সম্প্রতি গুলিবিদ্ধ হত্যাকাণ্ড বৃদ্ধি দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে নতুন করে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। রাজধানী থেকে জেলা শহর—কোথাও মানুষ আর নিজেকে নিরাপদ ভাবতে পারছে না। প্রকাশ্যে, ভরদুপুরে কিংবা আদালত প্রাঙ্গণের মতো নিরাপদ স্থানে গুলি করে হত্যার ঘটনা জনমনে গভীর আতঙ্ক সৃষ্টি করছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আধিপত্য বিস্তার, রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব, চাঁদাবাজি ও অবৈধ অস্ত্রের অবাধ প্রবাহই এই ভয়াবহ পরিস্থিতির মূল কারণ। গুলিবিদ্ধ হত্যাকাণ্ড বৃদ্ধি শুধু অপরাধের পরিসংখ্যান বাড়াচ্ছে না, বরং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় নিরাপত্তাহীনতার অনুভূতিকে আরও গভীর করছে।
সারাদেশে গুলিবিদ্ধ হত্যাকাণ্ড বৃদ্ধি কেন উদ্বেগজনক
বর্তমানে গুলিবিদ্ধ হত্যাকাণ্ড বৃদ্ধি কেবল বড় শহরেই সীমাবদ্ধ নেই। গ্রাম, মফস্বল ও শিল্পাঞ্চলেও একই চিত্র দেখা যাচ্ছে। অপরাধীরা প্রকাশ্যে আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করে হত্যাকাণ্ড ঘটাচ্ছে, যা স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে—তারা আর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে ভয় পাচ্ছে না।
এই প্রবণতা সমাজে সহিংসতার গ্রহণযোগ্যতা বাড়িয়ে দিচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্রের জন্য ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে।
আদালত প্রাঙ্গণেও গুলিতে হত্যা: নিরাপত্তা কোথায়?
এক সময় আদালত প্রাঙ্গণ ছিল সবচেয়ে নিরাপদ স্থানগুলোর একটি। অথচ এখন গুলিবিদ্ধ হত্যাকাণ্ড বৃদ্ধি সেই ধারণাকেও ভেঙে দিয়েছে। খুলনা ও ঢাকার আদালতপাড়ায় প্রকাশ্যে খুনের ঘটনা প্রমাণ করে, নিরাপত্তা ব্যবস্থায় মারাত্মক ফাঁক রয়ে গেছে।
এই ধরনের ঘটনার ফলে বিচারপ্রার্থী মানুষ, আইনজীবী ও সাধারণ নাগরিকদের মধ্যে ভয় আরও বেড়েছে।
জুরাইন ও খুলনার সাম্প্রতিক হত্যাকাণ্ড
রাজধানীর জুরাইনে একজন সিএনজি চালককে সন্ধ্যার সময় গুলি করে হত্যা করা হয়। মাত্র কয়েক মিনিটের ব্যবধানে এই হত্যাকাণ্ড ঘটে, যা এলাকাবাসীর মধ্যে তীব্র আতঙ্ক ছড়ায়। একইভাবে খুলনার আদালত এলাকায় ভরদুপুরে দুজনকে গুলি করে হত্যার ঘটনা গুলিবিদ্ধ হত্যাকাণ্ড বৃদ্ধি-র বাস্তব উদাহরণ হয়ে উঠেছে।

এগুলো আর বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং একটি ক্রমবর্ধমান প্রবণতার অংশ।
অবৈধ অস্ত্রই কি মূল কারণ?
বিশেষজ্ঞদের মতে, গুলিবিদ্ধ হত্যাকাণ্ড বৃদ্ধি সরাসরি অবৈধ অস্ত্রের বিস্তারের সঙ্গে জড়িত। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, গত কয়েক বছরে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র লুট ও সীমান্ত দিয়ে চোরাচালানের মাধ্যমে দেশে প্রবেশ করেছে।
অনেক অস্ত্র এখনো উদ্ধার না হওয়ায় সেগুলোর অবস্থান নিয়ে চরম অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে, যা ভবিষ্যতে আরও সহিংসতার আশঙ্কা বাড়াচ্ছে।
গোয়েন্দা সংস্থার পর্যবেক্ষণ
গোয়েন্দা তথ্য বলছে, আন্ডারওয়ার্ল্ড ও পলাতক সন্ত্রাসীরা দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে অপরাধ পরিচালনা করছে। তারা দেশ-বিদেশে বসে হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনা করছে, যার ফলাফল হিসেবে গুলিবিদ্ধ হত্যাকাণ্ড বৃদ্ধি পাচ্ছে।
বিশেষ করে রাজধানীর কিছু এলাকা এখন অপরাধী চক্রের নিয়ন্ত্রণে চলে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি করেছে।
পরিসংখ্যান যা ভয় বাড়ায়
পুলিশের হিসাব অনুযায়ী—
-
হাজারের বেশি আগ্নেয়াস্ত্র এখনও উদ্ধার হয়নি
-
লুট হওয়া অস্ত্রের মধ্যে রয়েছে SMG ও অ্যাসল্ট রাইফেল
-
সীমান্তের অন্তত ১৮–৩০টি পয়েন্ট দিয়ে অস্ত্র প্রবেশ করে
এই বাস্তবতা গুলিবিদ্ধ হত্যাকাণ্ড বৃদ্ধি থামানোকে আরও কঠিন করে তুলছে।
বিশেষজ্ঞদের মতামত
অপরাধ বিশ্লেষকরা বলছেন, একই ধরনের অপরাধ বারবার ঘটলে বুঝতে হবে যে নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা কার্যকর নয়। অপরাধীরা যখন ভয় পায় না, তখনই গুলিবিদ্ধ হত্যাকাণ্ড বৃদ্ধি পায়।
তারা আরও বলেন, রাজনৈতিক সদিচ্ছা ছাড়া এই সমস্যা নির্মূল সম্ভব নয়।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সামনে বড় চ্যালেঞ্জ
আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অনেক ক্ষেত্রেই রাজনৈতিক চাপ ও সীমাবদ্ধতার মুখে পড়ে। ফলে অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। এর ফলেই গুলিবিদ্ধ হত্যাকাণ্ড বৃদ্ধি একটি নিয়মিত সংবাদে পরিণত হয়েছে।
জনমনে আতঙ্ক ও নিরাপত্তাহীনতা
প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা সাধারণ মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও প্রভাব ফেলছে। মানুষ সন্ধ্যার পর বাইরে যেতে ভয় পাচ্ছে। পরিবার নিয়ে নিরাপদে চলাফেরা করাও কঠিন হয়ে উঠছে।
এই আতঙ্কই প্রমাণ করে—গুলিবিদ্ধ হত্যাকাণ্ড বৃদ্ধি এখন জাতীয় উদ্বেগের বিষয়।
সবকিছু বিবেচনায় বলা যায়, গুলিবিদ্ধ হত্যাকাণ্ড বৃদ্ধি বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুতর সত
র্ক সংকেত। অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার, রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং শক্ত আইন প্রয়োগ ছাড়া এই পরিস্থিতির উন্নতি সম্ভব নয়।
জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এখনই সমন্বিত ও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া না হলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে।




