যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে চাপে ভারত উদ্বেগ বাড়ছে। ৫০০ বিলিয়ন ডলার আমদানি লক্ষ্য, রুশ তেল ও কৃষি খাতে প্রভাব নিয়ে তৈরি হয়েছে বড় প্রশ্ন।
মার্কিন প্রেসিডেন্টের শুল্কনীতির প্রভাব মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নতুন বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে চাপে পড়েছে ভারত। চলতি মাসে ঘোষিত এই ভারত-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে দেশের ভেতরে বিভিন্ন মহলে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে কৃষক সংগঠন, অর্থনীতিবিদ ও বাণিজ্য বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করছেন, এই উদ্যোগে ওয়াশিংটনের কাছে নয়াদিল্লির নীতিগত অবস্থান দুর্বল হতে পারে।

মুম্বাই থেকে এএফপি জানায়, চুক্তির বিস্তারিত এখনো প্রকাশ করা হয়নি। শুধু একটি যৌথ বিবৃতি এবং হোয়াইট হাউসের তথ্যপত্র সামনে এসেছে। ভারত জানিয়েছে, মার্চের শেষ নাগাদ একটি অন্তর্বর্তী চুক্তি চূড়ান্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
কৃষকদের উদ্বেগ: সস্তা পণ্যে দেশীয় উৎপাদন হুমকিতে
এই ভারত-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য চুক্তি ঘোষণার পর সবচেয়ে বেশি প্রতিক্রিয়া এসেছে কৃষি খাত থেকে। ভারতের প্রভাবশালী কৃষক সংগঠনগুলো আশঙ্কা করছে, যুক্তরাষ্ট্র থেকে সস্তা কৃষিপণ্য আমদানি হলে দেশীয় উৎপাদকরা বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়বেন।
ভারতে ৭০ কোটির বেশি মানুষ কৃষির সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে যুক্ত। তাই কৃষি খাতে কোনো পরিবর্তন দেশের অর্থনীতি ও রাজনীতিতে বড় প্রভাব ফেলতে পারে। সমালোচকদের মতে, এই চুক্তির ফলে দেশীয় বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়লেও কৃষকদের সুরক্ষা কমে যেতে পারে।
চুক্তির বিস্তারিত এখনো অজানা
চুক্তির কাঠামো ও শর্ত নিয়ে স্পষ্টতা না থাকায় উদ্বেগ আরও বেড়েছে। নয়াদিল্লি এখনো পূর্ণাঙ্গ নথি প্রকাশ করেনি। ফলে বিভিন্ন মহলে ধারণা ও বিশ্লেষণের ভিত্তিতে আলোচনা চলছে।
বাণিজ্য বিশেষজ্ঞ অভিজিৎ দাস বলেন, ট্রাম্প প্রশাসনের সময় কোনো সিদ্ধান্ত স্থায়ী হবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। তার মতে, চুক্তি স্বাক্ষর হলেও তা দীর্ঘমেয়াদে টিকে থাকবে কি না, তা নির্ভর করবে ভবিষ্যৎ নীতির ওপর।
৫০০ বিলিয়ন ডলারের আমদানি লক্ষ্য নিয়ে বিতর্ক
চুক্তির সবচেয়ে আলোচিত অংশ হলো আগামী পাঁচ বছরে ৫০০ বিলিয়ন ডলারের মার্কিন পণ্য কেনার ‘ইচ্ছা’ প্রকাশ। অথচ গত অর্থবছরে যুক্তরাষ্ট্র থেকে ভারতের আমদানি ছিল মাত্র ৪৫ বিলিয়ন ডলার।
নয়াদিল্লিভিত্তিক থিংক ট্যাংক গ্লোবাল ট্রেড রিসার্চ ইনিশিয়েটিভের অজয় শ্রীবাস্তব এই লক্ষ্যকে ‘অবাস্তব’ বলে মন্তব্য করেছেন। তার মতে, বছরে ১০০ বিলিয়ন ডলারের আমদানি করা ভারতের পক্ষে বাস্তবসম্মত নয়।
তিনি বলেন, এই প্রতিশ্রুতির বড় অংশ বাণিজ্যিক বিমান কেনার সঙ্গে যুক্ত। তবে বেসরকারি বিমান সংস্থাগুলোর অতিরিক্ত বোয়িং বিমান কেনা হলেও মোট লক্ষ্যে পৌঁছানো কঠিন। উদাহরণ হিসেবে তিনি বলেন, পাঁচ বছরে ২০০টি বিমান কেনা হলেও ব্যয় হবে প্রায় ৬০ বিলিয়ন ডলার, যা ঘোষিত লক্ষ্যের তুলনায় অনেক কম।
‘অঙ্গীকার’ নয় ‘ইচ্ছা’: ঝুঁকি কমেছে?
কিছু অর্থনীতিবিদ আবার তুলনামূলক ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেছেন। তাদের মতে, এই লক্ষ্য বাধ্যতামূলক নয়, বরং একটি ‘ইচ্ছা’। ফলে ভারতের ওপর চাপ তুলনামূলক কম।
ক্যাপিটাল ইকোনমিকসের শিভান ট্যান্ডন বলেন, লক্ষ্যকে আইনি বাধ্যবাধকতায় পরিণত না করায় ভবিষ্যতে চুক্তি ভেঙে যাওয়ার ঝুঁকি কমেছে। এতে ভারতের নীতি নমনীয় রাখার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
রাশিয়ার তেল নিয়ে নতুন বিতর্ক
এই ভারত-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে আরেকটি বড় প্রশ্ন উঠে এসেছে জ্বালানি খাতে। ওয়াশিংটন দাবি করেছে, ভারত রাশিয়া থেকে তেল কেনা বন্ধে সম্মত হয়েছে। এর পর যুক্তরাষ্ট্র ২৫ শতাংশ শুল্ক প্রত্যাহার করেছে বলে জানানো হয়।
তবে যৌথ বিবৃতিতে এমন কোনো প্রতিশ্রুতির উল্লেখ নেই। ভারত সরকারও বিষয়টি নিশ্চিত বা অস্বীকার করেনি। নয়াদিল্লি জানিয়েছে, তাদের জ্বালানি নীতি জাতীয় স্বার্থের ভিত্তিতে পরিচালিত হয় এবং বিভিন্ন উৎস থেকে অপরিশোধিত তেল সংগ্রহ করা হয়।
২০২৫ সালের মাঝামাঝি সময়ে ভারত দৈনিক ২০ লাখ ব্যারেলের বেশি রুশ তেল আমদানি করলেও জানুয়ারিতে তা কমে প্রায় ১১ লাখ ব্যারেলে নেমেছে।
বিকল্প উৎসে ঝোঁক
স্থানীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, রাষ্ট্রায়ত্ত রিফাইনারিগুলো এপ্রিলের জন্য ভেনেজুয়েলার তেল কেনা শুরু করেছে। তবে রুশ তেল পুরোপুরি বন্ধ হবে কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
ব্লুমবার্গের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আংশিকভাবে রাশিয়ার রোজনেফটের মালিকানাধীন মুম্বাইভিত্তিক নায়ারা এনার্জি প্রতিদিন প্রায় ৪ লাখ ব্যারেল তেল কেনা অব্যাহত রাখতে পারে।
বিএমআই (ফিচ সলিউশনসের একটি ইউনিট)-এর ড্যারেন টে বলেন, ভারত প্রকাশ্যে তেল আমদানি বন্ধের ঘোষণা দেয়নি। মূল্য ও প্রাপ্যতার ভিত্তিতে জ্বালানি সংগ্রহের নীতিই এখনো বহাল রয়েছে। ফলে এই ইস্যুতে অনিশ্চয়তা থাকছে।
বাজারে আংশিক সমন্বয়ের ইঙ্গিত
বিশ্লেষকদের মতে, ভারতীয় রিফাইনারিগুলো স্পট মার্কেটে রুশ তেল কেনা কমাচ্ছে। এটি আনুষ্ঠানিক নীতিগত পরিবর্তনের পরিবর্তে ধীরে ধীরে সমন্বয়ের ইঙ্গিত দেয়।
এতে বোঝা যায়, নয়াদিল্লি সরাসরি প্রতিশ্রুতি না দিয়ে বাস্তব পরিস্থিতির ভিত্তিতে জ্বালানি নীতি সামঞ্জস্য করছে।
অর্থনৈতিক প্রভাব: এখনো অনিশ্চিত
বিশ্লেষকদের মতে, চুক্তিটি এখনো রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল ও ভঙ্গুর অবস্থায় রয়েছে। ফলে ভারতের প্রবৃদ্ধি বা অর্থনৈতিক পূর্বাভাসে তাৎক্ষণিক পরিবর্তন আনার মতো স্থিতিশীলতা তৈরি হয়নি।
বাণিজ্য ও জ্বালানি—দুই ক্ষেত্রেই এই চুক্তির বাস্তব প্রভাব নির্ভর করবে ভবিষ্যৎ নীতিগত সিদ্ধান্তের ওপর। বিশেষ করে কৃষি, জ্বালানি ও শিল্পখাতে ভারসাম্য বজায় রাখা ভারতের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।
আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে ভারতের অবস্থান
বিশ্ব রাজনীতিতে পরিবর্তিত বাস্তবতায় ভারত একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করতে চাইছে, অন্যদিকে রাশিয়া ও অন্যান্য অংশীদারদের সঙ্গে ভারসাম্য রক্ষা করছে। এই পরিস্থিতিতে নতুন চুক্তি কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হলেও অভ্যন্তরীণ সমালোচনা সামলানো সহজ নয়।
বর্তমান পরিস্থিতিতে স্পষ্ট যে, এই ভারত-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য চুক্তি এখনো চূড়ান্ত নয় এবং এতে নানা রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ঝুঁকি রয়েছে। চুক্তির বাস্তব রূপ নির্ভর করবে আলোচনার অগ্রগতি, বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার, কৃষি নীতি এবং কূটনৈতিক সম্পর্কের ওপর।
বিশ্লেষকদের মতে, ভারতের সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ হলো—অর্থনৈতিক সুযোগ ও অভ্যন্তরীণ স্বার্থের মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করা।




