ইরানে মার্কিন হামলার প্রস্তুতি প্রায় সম্পন্ন। মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি সর্বোচ্চ পর্যায়ে। সম্ভাব্য যুদ্ধ পরিস্থিতির সর্বশেষ বিশ্লেষণ জানুন।
ইরানে মার্কিন হামলার প্রস্তুতি এখন আর গুঞ্জন নয়, বরং মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় পরিণত হতে যাচ্ছে। ইসরায়েলি গণমাধ্যমের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ইরানে একটি বড় ধরনের সামরিক অভিযানের প্রস্তুতি প্রায় সম্পন্ন করেছে। এই খবরে শুধু তেহরান নয়, গোটা বিশ্বজুড়েই নতুন করে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে।
রোববার (২৫ জানুয়ারি) প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি বর্তমানে গত আট মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। যদিও এখনো চূড়ান্ত নির্দেশ জারি হয়নি, তবুও পরিস্থিতি দ্রুত সংঘাতের দিকে এগোচ্ছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
ইরানে মার্কিন হামলার প্রস্তুতি: কেন এত দ্রুত উত্তেজনা বাড়ছে?
ইরানে মার্কিন হামলার প্রস্তুতি জোরালো হওয়ার পেছনে রয়েছে একাধিক কৌশলগত কারণ। প্রথমত, ইরানে চলমান সরকারবিরোধী বিক্ষোভ দমনে তেহরানের কঠোর অবস্থান। দ্বিতীয়ত, যুক্তরাষ্ট্রের মতে, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় ইরানের সামরিক তৎপরতা নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি হয়ে উঠেছে।
ইসরায়েলি চ্যানেল ১২ জানিয়েছে, মার্কিন বাহিনীর মোতায়েন প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ হতে আরও কয়েক দিন সময় লাগতে পারে। তবে বাস্তবে প্রস্তুতির বেশিরভাগ ধাপ ইতোমধ্যেই শেষ।
যুক্তরাষ্ট্রের শক্তিবৃদ্ধি: কী কী সামরিক সরঞ্জাম মোতায়েন?

বর্তমান ইরানে মার্কিন হামলার প্রস্তুতি-এর অংশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে ব্যাপক সামরিক শক্তি মোতায়েন করেছে। এর মধ্যে রয়েছে—
-
বিমানবাহী রণতরি USS Abraham Lincoln
-
একাধিক গাইডেড মিসাইল ডেস্ট্রয়ার
-
শক্তিশালী ক্রুজার জাহাজ
-
যুদ্ধবিমান স্কোয়াড্রন
-
উন্নত আকাশ ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা
এই মোতায়েন স্পষ্টভাবে ইঙ্গিত দেয় যে, ওয়াশিংটন কেবল কূটনৈতিক চাপেই সীমাবদ্ধ নেই।
ট্রাম্প প্রশাসনের অবস্থান ও হুঁশিয়ারি
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আগেই নিশ্চিত করেছিলেন, একটি “বিশাল নৌবহর” ইরানের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে ইরানে সরকারবিরোধী আন্দোলন শুরু হওয়ার পর থেকেই ট্রাম্প প্রশাসন একাধিকবার সামরিক অভিযানের ইঙ্গিত দিয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ইরানে মার্কিন হামলার প্রস্তুতি মূলত চাপ সৃষ্টির কৌশল হলেও, ভুল সিদ্ধান্ত পরিস্থিতিকে ভয়াবহ যুদ্ধে রূপ দিতে পারে।
ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ প্রস্তুতি ও সতর্কতা
সম্ভাব্য ইরানি পাল্টা হামলার আশঙ্কায় ইসরায়েল অভ্যন্তরীণভাবে ব্যাপক প্রস্তুতি শুরু করেছে। দেশটির হোম ফ্রন্ট কমান্ড জানিয়েছে—
-
এখনো নতুন গণ-নির্দেশনা জারি হয়নি
-
পরিস্থিতি পরিবর্তন হলে তাৎক্ষণিকভাবে জনগণকে জানানো হবে
এই প্রস্তুতি প্রমাণ করে, ইরানে মার্কিন হামলার প্রস্তুতি কেবল যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই।
ইরানের কঠোর হুঁশিয়ারি: ‘সর্বাত্মক যুদ্ধ’
ইরান স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে, যেকোনো ধরনের মার্কিন হামলাকে তারা “সর্বাত্মক যুদ্ধ” হিসেবে বিবেচনা করবে। ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (IRGC)-এর কমান্ডার মোহাম্মদ পাকপুর বলেছেন—
“তেহরান এখন ট্রিগারে আঙুল রেখে প্রস্তুত।”
এই বক্তব্য মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, ইরানে মার্কিন হামলার প্রস্তুতি বাস্তবে রূপ নিলে এর প্রতিক্রিয়া হবে বহুমাত্রিক।
ইরানের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি ও মানবাধিকার উদ্বেগ
হিউম্যান রাইটস অ্যাক্টিভিস্ট নিউজ এজেন্সি (HRANA)-এর তথ্য অনুযায়ী—
-
প্রায় ৪,০০০ মানুষ নিহত
-
হাজার হাজার মানুষ গ্রেপ্তার
তবে ইন্টারনেট বিচ্ছিন্ন থাকায় এসব তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা কঠিন। এই মানবাধিকার পরিস্থিতিও ইরানে মার্কিন হামলার প্রস্তুতি আলোচনায় একটি বড় ভূমিকা রাখছে।
আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক প্রভাব
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, যদি ইরানে মার্কিন হামলার প্রস্তুতি সরাসরি সংঘাতে রূপ নেয়—
-
পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে বড় যুদ্ধের ঝুঁকি বাড়বে
-
বিশ্ব জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা সৃষ্টি হবে
-
বৈশ্বিক নিরাপত্তা ব্যবস্থায় নেতিবাচক প্রভাব পড়বে
ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশগুলো ইতোমধ্যেই সর্বোচ্চ সতর্কতায় রয়েছে।
আগামী কয়েক দিন মধ্যপ্রাচ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ওয়াশিংটন ও তেহরান—দুই পক্ষই অনড় অবস্থানে থাকায় কূটনৈতিক সমাধানের পথ সংকুচিত হয়ে আসছে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, ইরানে মার্কিন হামলার প্রস্তুতি শুধু একটি সামরিক ঘটনা নয়; এটি বৈশ্বিক রাজনীতি, অর্থনীতি ও নিরাপত্তার জন্য বড় এক পরীক্ষার মুহূর্ত।




