বাংলাদেশ ইস্যুর মাঝেই নতুন করে বিপাকে আইসিসি, এনআইএল শর্ত বিতর্ক ঘিরে ২০২৬ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের আগে খেলোয়াড়দের অধিকার নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিস্তারিত জানুন।
বাংলাদেশ ইস্যু নিয়ে চলমান আলোচনা ও চাপের মধ্যেই আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল আবারও নতুন এক বিতর্কে জড়িয়ে পড়েছে। আসন্ন টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ ২০২৬ সামনে রেখে খেলোয়াড়দের নাম, ছবি ও পরিচিতি ব্যবহারের শর্ত—যা পরিচিত নেম, ইমেজ অ্যান্ড লাইকলিনেস (NIL) নামে—নিয়ে শুরু হয়েছে তীব্র মতবিরোধ। এই পরিস্থিতি এখন পরিচিত হয়ে উঠেছে আইসিসি এনআইএল শর্ত বিতর্ক নামে।
বিশ্বজুড়ে ক্রিকেটারদের প্রতিনিধিত্বকারী সংগঠন ওয়ার্ল্ড ক্রিকেটার্স অ্যাসোসিয়েশন (WCA) সরাসরি অভিযোগ তুলেছে যে, আইসিসি নতুন যে ‘স্কোয়াড পার্টিসিপেশন টার্মস’ পাঠিয়েছে, তা ২০২৪ সালে স্বাক্ষরিত চুক্তির সঙ্গে সাংঘর্ষিক। শুধু তাই নয়, সংগঠনটি একে খেলোয়াড়দের জন্য আরও শোষণমূলক বলেও আখ্যা দিয়েছে।
আইসিসি এনআইএল শর্ত বিতর্ক কেন এত গুরুত্বপূর্ণ

আইসিসি এনআইএল শর্ত বিতর্ক কেবল একটি কাগুজে চুক্তির বিষয় নয়। এটি সরাসরি খেলোয়াড়দের ব্যক্তিগত অধিকার, আয়ের উৎস এবং ভবিষ্যৎ ক্যারিয়ারের সঙ্গে জড়িত। আধুনিক ক্রীড়াবিশ্বে একজন খেলোয়াড়ের নাম ও ছবি বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহারের অধিকার অত্যন্ত সংবেদনশীল বিষয়।
ডব্লিউসিএ দাবি করছে, আইসিসির নতুন শর্তগুলো আগের তুলনায় খেলোয়াড়দের নিয়ন্ত্রণ আরও কড়াকড়িভাবে নিজেদের হাতে নিতে চাচ্ছে।
কী বলছে ওয়ার্ল্ড ক্রিকেটার্স অ্যাসোসিয়েশন
ইএসপিএনক্রিকইনফোর প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ডব্লিউসিএ ইতোমধ্যে আইসিসিকে লিখিতভাবে তাদের উদ্বেগ জানিয়েছে। সংগঠনটির বক্তব্য, ২০২৪ সালের যে চুক্তি হয়েছিল, সেখানে স্পষ্টভাবে বলা ছিল—
এই চুক্তি ডব্লিউসিএর সঙ্গে যুক্ত সব ক্রিকেটারের জন্যই প্রযোজ্য, তারা বিশ্বকাপে অংশ নিক বা না-নিক।
এই অবস্থান থেকেই আইসিসি এনআইএল শর্ত বিতর্ক আরও ঘনীভূত হয়েছে।
আইসিসির পাল্টা ব্যাখ্যা
আইসিসি অবশ্য অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে। সংস্থাটির দাবি,
২০২৪ সালের চুক্তিটি কেবলমাত্র আটটি সদস্য বোর্ডের জন্য প্রযোজ্য ছিল। অন্যদিকে, ২০২৬ বিশ্বকাপে অংশ নিতে যাওয়া অনেক দল সেই চুক্তির আওতায় পড়ে না।
তবে এই ব্যাখ্যা ডব্লিউসিএ গ্রহণযোগ্য মনে করছে না। তাদের মতে, চুক্তির ভাষা পরিষ্কার ছিল এবং সেখানে কোনও সীমাবদ্ধতার উল্লেখ ছিল না।
টম মফাটের কড়া বক্তব্য
ডব্লিউসিএর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা টম মফাট এই প্রসঙ্গে বলেন,
“দুটি সংস্করণের মধ্যে বড় ধরনের পার্থক্য রয়েছে।”
তিনি বিশেষভাবে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন—
-
কনটেন্ট ও মিডিয়া উপস্থিতি
-
পর্দার পেছনের ভিডিও ধারণ
-
ড্রেসিংরুমে প্রবেশাধিকার
-
খেলোয়াড়দের জৈবিক তথ্য
-
লাইসেন্সিং ও এনআইএল ব্যবহারের অধিকার
-
চুক্তি ও বিরোধ নিষ্পত্তির ধারা
তার মতে, আইসিসির নতুন শর্তাবলি খেলোয়াড়দের সুরক্ষা মারাত্মকভাবে কমিয়ে দিচ্ছে।
স্বল্প আয়ের খেলোয়াড়দের জন্য বাড়তি ঝুঁকি
আইসিসি এনআইএল শর্ত বিতর্ক–এর সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো, স্বল্প আয়ের ও কম পরিচিত খেলোয়াড়দের ওপর এর প্রভাব।
টম মফাট জানান,
অনেক খেলোয়াড়ের জন্য আইসিসি ইভেন্টে অংশগ্রহণই প্রধান আয়ের উৎস।
একই বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া বিভিন্ন দলের খেলোয়াড়দের মধ্যে শর্তের এই বৈষম্য ন্যায়সঙ্গত নয়।
বিশেষ করে নারী ক্রিকেটার ও ছোট বোর্ডের খেলোয়াড়রা এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন।
বিশ্বকাপ ২০২৬–এর আগে আইসিসির জন্য নতুন চাপ
টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ ২০২৬ আয়োজনের প্রস্তুতির মধ্যেই এই আইসিসি এনআইএল শর্ত বিতর্ক সংস্থাটির জন্য বাড়তি চাপ তৈরি করেছে।
খেলোয়াড়দের সমর্থন ছাড়া বড় কোনও টুর্নামেন্ট সফলভাবে আয়োজন করা কঠিন—এ বাস্তবতা আইসিসির অজানা নয়।
আইসিসি কি সমঝোতার পথে যাবে?
ডব্লিউসিএ স্পষ্ট জানিয়েছে, তারা ক্রিকেটের উন্নয়ন বা আইসিসি ইভেন্টের সম্প্রসারণের বিরোধী নয়।
তবে তাদের অবস্থান পরিষ্কার—
এই উন্নয়ন হতে হবে খেলোয়াড়দের সঙ্গে অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে।
সংস্থাটির দাবি, খেলোয়াড়রা ইতোমধ্যে যে শর্তে স্বাক্ষর করেছে, বিশ্বকাপে আইসিসিকে সেই শর্তই কার্যকর করতে হবে।
আন্তর্জাতিক ক্রীড়াঙ্গনে এনআইএল বিতর্কের প্রেক্ষাপট
বিশ্ব ক্রীড়াঙ্গনে এনআইএল অধিকার নিয়ে বিতর্ক নতুন কিছু নয়। ফুটবল, বাস্কেটবল এমনকি অলিম্পিক খেলাধুলাতেও এই বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, আইসিসি এনআইএল শর্ত বিতর্ক এখন কেবল একটি প্রশাসনিক ইস্যু নয়। এটি বিশ্ব ক্রিকেটের ভবিষ্যৎ কাঠামো, খেলোয়াড় অধিকার এবং ন্যায্য অংশীদারিত্বের প্রশ্ন তুলে ধরেছে।
আইসিসি যদি দ্রুত সমাধানের পথে না যায়, তাহলে এই বিতর্ক ২০২৬ বিশ্বকাপের প্রস্তুতিতেই প্রভাব ফেলতে পারে। অন্যদিকে, সমঝোতার মাধ্যমে খেলোয়াড়দের আস্থা ফিরিয়ে আনাই হতে পারে এই সংকট থেকে বেরিয়ে আসার একমাত্র পথ।




