ইরানে হামলার সুযোগ খুঁজছে ইসরায়েল—তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদানের এই বিস্ফোরক সতর্কবার্তা মধ্যপ্রাচ্যে নতুন যুদ্ধের শঙ্কা বাড়িয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে উত্তেজনা ছড়াচ্ছে আন্তর্জাতিক রাজনীতির অঙ্গনে। ইরানে হামলার সুযোগ খুঁজছে ইসরায়েল—এমন সতর্ক বার্তা দিয়েছেন তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান। তাঁর এই মন্তব্য শুধু একটি কূটনৈতিক উদ্বেগ নয়, বরং গোটা অঞ্চলের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার জন্য এক গভীর আশঙ্কার প্রতিফলন।
হাকান ফিদানের ভাষায়, বাস্তবতা হলো—ইসরায়েল ইরানের ওপর আঘাত হানার সুযোগ খুঁজছে। এই বক্তব্য এমন এক সময়ে এলো, যখন যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে শক্তিশালী নৌবহর পাঠানোর ঘোষণা দিয়েছে এবং ইরান সর্বোচ্চ সামরিক সতর্কতা জারি করেছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, পরিস্থিতি যেকোনো সময় ভয়াবহ সংঘাতের দিকে মোড় নিতে পারে।
কেন আবার আলোচনায় ইরান–ইসরায়েল সংঘাত
ইরান ও ইসরায়েলের সম্পর্ক দীর্ঘদিন ধরেই বৈরী। তবে সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। গাজা যুদ্ধ, লেবাননের হিজবুল্লাহ ইস্যু এবং ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি—সবকিছু মিলিয়ে উত্তেজনার মাত্রা বেড়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে ইরানে হামলার সুযোগ খুঁজছে ইসরায়েল—এই বক্তব্য শুধু অনুমান নয়, বরং আঞ্চলিক শক্তিগুলোর বাস্তব উদ্বেগের বহিঃপ্রকাশ।
ইরানে হামলার সুযোগ খুঁজছে ইসরায়েল: তুরস্কের স্পষ্ট সতর্কতা

তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান জানিয়েছেন, তিনি গত বছরের ৩০ নভেম্বর তেহরানে ইরানি পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে যৌথ সংবাদ সম্মেলনে সরাসরি এই সতর্কতা দিয়েছেন। তাঁর মতে, ইসরায়েল যদি ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ নেয়, তবে তা পুরো মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতা ধ্বংস করে দিতে পারে।
তিনি এনটিভিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন,
“আমি আশা করি তারা অন্য কোনো পথ খুঁজে পাবে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, ইসরায়েল বিশেষভাবে ইরানের ওপর হামলা চালানোর সুযোগ খুঁজছে।”
এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে কূটনৈতিক অঙ্গনেও বিষয়টি এখন আর গোপন নেই।
তেহরান সফরে বন্ধুর মতো ‘তিতা সত্য’ বললেন ফিদান
হাকান ফিদান সম্প্রতি তেহরান সফরকালে ইরানি কর্মকর্তাদের সঙ্গে একান্ত বৈঠকে নিজের উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন,
“আমি বন্ধু হিসেবে সবকিছু বলেছি। বন্ধুরা সব সময় তিতা সত্য বলে।”
এই মন্তব্য কূটনীতির ভাষায় অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ, এতে বোঝা যায়—তুরস্ক শুধু নিরপেক্ষ পর্যবেক্ষক নয়, বরং সম্ভাব্য যুদ্ধ ঠেকাতে সক্রিয় ভূমিকা নিতে চায়।
এরদোয়ান–পেজেশকিয়ান ফোনালাপ ও তুরস্কের অবস্থান
এর আগে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের সঙ্গে ফোনে কথা বলেন। আলোচনায় তিনি স্পষ্ট করে জানান—
-
তুরস্ক ইরানে যেকোনো বিদেশি হস্তক্ষেপের বিরোধী
-
প্রতিবেশী দেশের শান্তি ও স্থিতিশীলতাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয় আঙ্কারা
এই অবস্থান তুরস্কের ঐতিহ্যগত কূটনীতিরই প্রতিফলন, যেখানে তারা সংঘাত নয়, সংলাপকে প্রাধান্য দেয়।
ইরানের কড়া হুঁশিয়ারি: “সর্বাত্মক যুদ্ধ”
ইরানের একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা Reuters-কে বলেন,
“যেকোনো ধরনের আক্রমণ—সীমিত হোক বা বড়—আমরা তা সর্বাত্মক যুদ্ধ হিসেবে গণ্য করব।”
তিনি আরও জানান, যুক্তরাষ্ট্র যদি ইরানের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন করে, তবে তার কঠোর জবাব দেওয়া হবে। বর্তমানে ইরানে সর্বোচ্চ সামরিক সতর্কতা জারি রয়েছে এবং সেনাবাহিনী সব ধরনের পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত।
যুক্তরাষ্ট্রের নৌবহর ও বাড়তে থাকা সামরিক উপস্থিতি
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে শক্তিশালী নৌবহর পাঠানোর ঘোষণা দিয়েছেন। মার্কিন গণমাধ্যমের তথ্যে জানা গেছে—
-
USS Abraham Lincoln বিমানবাহী রণতরী
-
সহযোগী যুদ্ধজাহাজ
দক্ষিণ চীন সাগর থেকে মধ্যপ্রাচ্যের দিকে রওনা হয়েছে এবং কয়েক দিনের মধ্যেই সেখানে পৌঁছাবে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এই নৌবহর কেবল প্রতিরক্ষামূলক বার্তা নয়; বরং এটি ইরানকে একটি স্পষ্ট কৌশলগত সংকেত।
আঞ্চলিক নিরাপত্তায় কী প্রভাব পড়তে পারে
যদি সত্যিই ইরানে হামলার সুযোগ খুঁজছে ইসরায়েল এবং তা বাস্তবে রূপ নেয়, তবে এর প্রভাব শুধু ইরান বা ইসরায়েলেই সীমাবদ্ধ থাকবে না।
সম্ভাব্য প্রভাবগুলো হলো—
-
মধ্যপ্রাচ্যে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের আশঙ্কা
-
তেলের বাজারে বড় ধাক্কা
-
বিশ্ব অর্থনীতিতে অস্থিরতা
-
শরণার্থী সংকটের ঝুঁকি
এই কারণেই তুরস্কসহ অনেক দেশ আগেভাগেই সতর্ক অবস্থান নিচ্ছে।
অতীত অভিজ্ঞতা: ২০২৪ সালের সামরিক প্রস্তুতি
২০২৪ সালের জুনে যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে বড় পরিসরে নৌবাহিনীর শক্তি জড়ো করেছিল। সেই সময় ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে ১২ দিনের সংঘাতে—
-
ইসরায়েলকে সহায়তা
-
ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় সম্ভাব্য হামলার প্রস্তুতি
নিতে নৌশক্তি বাড়ানো হয়। বর্তমান পরিস্থিতির সঙ্গে সেই সময়ের মিল খুঁজে পাচ্ছেন নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা।
কূটনীতি না সংঘাত—কোন পথে যাবে অঞ্চলটি
বর্তমান বাস্তবতায় প্রশ্ন একটাই—সংঘাত কি অনিবার্য? নাকি কূটনৈতিক তৎপরতায় পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সম্ভব?
তুরস্কের ভূমিকা, ইউরোপীয় ইউনিয়নের নীরব কূটনীতি এবং জাতিসংঘের সম্ভাব্য মধ্যস্থতা—সবকিছু এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তবে বাস্তবতা হলো, মাঠের পরিস্থিতি যতক্ষণ উত্তপ্ত থাকবে, ততক্ষণ ঝুঁকিও থাকবে।
সাধারণ মানুষের উদ্বেগ ও আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া
এই উত্তেজনার সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষ। ইরান, ইসরায়েল কিংবা প্রতিবেশী দেশগুলোতে বসবাসকারী নাগরিকরা নতুন করে অনিশ্চয়তার মুখে পড়ছেন।
বিশ্বজুড়ে শান্তিকামী সংগঠনগুলো ইতোমধ্যে আহ্বান জানিয়েছে—
-
সংযম দেখাতে
-
আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলতে
-
আলোচনার টেবিলে বসতে
তবে এসব আহ্বান কতটা কার্যকর হবে, তা সময়ই বলে দেবে।




