ইরানের বিক্ষোভে নিহত ৩১১৭ জন বলে জানিয়েছে রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম। মানবাধিকার সংগঠন বলছে প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি। বিস্তারিত পড়ুন।
গত বছরের ডিসেম্বরের শেষ দিকে শুরু হওয়া দেশজুড়ে চলমান আন্দোলন এখন ইরানের ইতিহাসে অন্যতম ভয়াবহ অধ্যায়ে পরিণত হয়েছে। ইরানের বিক্ষোভে নিহত ৩১১৭ জন—এমন তথ্য প্রকাশ করেছে দেশটির রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম। বুধবার প্রকাশিত এই তথ্যে নতুন করে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে।
রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের বরাতে ইরানের ভেটেরান ও শহীদ ফাউন্ডেশন এক বিবৃতিতে জানায়, দেশজুড়ে চলমান বিক্ষোভ দমনে সংঘটিত ঘটনায় এখন পর্যন্ত অন্তত ৩ হাজার ১১৭ জন নিহত হয়েছেন। এই সংখ্যা ইরানের বিক্ষোভে নিহত ৩১১৭ জন বিষয়টিকে আরও গভীর উদ্বেগের জায়গায় নিয়ে গেছে।
নিহতদের মধ্যে কারা রয়েছেন?
সরকারি বিবৃতিতে বলা হয়, নিহতদের মধ্যে ২ হাজার ৪২৭ জনকে ইসলামি শরিয়াহ অনুযায়ী ‘শহীদ’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। এই তালিকায় নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরাও রয়েছেন। তাদের ‘নির্দোষ ভুক্তভোগী’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
ইরানের শাসকগোষ্ঠীর দাবি, এই বিক্ষোভ কোনো সাধারণ জনআন্দোলন নয়। বরং এটি একটি ‘সন্ত্রাসী ঘটনা’, যেখানে বিদেশি শক্তির মদদ রয়েছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রকে এর জন্য দায়ী করা হয়েছে।
মানবাধিকার সংগঠনগুলোর ভিন্ন দাবি
তবে মানবাধিকার সংগঠনগুলোর বক্তব্য সম্পূর্ণ ভিন্ন। তাদের মতে, ইরানের বিক্ষোভে নিহত ৩১১৭ জন সরকারি হিসাব হলেও প্রকৃত সংখ্যা অনেক বেশি হতে পারে।
নরওয়েভিভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠন Iran Human Rights জানিয়েছে, তারা এখন পর্যন্ত অন্তত ৩ হাজার ৪২৮ জন বিক্ষোভকারীর মৃত্যুর তথ্য যাচাই করেছে। সংগঠনটির দাবি, এসব বিক্ষোভকারী সরাসরি নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে নিহত হয়েছেন।
সংস্থাটি সতর্ক করে বলেছে, যাচাই করা এই সংখ্যা মোট নিহতের চূড়ান্ত হিসাব নয়। প্রকৃত সংখ্যা ৫ হাজার থেকে শুরু করে ২০ হাজার পর্যন্ত হতে পারে।
ইন্টারনেট বন্ধ, তথ্য সংগ্রহে বড় বাধা

নিহতের সঠিক সংখ্যা নির্ধারণে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে ইরানের দীর্ঘমেয়াদি ইন্টারনেট শাটডাউন। ইন্টারনেট পর্যবেক্ষণ সংস্থা NetBlocks জানিয়েছে, দেশটিতে টানা ৩০০ ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে ইন্টারনেট বন্ধ রাখা হয়েছে।
NetBlocks-এর এক বিবৃতিতে বলা হয়, ইন্টারনেট বন্ধ রেখে বাস্তব পরিস্থিতি আড়াল করার চেষ্টা করা হচ্ছে। সংস্থাটি জানায়, এসব কর্মকাণ্ড আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নথিভুক্ত করা হচ্ছে এবং বিশ্ব পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।
এই ইন্টারনেট বন্ধ থাকার কারণে ইরানের বিক্ষোভে নিহত ৩১১৭ জন সংখ্যাটি নিয়েও স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
রাষ্ট্রীয় দাবির বিপক্ষে অভিযোগ
রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে প্রচারিত বিবৃতিতে বলা হয়েছে, নিহতদের অনেকেই ছিলেন নিরীহ পথচারী, যারা বিক্ষোভ চলাকালে গুলিতে প্রাণ হারান। একই সঙ্গে দাবি করা হয়, কিছু বিক্ষোভকারীকে ভিড়ের মধ্যে লুকিয়ে থাকা ‘সন্ত্রাসী গোষ্ঠী’ গুলি করেছে।
তবে এই দাবির পক্ষে কোনো নির্ভরযোগ্য প্রমাণ বা বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থার উদ্বেগ
এদিকে Amnesty International-সহ একাধিক আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা গুরুতর অভিযোগ তুলেছে। তাদের দাবি, ইরানের নিরাপত্তা বাহিনী পরিকল্পিতভাবে ছাদ থেকে বিক্ষোভকারীদের লক্ষ্য করে গুলি চালিয়েছে।
অনেক ক্ষেত্রে বিক্ষোভকারীদের চোখ লক্ষ্য করেও গুলি করা হয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়। এসব অভিযোগ ইরানের বিক্ষোভে নিহত ৩১১৭ জন ঘটনাকে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার লঙ্ঘনের একটি বড় উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরছে।
যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ইরানের অভিযোগ
ভেটেরান ও শহীদ ফাউন্ডেশন তাদের বিবৃতিতে ইরানের তথাকথিত ‘শত্রুদের বিশ্বাসঘাতক হাত’-এর নিন্দা জানিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ‘অপরাধী নেতৃত্ব’ সহিংসতায় জড়িতদের অস্ত্র, প্রশিক্ষণ ও অর্থ সহায়তা দিয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়।
তবে যুক্তরাষ্ট্র এই অভিযোগ বরাবরের মতোই অস্বীকার করেছে।
আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া ও ভবিষ্যৎ আশঙ্কা
বিশ্বজুড়ে মানবাধিকারকর্মী ও আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা আশঙ্কা করছেন, পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতি না হলে ইরানে মানবিক সংকট আরও ভয়াবহ আকার নিতে পারে।
ইরানের বিক্ষোভে নিহত ৩১১৭ জন—এই সংখ্যা শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়, বরং একটি গভীর মানবিক বিপর্যয়ের প্রতীক হয়ে উঠেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ইরানের বর্তমান পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক চাপ এবং স্বাধীন তদন্ত ছাড়া প্রকৃত সত্য উদঘাটন সম্ভব নয়। ইন্টারনেট বন্ধ রেখে তথ্য নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
ইরানের বিক্ষোভে নিহত ৩১১৭ জন নিয়ে চলমান বিতর্ক বিশ্ব সম্প্রদায়ের সামনে বড় প্রশ্ন তুলে দিয়েছে—মানবাধিকার, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহির প্রশ্ন।




