ইরান নিয়ে ট্রাম্পের সিদ্ধান্ত কেন এত জটিল? সামরিক হামলার ৩টি ঝুঁকিপূর্ণ বিকল্প, মধ্যপ্রাচ্যের ভয়াবহ বাস্তবতা ও এর সম্ভাব্য পরিণতি বিশ্লেষণ।
ইরান নিয়ে ট্রাম্পের সিদ্ধান্ত এখন শুধু একটি পররাষ্ট্রনীতি বিষয় নয়, এটি মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ স্থিতিশীলতার প্রশ্নে পরিণত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের চলমান বিক্ষোভ, দমন–পীড়ন এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় ক্রমেই কঠোর ভাষা ব্যবহার করছেন।
তিনি প্রকাশ্যেই বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র “লকড অ্যান্ড লোডেড”—অর্থাৎ হামলার জন্য প্রস্তুত। এই বক্তব্য ইরানের শাসকদের উদ্দেশে যেমন বার্তা, তেমনি গোটা বিশ্বকেও সতর্ক করার ইঙ্গিত।
কিন্তু বাস্তবতা হলো, ইরান নিয়ে ট্রাম্পের সিদ্ধান্ত নিতে গিয়ে হোয়াইট হাউস চরম দ্বিধা ও ঝুঁকির মুখে পড়েছে। কারণ সামরিক হস্তক্ষেপ মানেই শুধু একটি হামলা নয়—এর পরিণতি হতে পারে গোটা অঞ্চলজুড়ে অস্থিরতা।
ট্রাম্প কেন ইরানে কঠোর অবস্থান নিচ্ছেন

ট্রাম্প নিজেকে তাঁর পূর্বসূরিদের থেকে আলাদা প্রমাণ করতে চান।
-
বারাক ওবামা আলোচনার পথে হেঁটেছিলেন
-
জো বাইডেন সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগেছেন
ট্রাম্প চান ইতিহাস তাঁকে মনে রাখুক একজন দৃঢ় প্রেসিডেন্ট হিসেবে—যিনি শুধু হুমকি দেননি, প্রয়োজনে কাজও করে দেখিয়েছেন।
ইরানের বিক্ষোভকারীদের প্রতি সহানুভূতির কথাও তিনি বলেছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ইরানি জনগণ যদি নির্মম দমন–পীড়নের শিকার হয়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র চুপ করে থাকবে না।
কিন্তু এখানেই সমস্যার শুরু।
ইরান নিয়ে ট্রাম্পের সিদ্ধান্ত: তিনটি বিপজ্জনক সামরিক পথ
বিশেষজ্ঞদের মতে, ট্রাম্পের সামনে কার্যত তিনটি সামরিক বিকল্প খোলা আছে। তবে প্রতিটিই আগেরটির চেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ।
প্রতীকী সামরিক হামলা: শক্তি দেখানোর চেষ্টা
প্রথম বিকল্প হলো সীমিত বা প্রতীকী হামলা।
যেমন—
-
ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের কিছু ব্যারাক
-
কোনো নৌঘাঁটি
-
সামরিক অবকাঠামোর ছোট লক্ষ্যবস্তু
উদ্দেশ্য একটাই—
“কিছু একটা করা হয়েছে” এমন বার্তা দেওয়া, কিন্তু পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ এড়ানো।
কিন্তু বাস্তবে এই কৌশল খুব কমই কাজ করে।
কয়েকটি ভবন ধ্বংস হলে—
-
বিক্ষোভকারীদের ধরপাকড় বন্ধ হয় না
-
ফাঁসি বা দমন–পীড়ন থামে না
-
খামেনির মতো নেতা আরও কঠোর হয়ে ওঠেন
বরং উল্টোভাবে, ইরানি শাসকগোষ্ঠী এটিকে “বিদেশি ষড়যন্ত্র” হিসেবে তুলে ধরে নিজেদের সমর্থকদের আরও সংগঠিত করে।
শীর্ষ নেতৃত্বে আঘাত: বিপজ্জনক ক্ষমতার শূন্যতা
দ্বিতীয় বিকল্পটি আরও নাটকীয়—
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি ও বিপ্লবী গার্ডের শীর্ষ নেতাদের লক্ষ্য করে সরাসরি হামলা।
শুনতে এটি অনেকের কাছে আকর্ষণীয় মনে হয়। ধারণা করা হয়—
শাসক সরালে গণতন্ত্র আপনাতেই আসবে।
কিন্তু ইতিহাস ভিন্ন কথা বলে।
ইরানে সবচেয়ে সংগঠিত ও সশস্ত্র শক্তি হলো Islamic Revolutionary Guard Corps (IRGC)।
এই বাহিনীর সদস্য সংখ্যা প্রায় ১ লাখ ৯০ হাজার।
নেতৃত্বে আঘাত হানলে—
-
এই বাহিনী ভেঙে যাবে না
-
বরং ক্ষমতার লড়াই শুরু হবে
-
শেষ পর্যন্ত সামরিক জান্তা প্রতিষ্ঠিত হতে পারে
বিক্ষোভকারীদের জন্য এটি হবে চরম হতাশাজনক পরিণতি।
দীর্ঘমেয়াদি সামরিক অভিযান: রাষ্ট্র ভাঙনের ঝুঁকি
তৃতীয় পথটি সবচেয়ে বিপজ্জনক।
এতে—
-
পরিকল্পিত বিমান হামলা
-
কমান্ড সেন্টার ধ্বংস
-
অস্ত্রাগার ও যোগাযোগব্যবস্থা অকার্যকর করা
লক্ষ্য হলো ধীরে ধীরে ইরানের নিরাপত্তা কাঠামো ভেঙে দেওয়া।
বাইরে থেকে এটি “নিয়ন্ত্রিত অভিযান” মনে হলেও বাস্তবে এর ফল ভয়াবহ হতে পারে।
রাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ ভেঙে গেলে—
-
ক্ষমতার শূন্যতা তৈরি হয়
-
ঐক্যবদ্ধ বিরোধী নেতৃত্ব থাকে না
-
সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো প্রভাব বিস্তার শুরু করে
লিবিয়া, ইয়েমেন বা সিরিয়ার মতো পরিস্থিতির ঝুঁকি তৈরি হয়।
মিত্রদেশগুলোর সীমাবদ্ধতা ও অনীহা
আরেকটি বড় বাস্তবতা হলো যুক্তরাষ্ট্রের মিত্ররা।
আগের মতো এখন পারস্য উপসাগরে মার্কিন বিমানবাহী রণতরি বহর নেই। ফলে যুক্তরাষ্ট্রকে নির্ভর করতে হবে—
-
সৌদি আরব
-
সংযুক্ত আরব আমিরাত
-
কাতারের ঘাঁটির ওপর
কিন্তু আল-উদেইদ ঘাঁটিতে ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র হামলার অভিজ্ঞতার পর এসব দেশ সরাসরি সংঘাতে জড়াতে চায় না।
কারণ এতে—
-
শহর
-
তেল অবকাঠামো
-
পুরো অর্থনীতি ঝুঁকিতে পড়বে
ইরানের ভবিষ্যৎ কেন বাইরের শক্তি ঠিক করতে পারবে না
দশকের পর দশক দমন–পীড়নে ইরানের—
-
রাজনৈতিক দল
-
শ্রমিক সংগঠন
-
নাগরিক সমাজ
ভেতর থেকে দুর্বল হয়ে গেছে।
সাহস আছে, কিন্তু রাষ্ট্র চালানোর মতো প্রস্তুত কাঠামো নেই।
এ কারণেই অনেক ইরানি শাসকগোষ্ঠীকে অপছন্দ করলেও, রাষ্ট্র ভেঙে পড়ার ভয় আরও বেশি।
আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের দৃষ্টিভঙ্গি
বিশ্ব রাজনীতি বিশ্লেষকরা বলছেন,
ইরান নিয়ে ট্রাম্পের সিদ্ধান্ত যত কঠোরই হোক না কেন, সামরিক পথ কোনো সহজ সমাধান নয়।
সব অলংকারপূর্ণ ভাষা সরিয়ে দিলে বাস্তবতা খুব স্পষ্ট।
-
প্রতীকী হামলা → কার্যত অকার্যকর
-
শীর্ষ নেতৃত্বে আঘাত → সামরিক জান্তার ঝুঁকি
-
দীর্ঘমেয়াদি অভিযান → রাষ্ট্র ভাঙনের আশঙ্কা
এর মানে এই নয় যে ট্রাম্প পদক্ষেপ নেবেন না। রাজনৈতিক চাপ ও ব্যক্তিগত প্রতিশ্রুতি তাঁকে সামরিক পথে ঠেলে দিতে পারে।
কিন্তু যারা আকাশ থেকে নামা “মুক্তির” স্বপ্ন দেখছেন, তারা হতাশ হবেন।
ইরানের ভবিষ্যৎ শেষ পর্যন্ত নির্ধারিত হবে ইরানিদের হাতেই—
দীর্ঘ সাহস, ত্যাগ ও সহনশীলতার লড়াইয়ের মাধ্যমে।
ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে স্বাধীনতা আনা যায় না।




