আমদানি বেড়েছে ১১%, তবু বাজারে খেজুরের বাড়তি দাম রোজার আগে বেড়েছে ৫০–২০০ টাকা। আমদানি ১১% বাড়লেও চাহিদা ও সরবরাহ ঘাটতি দাম বাড়ার মূল কারণ।
রোজার বাজারে খেজুরের গুরুত্ব আলাদা। দেশের বিভিন্ন পাইকারি ও খুচরা বাজারে খেজুরের দাম বাড়ায় ভোক্তাদের ব্যয়ও বেড়ে যাচ্ছে। চট্টগ্রাম বন্দরে আমদানিকৃত খেজুর নিয়মিত খালাস হলেও, এবার পাঁচ ধরনের খেজুরের দাম গত বছরের তুলনায় ৫০ থেকে ২০০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে।
বাংলাদেশ ফ্রেশ ফ্রুটস ইমপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি সিরাজুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেছেন, সরবরাহে সাময়িক ঘাটতির কারণে জাহিদি খেজুরের দাম বাড়েছে। তিনি আরও জানান, বন্দরের কার্যক্রম স্বাভাবিক হয়েছে এবং নতুন চালান আসছে, এক সপ্তাহের মধ্যে দাম কমে যাবে।
জাহিদি খেজুরের দাম বেড়েছে নাটকীয়ভাবে
বাজারে সবচেয়ে আলোচ্য খেজুর হচ্ছে জাহিদি খেজুর, যা মূলত ইরাক থেকে দুবাই হয়ে চট্টগ্রাম বন্দরে আসে। নিম্ন ও নিম্নমধ্যবিত্তের মধ্যে এটি খুবই জনপ্রিয়। এবার রোজার আগেই জাহিদি খেজুরের খুচরায় প্রতি কেজি দাম বেড়েছে ৩৫০ টাকা, যেখানে গত বছর রোজার সময় দাম ছিল ২০০ টাকা। পাইকারি বাজারে কার্টন অনুযায়ী বিক্রি হওয়া জাহিদি খেজুরের দাম ২৮০ টাকা, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ১০০ টাকা বেশি।
এ ছাড়া দাব্বাস, নাকাল, মাশরুখ ও আম্বর জাতীয় খেজুরের দামও বেড়েছে ৫০ থেকে ২০০ টাকা পর্যন্ত। এই মূল্যবৃদ্ধি মূলত সরবরাহ ও চাহিদার ভারসাম্যহীনতার ফল।
আমদানি বেড়েছে ১১%

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্য অনুযায়ী, ১ নভেম্বর ২০২৫ থেকে ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ পর্যন্ত খেজুর আমদানি হয়েছে ৪৯,৮০৭ টন। গত বছর একই সময়ে আমদানির পরিমাণ ছিল ৪৪,৭১৬ টন। অর্থাৎ আমদানি বেড়েছে ৫,০৯১ টন বা ১১.৪%।
অন্তর্বর্তী সরকার রমজান মাসে খেজুরের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে শুল্ক কমিয়েছে। ২৪ ডিসেম্বর ২০২৫ থেকে খেজুরের আমদানি শুল্ক ২৫% থেকে কমিয়ে ১৫% করা হয়। একইসাথে অগ্রিম আয়কর কমানো হয়েছে ১০% থেকে ৫%, যা ৩১ মার্চ পর্যন্ত কার্যকর। খেজুরের দাম রোজার আগে বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণে রাখার এই পদক্ষেপ গুরুত্বপূর্ণ বলে বিশ্লেষকরা মন্তব্য করেছেন।
সরবরাহ ব্যাঘাত ও দাম বাড়ার কারণ
বাজার ও আমদানির তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, সম্প্রতি থাইল্যান্ড থেকে আসা একটি জাহাজে থাকা প্রায় ৪ হাজার টন খেজুর সাগরে ডুবে গেছে। এই চালানের প্রায় ৯০% ছিল জাহিদি খেজুর। এছাড়া চট্টগ্রামের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনালে কর্মবিরতির কারণে কয়েক দিন খালাস বন্ধ ছিল। এই ঘটনায় সরবরাহ ব্যাহত হয়ে দাম বাড়তে সাহায্য করেছে।
মো. কামাল, আল্লাহর রহমত স্টোরের কর্ণধার বলেন, “জাহাজ ডুবে যাওয়ার কারণে বিপুল পরিমাণ জাহিদি খেজুর বাজারে আসেনি। ব্যবসায়ীরা তাৎক্ষণিক বিকল্প উৎস থেকে খেজুর সংগ্রহ করেছেন, যা আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে বাজারে আসবে এবং দাম কমবে।”
ফারুক আহমেদ, ফারুক ট্রেড ইন্টারন্যাশনালের কর্ণধার, বলেন, “শুল্ক-কর কমানো এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালার নমনীয়তার কারণে ব্যবসায়ীরা পর্যাপ্ত খেজুর আমদানি করতে পারছেন। সরবরাহ ঘাটতি শিগগিরই কেটে যাবে।”
পাইকারি ও খুচরা বাজারে দাম
চট্টগ্রামের স্টেশন রোডের ফলমন্ডিতে নাকাল জাতের খেজুর প্রতি কেজি ৩৬০ টাকা, মাশরুখ ৪৫০ টাকা এবং আম্বর ৮০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। গত বছরের তুলনায় দাম যথাক্রমে ২৮০, ৪০০ ও ৬০০ টাকা ছিল। দাব্বাস খেজুর ৫০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, যেখানে আগের বছর দাম ছিল ৪০০ টাকা। অন্যদিকে আজোয়া, মেডজুল ও মরিয়ম জাতীয় খেজুরের দাম তুলনামূলক স্থিতিশীল।
রিয়াজউদ্দিন, একজন ক্রেতা, বলেন, “রোজায় প্রতিদিনই খেজুর লাগে। দাম বেড়েছে হলেও কিনতে হয়।”
মো. শফিউল আজম, ফ্রেশ ফ্রুটস অ্যান্ড ডেটসের কর্ণধার, বলেন, “পাইকারিতে বেশির ভাগ খেজুরের দাম স্থিতিশীল। তবে জাহিদি ও দাব্বাস জাতের দাম কিছুটা বাড়তি।”
সরকারি সংস্থা টিসিবিও সারা দেশে ১৬০ টাকা কেজি দরে খেজুর বিক্রি করছে। ক্রেতা সর্বোচ্চ আধা কেজি খেজুর কিনতে পারবেন।
বাজারে চাহিদা ও সরবরাহের ভারসাম্য
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং বিভাগের অধ্যাপক সজীব কুমার ঘোষ বলেন, “খেজুর এখন কেবল রোজাভিত্তিক নয়; সারা বছরই চাহিদা রয়েছে। তবে রোজার সময় চাহিদা দ্বিগুণের বেশি হয়ে যায়। সরবরাহ ঠিকমতো না থাকলে সামান্য ঘাটতিও দাম বাড়ার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।”
এ কারণে, যদিও আমদানি বেড়েছে এবং শুল্ক কমানো হয়েছে, তবুও খুচরা বাজারে দাম বেড়ে যাচ্ছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, পাইকারি পর্যায়ে সামান্য মূল্যবৃদ্ধি খুচরায় আরও বাড়িয়ে দেয়। তদারকি কম থাকাও মূল কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।




