গাজায় যুদ্ধবিরতির মধ্যেও ইসরাইলি হামলা আবারও মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংকটকে আরও জটিল করে তুলেছে। আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকলেও গাজা উপত্যকায় ইসরাইলি হামলায় অন্তত ছয় ফিলিস্তিনি নিহত হওয়ার ঘটনায় নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। রাফাহ ও বেইত লাহিয়ায় চালানো এই হামলা যুদ্ধবিরতির বাস্তব কার্যকারিতা নিয়েই প্রশ্ন তুলছে।
এই প্রতিবেদনে গাজায় যুদ্ধবিরতির মধ্যেও ইসরাইলি হামলার সর্বশেষ পরিস্থিতি, নিহতদের পরিচয়, ইসরাইলি বাহিনীর দাবি, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য এবং আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হলো।
যুদ্ধবিরতির মধ্যেও কেন গাজায় হামলা?
গাজায় যুদ্ধবিরতির মধ্যেও ইসরাইলি হামলা এমন এক সময়ে ঘটলো, যখন মিসর, কাতার এবং তুরস্কের মধ্যস্থতায় সংঘাত বন্ধের চেষ্টা চলছিল। ১০ অক্টোবর থেকে কার্যকর হওয়া যুদ্ধবিরতির শর্ত অনুযায়ী বেসামরিক নাগরিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করার কথা থাকলেও বাস্তবে তার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না।
বিশ্লেষকদের মতে, নিরাপত্তা ঝুঁকি ও ভূগর্ভস্থ অবকাঠামোর অজুহাত তুলে অভিযান চালাচ্ছে ইসরাইল।
রাফাহে ইসরাইলি অভিযানের বিস্তারিত
রাফাহর পূর্বাঞ্চলে ইসরাইলি বাহিনী একটি ভূগর্ভস্থ অবকাঠামো লক্ষ্য করে হামলা চালায়। সেনাবাহিনীর দাবি অনুযায়ী, সেখানে ছয়জন ব্যক্তি বেরিয়ে আসছিলেন, যাদের “সম্ভাব্য সন্ত্রাসী” হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।
এই হামলায় চারজন নিহত হন এবং বাকি দু’জনকে আটক করা হয়। স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, হামলার সময় কোনো সতর্কবার্তা দেওয়া হয়নি, যা যুদ্ধবিরতির শর্তের স্পষ্ট লঙ্ঘন।
বেইত লাহিয়ায় ড্রোন হামলায় নিহত ২
উত্তর গাজার বেইত লাহিয়া গোলচত্বরের কাছে বেসামরিক নাগরিকদের একটি দলের ওপর ইসরাইলি ড্রোন হামলায় আরও দুই ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। চিকিৎসা সূত্রে জানা গেছে, নিহতরা নিরস্ত্র ছিলেন এবং নিরাপদ স্থানে যাওয়ার চেষ্টা করছিলেন।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, যুদ্ধবিরতির আওতায় যেসব এলাকা থেকে আগে সেনারা সরে গিয়েছিল, সেখানেই এই হামলা চালানো হয়।

ইসরাইলি বাহিনীর দাবি ও বাস্তবতা
ইসরাইলি সেনাবাহিনী বলছে, হামাস যোদ্ধাদের ভূগর্ভস্থ সুড়ঙ্গ ব্যবহারের তথ্য তাদের কাছে ছিল। ইসরাইলি গণমাধ্যমের মতে, রাফাহ শহরের নিচে প্রায় ২০০ হামাস সদস্য আটকা পড়ে থাকতে পারেন।
তবে মানবাধিকার সংস্থাগুলো প্রশ্ন তুলেছে—যুদ্ধবিরতির সময়ে বেসামরিক এলাকায় ড্রোন ও গোলাবর্ষণ কীভাবে বৈধ হতে পারে?
হামাস ও ফিলিস্তিনি পক্ষের নীরবতা
হামাস এখনো গাজায় যুদ্ধবিরতির মধ্যেও ইসরাইলি হামলা নিয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো মন্তব্য করেনি। ফিলিস্তিনি গোষ্ঠীগুলো ইসরাইলের নিয়ন্ত্রণহীন এলাকায় নিরাপদে যাওয়ার অনুমতি চাইলেও তেল আবিব তাতে সাড়া দেয়নি।
এই নীরবতা পরিস্থিতিকে আরও অস্থিতিশীল করে তুলছে।
📊 যুদ্ধবিরতির পর হতাহতের ভয়ংকর হিসাব
যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পরেও ইসরাইলি গোলাগুলিতে:
-
✅ নিহত: ৩৪২ জন
-
✅ আহত: হাজারেরও বেশি
অন্যদিকে, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া যুদ্ধে এখন পর্যন্ত:
-
✅ নিহত ফিলিস্তিনি: ৭০,০০০+
-
✅ আহত: ১,৭১,০০০+
-
✅ নিহতদের বড় অংশ: নারী ও শিশু
এই পরিসংখ্যান আন্তর্জাতিক মহলে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
১৫ ফিলিস্তিনির লাশ ফেরত দিলো ইসরাইল
সাম্প্রতিক আরেক ঘটনায়, এক ইসরাইলি বন্দীর লাশের বিনিময়ে ১৫ ফিলিস্তিনির লাশ ফেরত দিয়েছে ইসরাইল। বুধবার এই লাশগুলো হস্তান্তর করা হয়।
এপি নিউজের তথ্য অনুযায়ী, এখনো হামাসের কাছে আটক দুইজন বন্দীর লাশ ফেরত দেওয়া হয়নি—যাদের একজন ইসরাইলি এবং অন্যজন থাই নাগরিক।
আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া ও ভবিষ্যৎ আশঙ্কা
জাতিসংঘ ও বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা যুদ্ধবিরতি কার্যকরভাবে বাস্তবায়নের আহ্বান জানিয়েছে। তবে সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো স্পষ্ট করে দিচ্ছে যে, গাজায় যুদ্ধবিরতির মধ্যেও ইসরাইলি হামলা বন্ধ না হলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে।
সবশেষে বলা যায়, গাজায় যুদ্ধবিরতির মধ্যেও ইসরাইলি হামলা শুধু সামরিক সংঘাতই নয়, এক ভয়াবহ মানবিক সংকটের ইঙ্গিত দিচ্ছে। যুদ্ধবিরতির নামে হামলা চলতে থাকলে সাধারণ মানুষের জীবন আরও বিপন্ন হয়ে উঠবে। এখনই কার্যকর ও জবাবদিহিমূলক আন্তর্জাতিক উদ্যোগ জরুরি।




