এইমাত্র

আরও খবর

Shikor Web Image (43)
ইরান নিয়ে ট্রাম্পের সিদ্ধান্ত: যে কারণে হিমশিম খাচ্ছেন
Shikor Web Image (39)
থাইল্যান্ড ট্রেন দুর্ঘটনায় ২২ জন নিহত
Shikor Web Image (56)
লন্ডন মেয়র নির্বাচনে মুসলিম কার্ড
Shikor Web Image (53)
ভেনেজুয়েলা ছাড়তে মার্কিন নাগরিকদের জরুরি নির্দেশ
Shikor Web Image (50)
ট্রাম্পের হুঁশিয়ারির জবাবে ইরানের হুঁশিয়ারি

গ্রিনল্যান্ড নিয়ে ন্যাটো সংকট: ট্রাম্পের কাছে অসহায় ইউরোপ

গ্রিনল্যান্ড নিয়ে ন্যাটো সংকট নতুন মোড় নিয়েছে। ট্রাম্পের হুমকিতে ইউরোপ অসহায়, ন্যাটোর মূলনীতি ভেঙে পড়ার ঝুঁকিতে পড়েছে। বিস্তারিত পড়ুন।

গ্রিনল্যান্ড নিয়ে ন্যাটো সংকট এখন আর কেবল কূটনৈতিক আলোচনার বিষয় নয়; এটি ইউরোপের দীর্ঘদিনের নিরাপত্তা ধারণাকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। দ্বিতীয় মেয়াদে হোয়াইট হাউসে প্রত্যাবর্তনের পর ডোনাল্ড ট্রাম্প যে অবস্থান নিয়েছেন, তা ন্যাটোর ইতিহাসে এক নজিরবিহীন বাস্তবতা তৈরি করেছে।

ন্যাটোর মূলনীতি অনুযায়ী, কোনো সদস্যদেশ আক্রান্ত হলে সবাই একসঙ্গে প্রতিরোধ গড়ে তোলে। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে শক্তিশালী সদস্যরাষ্ট্র যুক্তরাষ্ট্রই আরেক সদস্যদেশ ডেনমার্কের স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল গ্রিনল্যান্ড দখলের হুমকি দিচ্ছে। ফলে গ্রিনল্যান্ড নিয়ে ন্যাটো সংকট শুধু ইউরোপ নয়, পুরো ট্রান্স-আটলান্টিক জোটের ভিত্তিকে নাড়িয়ে দিয়েছে।

হোয়াইট হাউসের হুমকি ও ন্যাটোর মূলনীতির সংঘাত

হোয়াইট হাউসের ভাষ্য অনুযায়ী, গ্রিনল্যান্ডের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার বিষয়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ‘নানা বিকল্প’ বিবেচনা করছেন। যদিও সরাসরি সামরিক অভিযানের ঘোষণা আসেনি, তবে সম্ভাবনাটি পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া হয়নি।

এই অবস্থান ন্যাটোর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নীতিকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করছে। কারণ, জোটের একটি সদস্য যদি আরেক সদস্যের বিরুদ্ধে শক্তি প্রয়োগের হুমকি দেয়, তাহলে ন্যাটোর পারস্পরিক প্রতিরক্ষার ধারণা কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়ে।

বিশ্লেষকদের মতে, গ্রিনল্যান্ড নিয়ে ন্যাটো সংকট ভবিষ্যতে জোটের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়েই বড় প্রশ্ন তুলে দিতে পারে।

ইউরোপের নীরবতা কেন এত অর্থবহ

ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী মেটে ফ্রেডেরিকসেন স্পষ্ট ভাষায় সতর্ক করেছেন—যুক্তরাষ্ট্র যদি ন্যাটোর আরেক সদস্যদেশের ওপর সামরিক অভিযান চালায়, তাহলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর গড়ে ওঠা পুরো নিরাপত্তা কাঠামো ভেঙে পড়বে।

তবে ইউরোপের অন্যান্য বড় নেতা প্রকাশ্যে তেমন কড়া প্রতিক্রিয়া দেখাননি। যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার কিংবা ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁ—কেউই সরাসরি ট্রাম্প প্রশাসনের সমালোচনায় যাননি।

এই নীরবতা আসলে ইউরোপের এক গভীর দুর্বলতাকে তুলে ধরে। বাস্তবতা হলো, রাশিয়ার মোকাবিলায় ইউরোপ এখনো যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ও কূটনৈতিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল। তাই গ্রিনল্যান্ড নিয়ে ন্যাটো সংকট নিয়ে শক্ত অবস্থান নিতে গিয়েও তারা দ্বিধায় পড়ছে।

ইউক্রেন যুদ্ধ ইউরোপকে আরও কোণঠাসা করেছে

ইউক্রেন যুদ্ধ ইউরোপের কৌশলগত দুর্বলতাকে আরও স্পষ্ট করে দিয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসন এখন পর্যন্ত ইউক্রেনে নতুন সামরিক সহায়তার জন্য কংগ্রেসের অনুমোদন চায়নি। ফলে ইউরোপকে এক বছরের বেশি সময় ধরে ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা ব্যয় বহন করতে হচ্ছে।

একদিকে গ্রিনল্যান্ড ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রকে ঠেকানোর চেষ্টা, অন্যদিকে ইউক্রেনে ওয়াশিংটনের সক্রিয় অংশগ্রহণ ধরে রাখা—এই দুই লক্ষ্য একসঙ্গে পূরণ করা ইউরোপের জন্য অত্যন্ত কঠিন হয়ে উঠেছে।

এ কারণেই গ্রিনল্যান্ড নিয়ে ন্যাটো সংকট ইউরোপকে এক জটিল দোটানার মধ্যে ফেলেছে।

বিশেষজ্ঞদের মূল্যায়ন: ইউরোপের হাতে বিকল্প কম

রাজনৈতিক ঝুঁকি বিশ্লেষক প্রতিষ্ঠান ইউরেশিয়া গ্রুপের ইউরোপ অঞ্চলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মুজতবা রাহমান মনে করেন, ইউরোপের সামনে বাস্তব বিকল্প খুবই সীমিত।

তার ভাষায়, ইউরোপ বহুদিন ধরে নিজেদের নিরাপত্তার দায়িত্ব যুক্তরাষ্ট্রের ওপর ছেড়ে দিয়েছে। ফলে হঠাৎ করে শক্ত অবস্থান নেওয়ার মতো সামরিক সক্ষমতা এখনো গড়ে ওঠেনি। নিজস্ব প্রতিরক্ষা কাঠামো পুরোপুরি শক্তিশালী করতে ইউরোপের অন্তত তিন থেকে পাঁচ বছর সময় লাগবে।

এই বাস্তবতায় গ্রিনল্যান্ড নিয়ে ন্যাটো সংকট আপাতত ইউরোপকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গেই সমঝোতার পথে হাঁটতে বাধ্য করছে।

যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেও ট্রাম্পের অবস্থান বিতর্কিত

উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, গ্রিনল্যান্ড দখলের প্রশ্নে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরেও ট্রাম্পের অবস্থান সর্বসম্মত নয়। যুক্তরাজ্যভিত্তিক জরিপ সংস্থা YouGov-এর এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, মাত্র ৭ শতাংশ মার্কিন নাগরিক সামরিক শক্তি ব্যবহারের পক্ষে।

এই তথ্য ইউরোপের জন্য সামান্য হলেও আশার জায়গা তৈরি করে। কারণ, অভ্যন্তরীণ চাপ বাড়লে ট্রাম্প প্রশাসন হয়তো সরাসরি সামরিক পথে হাঁটতে দ্বিধা করবে।

ইউরোপ কি পাল্টা পদক্ষেপ নিতে পারে?

ইউরোপের কিছু রাজনীতিক কঠোর পদক্ষেপের পক্ষে মত দিয়েছেন। ফ্রান্সের ইউরোপীয় পার্লামেন্ট সদস্য রাফায়েল গ্লুকসমান গ্রিনল্যান্ডে স্থায়ী ইউরোপীয় সামরিক ঘাঁটি স্থাপনের প্রস্তাব দিয়েছেন।

তবে ইউরোপীয় কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের বিশ্লেষক মাজদা রুগে মনে করেন, সামরিক সংঘাত নয়; বরং রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপ বাড়ানোই কার্যকর হতে পারে।

এই প্রেক্ষাপটে গ্রিনল্যান্ড নিয়ে ন্যাটো সংকট ইউরোপকে নতুন কৌশল ভাবতে বাধ্য করছে।

ন্যাটোর ভবিষ্যৎ নিয়ে বাড়ছে অনিশ্চয়তা

ন্যাটোর সদর দপ্তর ব্রাসেলসসহ ইউরোপের গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক মহলে আশঙ্কা রয়েছে—ট্রাম্প এবার হয়তো আগের মতো আগ্রহ হারিয়ে পিছিয়ে যাবেন না।

একজন ব্রিটিশ আইনপ্রণেতা সিএনএনকে বলেছেন, ট্রাম্প এবার বিষয়টি অত্যন্ত সিরিয়াসভাবে নিচ্ছেন। ফলে গ্রিনল্যান্ড নিয়ে ন্যাটো সংকট দীর্ঘমেয়াদে জোটের ভেতরে আস্থার সংকট তৈরি করতে পারে।

ইউরোপের জন্য সময় ক্ষেপণের লড়াই

বর্তমান বাস্তবতায় ইউরোপ এক ধরনের সময় ক্ষেপণের কৌশল নিয়েছে। যতক্ষণ না নিজস্ব সামরিক সক্ষমতা শক্তিশালী হচ্ছে, ততক্ষণ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কাজ চালিয়ে যাওয়া ছাড়া তাদের সামনে বাস্তব কোনো পথ নেই।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সময়টুকু ইউরোপের জন্য সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ, গ্রিনল্যান্ড নিয়ে ন্যাটো সংকট যদি আরও গভীর হয়, তাহলে ন্যাটোর ঐক্য রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়বে।

আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া ও বিশ্লেষণ

গ্রিনল্যান্ড ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান নিয়ে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষণ প্রকাশ করেছে
এই বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, বিষয়টি কেবল ভূখণ্ড নয়; এটি বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্য ও জোট রাজনীতির ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করতে পারে।

কেন গ্রিনল্যান্ড ইস্যু এত গুরুত্বপূর্ণ

গ্রিনল্যান্ড কেবল একটি দ্বীপ নয়। এটি আর্কটিক অঞ্চলের কৌশলগত অবস্থান, প্রাকৃতিক সম্পদ এবং সামরিক গুরুত্বের কারণে বিশ্ব রাজনীতিতে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।

এ কারণেই গ্রিনল্যান্ড নিয়ে ন্যাটো সংকট ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্র-ইউরোপ সম্পর্কের গতিপথ বদলে দিতে পারে।

সব মিলিয়ে, ইউরোপ এখনো আশায় আছে যে ট্রাম্পের আগ্রহ কমে যেতে পারে। তবে বর্তমান সংকেতগুলো বলছে, এবারের পরিস্থিতি ভিন্ন।

ন্যাটোর ভবিষ্যৎ, ইউরোপের নিরাপত্তা এবং ট্রান্স-আটলান্টিক সম্পর্ক—সবকিছুই এখন গ্রিনল্যান্ড নিয়ে ন্যাটো সংকট কীভাবে মোড় নেয়, তার ওপর নির্ভর করছে।

সর্বাধিক পঠিত