কালো চিল হয়ে ভোটে হাত দিলে ডানা খুলে ফেলতে হবে—ফরিদপুরে ৬ ফেব্রুয়ারির জনসভায় জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমানের শক্ত ও গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য।
ফরিদপুরে এক নির্বাচনী জনসভায় কালো চিল হয়ে ভোটে হাত দিলে ডানা খুলে ফেলতে হবে—এমন শক্ত ও প্রতীকী ভাষায় ভোটাধিকার রক্ষার আহ্বান জানিয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, জনগণের ভোটে হস্তক্ষেপের যেকোনো প্রচেষ্টা প্রতিহত করতে হবে এবং এবার “আমার ভোট আমিই দেব”—এই দাবি বাস্তবায়ন করাই লক্ষ্য।
শুক্রবার (৬ ফেব্রুয়ারি) সন্ধ্যা ৭টার দিকে ফরিদপুরের বোয়ালমারী স্টেডিয়াম মাঠে অনুষ্ঠিত ফরিদপুর-১ আসনের (বোয়ালমারী, আলফাডাঙ্গা ও মধুখালি) নির্বাচনী জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন জামায়াত আমির।
ভোটাধিকার রক্ষায় প্রতীকী সতর্কবার্তা
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, আসমান থেকে যদি “কালো চিল” নেমে এসে ভোটের ওপর হাত দেয়, তবে তার ডানা খুলে ফেলতে হবে—অর্থাৎ ভোট কারচুপি বা দখলের যেকোনো চেষ্টাকে কঠোরভাবে রুখে দিতে হবে। তার ভাষায়, একসময়ের “আমার ভোট আমি দেব, তোমারটাও আমি দেব”—এই স্লোগান এখন অতীত। এখন একটাই কথা—আমার ভোট আমিই দেব।
এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে তিনি ভোটাধিকার প্রশ্নে আপসহীন অবস্থানের বার্তা দেন এবং নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় জনগণের সরাসরি অংশগ্রহণের ওপর জোর দেন।
কালো চিল হয়ে ভোটে হাত দিলে ডানা খুলে ফেলতে হবে: নির্বাচনের প্রেক্ষাপট

জামায়াত আমির আগামী নির্বাচনকে “মুক্তির হাতছানি” হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, একটি ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে আগামী ১২ তারিখ দেশের মানুষকে ডাক দিচ্ছে। তার বক্তব্যে ইঙ্গিত ছিল—দীর্ঘ সময়ের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা ও শাসনামলের পর জনগণ এখন পরিবর্তনের অপেক্ষায়।
তিনি আরও বলেন, গত ৫৪ বছরে অনেকেই দেশ পরিচালনার চেষ্টা করেছেন। কী দেওয়া হয়েছে, কী দেওয়া হয়নি—তার সাক্ষী দেশের প্রায় ১৮ কোটি মানুষ। এই অভিজ্ঞতার আলোকে তিনি নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার কথা তুলে ধরেন।
পরিবারতন্ত্র ও গোষ্ঠীতন্ত্রের বিরোধিতা
ডা. শফিকুর রহমান স্পষ্ট ভাষায় বলেন, তিনি কোনো দলের সরকার চান না, কোনো পরিবারতান্ত্রিক সরকার চান না, কিংবা কোনো গোষ্ঠীতান্ত্রিক সরকারও চান না। তার প্রত্যাশা—জনগণের সরকার এবং একটি ঐক্যবদ্ধ বাংলাদেশ।
তার মতে, রাষ্ট্র পরিচালনায় ক্ষমতার কেন্দ্রীভবন কিংবা পারিবারিক আধিপত্য গণতন্ত্রকে দুর্বল করে। তাই জনগণের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ ও মতামতের ভিত্তিতেই সরকার গঠনের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন তিনি।
ধর্ম ও বর্ণভিত্তিক বিভাজনের রাজনীতির বিরোধিতা
ধর্ম, বর্ণ ও জাতিগত বিভাজনের রাজনীতির বিরোধিতা করে জামায়াত আমির বলেন, বাংলাদেশকে সব ধর্ম ও বর্ণের মানুষের জন্য একটি “ফুলের বাগান”-এর মতো করে গড়ে তুলতে চান তিনি। তার ভাষায়, বিভক্ত করার কোনো সুযোগ কাউকে দেওয়া হবে না।
এই বক্তব্যে তিনি একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজব্যবস্থার কথা বলেন, যেখানে নাগরিক পরিচয়ই হবে প্রধান ভিত্তি।
নতুন বাংলাদেশের প্রত্যয় ও মানবাধিকার প্রসঙ্গ
অতীতের রাজনীতির অবসান টেনে নতুন বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয় জানিয়ে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, জামায়াত সরকার গঠন করতে পারলে দেশের মানচিত্র বদলাবে না, কিন্তু বদলাবে তার খাসলত।
তিনি জোর দিয়ে বলেন, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ হওয়ার কারণে আর কাউকে খুন, গুম কিংবা তথাকথিত “আয়নাঘরে” পাঠানো হবে না। ন্যায়বিচার ও মানবাধিকারের প্রশ্নে তিনি বলেন, এমন বাংলাদেশ তারা চান না যেখানে টাকার বিনিময়ে বিচার বিক্রি হয় বা পকেটের জোর না থাকলে বিচার পাওয়া যায় না।
প্রার্থী ডা. ইলিয়াস মোল্লার পক্ষে ভোট প্রার্থনা
জনসভায় জামায়াত আমির ফরিদপুর-১ আসনের জামায়াত মনোনীত ও ১১ দলীয় জোট সমর্থিত প্রার্থী ডা. ইলিয়াস মোল্লাকে “ভাই” সম্বোধন করে তার হাতে দাঁড়িপাল্লা প্রতীক তুলে দেন এবং উপস্থিত জনতার কাছে ভোট প্রার্থনা করেন।
এটি ছিল প্রার্থীর প্রতি আনুষ্ঠানিক সমর্থন ও নির্বাচনী প্রচারণার একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত।
জনসভায় উপস্থিত নেতৃবৃন্দ
ফরিদপুর জেলা জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির আবু হারিস মোল্লার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই জনসভায় আরও বক্তব্য দেন—
-
ফরিদপুর জেলা জামায়াতের আমির মাওলানা বদরুদ্দীন
-
প্রার্থী ডা. মো. ইলিয়াস মোল্লা
-
খেলাফত মজলিসের যুগ্ম মহাসচিব মুফতি শরাফত হোসেন
সভা সঞ্চালনা করেন বোয়ালমারী পৌর জামায়াতের সভাপতি মাওলানা সৈয়দ নিয়ামুল হাসান এবং সেক্রেটারি সৈয়দ সাজ্জাদ আলী।
নির্বাচন ও ভোটাধিকার নিয়ে জাতীয় বিতর্ক
কালো চিল হয়ে ভোটে হাত দিলে ডানা খুলে ফেলতে হবে—এই বক্তব্য শুধু একটি নির্বাচনী স্লোগান নয়, বরং দেশের চলমান ভোটাধিকার ও নির্বাচন ব্যবস্থা নিয়ে জাতীয় বিতর্কের প্রতিফলন। নির্বাচন ঘিরে সহিংসতা, অনিয়ম ও ভোট কারচুপির অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনায় রয়েছে।
ফরিদপুরের বোয়ালমারীর জনসভায় জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমানের বক্তব্যে ভোটাধিকার, ন্যায়বিচার ও রাজনৈতিক সংস্কারের প্রশ্নগুলো নতুন করে সামনে এসেছে। কালো চিল হয়ে ভোটে হাত দিলে ডানা খুলে ফেলতে হবে—এই বাক্যটি এখন নির্বাচনী রাজনীতিতে একটি শক্ত প্রতীকী বার্তায় পরিণত হয়েছে, যা ভোটের অধিকার রক্ষায় জনগণকে সচেতন ও সোচ্চার থাকার আহ্বান জানায়।




