাধ্যমে বছরে অন্তত একটি ফসলের জন্য প্রয়োজনীয় বীজ, সার ও কীটনাশক সরকারিভাবে সরবরাহ করা হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের পরিকল্পনা গ্রামীণ অর্থনীতিকে চাঙা করতে পারে এবং নির্বাচনের সময় কৃষকদের সমর্থন বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ
নারায়ণগঞ্জের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি প্রসঙ্গে তারেক রহমান বলেন, গত দেড় দশকে এই এলাকায় বহু বাড়িঘর ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান দখল করা হয়েছে। তার মতে, এসব ঘটনা মানুষের নিরাপত্তা ও ভোটের পরিবেশকে প্রভাবিত করেছে। তাই নির্বাচন সুষ্ঠু করতে হলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন জরুরি।
আজ ময়মনসিংহে নির্বাচনি জনসভা
নির্বাচনি সফরের অংশ হিসেবে আজ মঙ্গলবার ময়মনসিংহে জনসভা করবেন তারেক রহমান। বেলা আড়াইটায় সার্কিট হাউস মাঠে এই জনসভা অনুষ্ঠিত হবে। এরপর তিনি গাজীপুরের রাজবাড়ি মাঠ এবং রাজধানীর উত্তরা আজমপুর ঈদগাহ মাঠে আরও দুটি জনসভায় বক্তব্য দেবেন।
দীর্ঘ ২২ বছর পর ময়মনসিংহে তার আগমন ঘিরে পুরো বিভাগজুড়ে উৎসবমুখর পরিবেশ বিরাজ করছে। দলীয় নেতা-কর্মীদের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের মধ্যেও ব্যাপক আগ্রহ লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
নির্বাচন ও গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, নির্বাচন বাধাগ্রস্ত করতে ষড়যন্ত্র সংক্রান্ত অভিযোগ দেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার ভবিষ্যৎ নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলছে। একটি গ্রহণযোগ্য ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন নিশ্চিত করা না গেলে রাজনৈতিক অস্থিরতা আরও বাড়তে পারে।
এই প্রেক্ষাপটে নাগরিক সচেতনতা, নিরপেক্ষ প্রশাসন এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছা—সবকিছুই সমান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।




