জামায়াত চাঁদা হাদিয়া বিতর্ক নিয়ে নোয়াখালীতে কঠোর ও বিস্ফোরক বক্তব্য দেন বিএনপি নেতা বরকত উল্লাহ বুলু। নির্বাচন ও ইতিহাস প্রসঙ্গ উঠে আসে।
নোয়াখালীর বেগমগঞ্জে এক নির্বাচনী জনসভায় জামায়াত চাঁদা হাদিয়া বিতর্ক ঘিরে কঠোর ও বিস্ফোরক বক্তব্য দিয়েছেন বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান, সাবেক মন্ত্রী এবং নোয়াখালী-৩ (বেগমগঞ্জ) আসনের ধানের শীষের প্রার্থী বরকত উল্লাহ বুলু। জামায়াতকে “মুনাফিকের দল” আখ্যা দিয়ে তিনি দলটিকে বয়কট করার আহ্বান জানান এবং বলেন, চাঁদার প্রশ্নে দ্বিচারিতা ও রাজনৈতিক সহিংসতার ইতিহাস নিয়ে জামায়াতের ভূমিকা নতুন নয়।
কোথায় ও কখন বক্তব্য
সোমবার (২ ফেব্রুয়ারি) সন্ধ্যায় নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ উপজেলার একলাশপুর বাজারসংলগ্ন এলাকায় আয়োজিত নির্বাচনী জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে বরকত উল্লাহ বুলু এসব কথা বলেন। স্থানীয় বিএনপি নেতাকর্মীদের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত এই সভাটি ছিল নির্বাচনী প্রচারণার অংশ।
জামায়াত চাঁদা হাদিয়া বিতর্ক নিয়ে সরাসরি অভিযোগ

বরকত উল্লাহ বুলু বলেন, জামায়াত চাঁদা নিলে সেটিকে ‘হাদিয়া’ বলা হয়, অথচ অন্য কেউ চাঁদা নিলে তা ‘চাঁদাবাজি’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়—এটি রাজনৈতিক ভণ্ডামির স্পষ্ট উদাহরণ। তাঁর ভাষায়, “জামায়াত নিজেদের সুবিধামতো সবকিছুর ব্যাখ্যা দেয়।”
তিনি আরও অভিযোগ করেন, ২৪-এর জুলাই-আগস্ট বিপ্লবের পর দেশের এমন কোনো শিল্পপ্রতিষ্ঠান নেই, যেখান থেকে জামায়াত বিপুল অঙ্কের অর্থ আদায় করেনি। যদিও তিনি কোনো নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানের নাম উল্লেখ করেননি, তবে বক্তব্যে জামায়াতের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড নিয়ে তীব্র সমালোচনা করেন।
১৯৭১ সালের ভূমিকা নিয়ে কঠোর মন্তব্য
বরকত উল্লাহ বুলু বলেন, মুক্তিযুদ্ধের সময় জামায়াতের ভূমিকা ছিল ভয়াবহ। তাঁর দাবি অনুযায়ী, ১৯৭১ সালে ৩০ লাখ মানুষ হত্যার সঙ্গে জামায়াত জড়িত ছিল এবং সে সময় মা-বোনদের সম্ভ্রমহানির ঘটনাও ঘটেছে। তিনি অভিযোগ করেন, যুদ্ধকালীন সময়ে জামায়াত ফতোয়া দিয়ে নারী নির্যাতনকে বৈধ করার চেষ্টা করেছিল।
তিনি বলেন, “এরা তখন ফতোয়া দিয়েছিল যে যুদ্ধের সময় মা-বোনরা গনিমতের মাল—এটা নাকি জায়েজ।” এই বক্তব্যের মাধ্যমে তিনি জামায়াতের ঐতিহাসিক ভূমিকার প্রতি প্রশ্ন তোলেন এবং দলটিকে রাজনৈতিকভাবে বর্জনের আহ্বান জানান।
নিরাপত্তা ও হুমকির প্রসঙ্গ
বুলু আরও বলেন, বর্তমান সময়েও জামায়াতের পক্ষ থেকে হত্যার হুমকি দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। তাঁর ভাষায়, “এত সোজা না, এটা বাংলাদেশ। আপনাদের কাছে এ দেশ জিম্মি হয়নি।” এই বক্তব্যের মাধ্যমে তিনি রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে শক্ত বার্তা দেন এবং রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের প্রশ্নটি সামনে আনেন।
জিয়া পরিবার ও উন্নয়ন প্রসঙ্গ
বরকত উল্লাহ বুলু তাঁর বক্তব্যে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার অবদানের কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশের উন্নয়নের মূল ভিত্তি এই দুই নেতার হাত ধরেই তৈরি হয়েছে।
তিনি উল্লেখ করেন, তাঁদের অবদানের কারণে কোটিরও বেশি মানুষ প্রবাসে কর্মরত রয়েছে এবং সেই রেমিট্যান্স বাংলাদেশের অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করছে। এই বক্তব্যে তিনি বিএনপির উন্নয়নমূলক রাজনৈতিক অবস্থান তুলে ধরার চেষ্টা করেন।
জানাজার ইতিহাস নিয়ে মন্তব্য
বুলু বলেন, পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে বড় জানাজা হয়েছিল শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের। পরে সেই রেকর্ড ভেঙে বেগম খালেদা জিয়ার জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। তাঁর মতে, কেয়ামতের আগপর্যন্ত এমন বৃহৎ জানাজা আর কারও ভাগ্যে হবে কি না, তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে।
নির্বাচন ও “ব্যালট বিপ্লব”
বিএনপি প্রসঙ্গে বরকত উল্লাহ বুলু বলেন, দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও গণতন্ত্র বিএনপি এবং তারেক রহমানের হাতেই নিরাপদ। তিনি আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ব্যালট বিপ্লবের মাধ্যমে বিএনপিকে রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত করার আহ্বান জানান।
সভার নেতৃত্ব ও উপস্থিত নেতৃবৃন্দ
একলাশপুর ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক সভাপতি গোলাম মহিউদ্দিন টিপুর সভাপতিত্বে এবং সাবেক সাধারণ সম্পাদক আব্দুর রহিম চুন্নুর সঞ্চালনায় সভায় বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন—
-
নোয়াখালী জেলা বিএনপির আহ্বায়ক মাহাবুব আলমগীর আলো
-
বিএনপি নেত্রী শামীমা বরকত লাকি
-
বেগমগঞ্জ উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক কামাখ্যা চন্দ্র দাস
-
সদস্যসচিব মাহফুজুল হক আবেদ
-
চৌমুহনী পৌর বিএনপির আহ্বায়ক জহির উদ্দিন হারুন
এছাড়াও উপস্থিত ছিলেন উপজেলা বিএনপির সাবেক শ্রমবিষয়ক সম্পাদক মো. শহীদ উল্লাহ, বিএনপি নেতা আবু নাসের মামুন, তারেকুজ্জামান তারেক, মোরশেদ আলম, সাবেক ছাত্রদল নেতা জিয়া উদ্দিন ভূঁইয়া, গোলাম কিবরিয়া পিটলু, দেলোয়ার হোসেন জসিমসহ আরও অনেকে।
রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে জামায়াত চাঁদা হাদিয়া বিতর্ক
বর্তমান নির্বাচনী রাজনীতিতে জামায়াত চাঁদা হাদিয়া বিতর্ক নতুন করে আলোচনায় এসেছে। বিএনপি নেতাদের বক্তব্যে জামায়াতের অতীত ও বর্তমান রাজনৈতিক ভূমিকা আবারও প্রশ্নের মুখে পড়ছে। এই বিতর্ক নির্বাচনী মাঠে ভোটারদের সিদ্ধান্তে কী প্রভাব ফেলবে, তা সময়ই বলে দেবে।




