আর্থিক প্রতিষ্ঠানের খেলাপি ঋণ ৩৭ শতাংশ ছাড়িয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী ৯টি প্রতিষ্ঠান বন্ধের পথে, আমানতকারীদের টাকা ফেরতের উদ্যোগ।
বাংলাদেশের আর্থিক খাত আবারও বড় ধরনের চাপে পড়েছে। আর্থিক প্রতিষ্ঠানের খেলাপি ঋণ ৩৭ শতাংশ ছাড়িয়ে যাওয়ার তথ্য নতুন করে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। ব্যাংকের পাশাপাশি ব্যাংক বহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোতেও খেলাপি ঋণের পরিমাণ হু হু করে বাড়ছে, যা পুরো অর্থনীতির জন্য নেতিবাচক সংকেত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর শেষে আর্থিক প্রতিষ্ঠানের খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২৯ হাজার ৪০৮ কোটি টাকা। এটি এই খাতে বিতরণ করা মোট ঋণের ৩৭ দশমিক ১১ শতাংশ। মাত্র তিন মাসের ব্যবধানে খেলাপি ঋণ বেড়েছে প্রায় ১ হাজার ৮৬৭ কোটি টাকা—যা পরিস্থিতির ভয়াবহতা স্পষ্ট করে।
আর্থিক খাতে খেলাপি ঋণের ঊর্ধ্বগতি কেন উদ্বেগজনক
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আর্থিক প্রতিষ্ঠানের খেলাপি ঋণ ৩৭ শতাংশ হওয়া মানে এই খাত কার্যত গভীর সংকটে রয়েছে। সাধারণভাবে কোনো আর্থিক খাতে খেলাপি ঋণের হার ১০ শতাংশের বেশি হলে সেটিকে ঝুঁকিপূর্ণ ধরা হয়। সেখানে ৩৭ শতাংশ একটি অস্বাভাবিক ও বিপজ্জনক মাত্রা।
সেপ্টেম্বর শেষে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মোট ঋণ বিতরণ ছিল ৭৯ হাজার ২৫১ কোটি টাকা। এর একটি বড় অংশ অনাদায়ী হয়ে পড়ায় নতুন ঋণ বিতরণ কার্যক্রমও মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
তিন মাসেই খেলাপি ঋণ বেড়েছে প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, ২০২৫ সালের জুন শেষে আর্থিক প্রতিষ্ঠানে খেলাপি ঋণ ছিল ২৭ হাজার ৫৪১ কোটি টাকা, যা তখন মোট ঋণের ৩৫ দশমিক ৭২ শতাংশ। মাত্র তিন মাসেই খেলাপি ঋণ বেড়ে যাওয়ার এই প্রবণতা প্রমাণ করে যে সংকট এখনো নিয়ন্ত্রণে আসেনি।
এই পরিস্থিতিতে আর্থিক প্রতিষ্ঠানের খেলাপি ঋণ ৩৭ শতাংশ ছুঁয়ে যাওয়াকে অর্থনীতির জন্য একটি লাল সংকেত হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।
পি কে হালদার কেলেঙ্কারির দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব
বাংলাদেশের আর্থিক খাতের আলোচিত নাম প্রশান্ত কুমার হালদার (পি কে হালদার)। বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানে তার অনিয়ম ও দুর্নীতির প্রভাব এখনো পুরো খাতকে ভোগাচ্ছে।
পি কে হালদারের মালিকানা ও ব্যবস্থাপনায় থাকা কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের অবস্থা বর্তমানে চরমভাবে খারাপ। এসব অনিয়মের সময় তিনি সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত ব্যবসায়ী এস আলম গ্রুপ-নিয়ন্ত্রিত আভিভা ফিন্যান্স ও গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক ছিলেন।
এই অনিয়মগুলোর সরাসরি প্রভাব পড়েছে আজকের আর্থিক প্রতিষ্ঠানের খেলাপি ঋণ ৩৭ শতাংশ বাস্তবতায়।
আর্থিক প্রতিষ্ঠানের খেলাপি ঋণ ৩৭ শতাংশ: ৯টি প্রতিষ্ঠান বন্ধের পথে
বাংলাদেশ ব্যাংক ইতোমধ্যে সংকটে থাকা ৯টি আর্থিক প্রতিষ্ঠান অবসায়ন বা বন্ধের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের খেলাপি ঋণের হার কোথাও কোথাও ৯৯ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছেছে।
যে ৯টি প্রতিষ্ঠান বন্ধের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, সেগুলো হলো—
-
পিপলস লিজিং
-
ইন্টারন্যাশনাল লিজিং
-
বাংলাদেশ ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফিন্যান্স কোম্পানি (বিআইএফসি)
-
এফএএস ফিন্যান্স
-
আভিভা ফিন্যান্স
-
ফারইস্ট ফিন্যান্স
-
জিএসপি ফিন্যান্স
-
প্রাইম ফিন্যান্স
-
প্রিমিয়ার লিজিং
এর মধ্যে প্রথম চারটি প্রতিষ্ঠান পি কে হালদারের অনিয়মে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অন্যদিকে আভিভা ফিন্যান্স ছিল এস আলম গ্রুপের নিয়ন্ত্রণাধীন।
অবসায়ন প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশ ব্যাংকের ভূমিকা
বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, অবসায়ন প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে একজন করে পরিচালককে প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হবে। পাশাপাশি আরও দুজন কর্মকর্তা দায়িত্ব পালন করবেন।
এই উদ্যোগের লক্ষ্য হলো—
✔ সম্পদের সঠিক মূল্যায়ন
✔ অনিয়মের দায় নিরূপণ
✔ আমানতকারীদের অর্থ ফেরত নিশ্চিত করা
এই পদক্ষেপগুলো আর্থিক প্রতিষ্ঠানের খেলাপি ঋণ ৩৭ শতাংশ পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
আমানতকারীদের টাকা ফেরত দিতে লাগবে ৫ হাজার কোটি টাকা
বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, এই ৯টি প্রতিষ্ঠানে মোট আমানত রয়েছে ১৫ হাজার ৩৭০ কোটি টাকা। এর মধ্যে—
-
৩ হাজার ৫২৫ কোটি টাকা ক্ষুদ্র আমানতকারীদের
-
১১ হাজার ৮৪৫ কোটি টাকা বিভিন্ন ব্যাংক ও করপোরেট প্রতিষ্ঠানের
ব্যক্তিগত আমানতকারীদের টাকা ফেরত দিতে সরকারের পক্ষ থেকে প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা সহায়তার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।
সবচেয়ে বেশি সাধারণ আমানত আটকে রয়েছে—
-
পিপলস লিজিং: ১,৪০৫ কোটি টাকা
-
আভিভা ফিন্যান্স: ৮০৯ কোটি টাকা
-
ইন্টারন্যাশনাল লিজিং: ৬৪৫ কোটি টাকা
-
প্রাইম ফিন্যান্স: ৩২৮ কোটি টাকা
বাংলাদেশ ব্যাংক নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর এই অঙ্কে কিছু পরিবর্তন হতে পারে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
রোজার আগেই টাকা ফেরতের আশ্বাস
সম্প্রতি এক সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুর জানান, ৯টি প্রতিষ্ঠানকে অকার্যকর ঘোষণার আইনি প্রক্রিয়া শিগগিরই শুরু হবে। তিনি বলেন—
“সম্পদ মূল্যায়ন শেষে রোজার আগেই ব্যক্তিগত আমানতকারীদের টাকা ফেরত দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে।”
এই ঘোষণাকে অনেক আমানতকারী স্বস্তির বার্তা হিসেবে দেখছেন, যদিও পুরো প্রক্রিয়া বাস্তবায়ন সময়সাপেক্ষ হবে বলেই ধারণা করা হচ্ছে।
অর্থনীতিতে এর প্রভাব কতটা গভীর
বিশেষজ্ঞদের মতে, আর্থিক প্রতিষ্ঠানের খেলাপি ঋণ ৩৭ শতাংশ দীর্ঘমেয়াদে বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। নতুন উদ্যোক্তারা ঋণ পেতে নিরুৎসাহিত হবেন, যা শিল্প খাতে স্থবিরতা তৈরি করতে পারে।
বাংলাদেশ ব্যাংক যদি কঠোর তদারকি ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে না পারে, তাহলে ভবিষ্যতে এই সংকট আরও গভীর হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন অর্থনীতিবিদরা।
আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের আর্থিক খাত
আন্তর্জাতিকভাবে খেলাপি ঋণ পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (IMF) ও বিশ্বব্যাংক নিয়মিত পরামর্শ দিয়ে থাকে। IMF-এর মতে, খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণে না আনলে আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা হুমকির মুখে পড়ে।




