কুড়িগ্রামে শীতের দাপট আবারও বেড়েছে। তাপমাত্রা নেমেছে ১৪ ডিগ্রিতে, ঘন কুয়াশা ও হিমেল হাওয়ায় বিপর্যস্ত জনজীবন। বিস্তারিত জানুন।
কুড়িগ্রামে শীতের দাপট আবারও নতুন করে অনুভূত হচ্ছে। কয়েক দিনের স্বস্তির পর জেলার মানুষ ফের পড়েছে তীব্র শীতের কবলে। শুক্রবার (১৯ ডিসেম্বর) রাত থেকেই হিমেল হাওয়া ও ঘন কুয়াশা জেলার প্রতিটি এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। শনিবার (২০ ডিসেম্বর) সকাল ৬টায় জেলার সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ১৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস।
আবহাওয়ার এমন পরিবর্তনে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন নিম্নআয়ের মানুষ, দিনমজুর ও চরাঞ্চলের বাসিন্দারা। শীতের প্রকোপ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে স্বাভাবিক জীবনযাত্রায়ও বড় ধরনের ব্যাঘাত সৃষ্টি হয়েছে।
ঘন কুয়াশা ও আর্দ্রতায় বেড়েছে শীতের অনুভূতি
শনিবার ভোর থেকেই কুয়াশায় ঢেকে যায় কুড়িগ্রামের আকাশ। সকাল সাড়ে ৯টা পর্যন্ত সূর্যের দেখা মেলেনি। ফলে শীতের তীব্রতা সারাদিনই অনুভূত হয়।
আবহাওয়া অফিস সূত্র জানায়, বাতাসে আর্দ্রতার পরিমাণ ছিল প্রায় ৯৭ শতাংশ। এই অতিরিক্ত আর্দ্রতার কারণে তাপমাত্রা তুলনামূলক কম না হলেও কুড়িগ্রামে শীতের দাপট আরও বেশি অনুভূত হচ্ছে।
শীতল বাতাস শরীর ভেদ করে যাওয়ায় শিশু ও বয়স্কদের মধ্যে ঠাণ্ডাজনিত অসুস্থতার ঝুঁকিও বাড়ছে।
নিম্নআয়ের মানুষ ও দিনমজুরদের চরম দুর্ভোগ

শীতের তীব্রতায় সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়েছেন দিনমজুর ও খেটে খাওয়া মানুষ। অনেকেই সকালে কাজে বের হতে পারেননি। কেউ কেউ আগুন জ্বালিয়ে কিংবা মোটা কাপড় জড়িয়ে ঠাণ্ডা মোকাবেলার চেষ্টা করছেন।
চরাঞ্চলের বাসিন্দারা জানান, সেখানে শীতের প্রভাব আরও বেশি। নদীঘেঁষা এলাকাগুলোতে হিমেল হাওয়া সরাসরি আঘাত হানছে, যা কুড়িগ্রামে শীতের দাপটকে আরও কষ্টকর করে তুলেছে।
স্থানীয় বাসিন্দা মেনতাজ আলী বলেন,
“কয়েক দিন শীত কম ছিল। হঠাৎ করেই ঠাণ্ডা বাতাস শুরু হয়েছে। এতে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে।”
যান চলাচলে প্রভাব, বাড়ছে যাত্রীদের ভোগান্তি
ঘন কুয়াশার কারণে কুড়িগ্রামের মহাসড়ক ও আঞ্চলিক সড়কগুলোতে যানবাহন চলাচল ধীরগতিতে হচ্ছে। অনেক জায়গায় হেডলাইট জ্বালিয়েও গাড়ি চলতে দেখা গেছে।
বিশেষ করে সকালের দিকে দূরপাল্লার বাস ও পণ্যবাহী যান চলাচলে বিঘ্ন ঘটে। এতে যাত্রীদের গন্তব্যে পৌঁছাতে দেরি হচ্ছে এবং বাড়তি দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।
পরিবহন সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কুয়াশা না কাটলে দুর্ঘটনার ঝুঁকিও বাড়তে পারে। তাই চালকদের সতর্কভাবে গাড়ি চালানোর পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
কুড়িগ্রামে শীতের দাপট নিয়ে আবহাওয়া অফিসের পূর্বাভাস
রাজারহাট আবহাওয়া ও কৃষি পর্যবেক্ষণাগারের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সুবল চন্দ্র সরকার জানান, তাপমাত্রা ১৪ ডিগ্রি থাকলেও ঠাণ্ডা বাতাসের কারণে শীত বেশি অনুভূত হচ্ছে।
তিনি বলেন,
“আগামী কয়েক দিন এ ধরনের শীত অব্যাহত থাকতে পারে। রাত ও ভোরের দিকে কুয়াশা আরও ঘন হতে পারে।”
আবহাওয়াবিদদের মতে, উত্তরাঞ্চলে শীতপ্রবাহের প্রভাব ধীরে ধীরে বাড়ছে। ফলে কুড়িগ্রামে শীতের দাপট আরও কয়েক দিন স্থায়ী হতে পারে।
বাংলাদেশের আবহাওয়া সংক্রান্ত সর্বশেষ তথ্যের জন্য বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের (BMD) অফিসিয়াল পূর্বাভাস নিয়মিত অনুসরণ করার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
কৃষি ও ফসলের ওপর শীতের সম্ভাব্য প্রভাব
শীতের এই দাপট কৃষি খাতেও প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে বোরো ধানের চারা, শাকসবজি ও শীতকালীন ফসলের ওপর অতিরিক্ত কুয়াশা ও ঠাণ্ডা নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
কৃষি কর্মকর্তারা বলছেন, সকালে জমিতে অতিরিক্ত কুয়াশা থাকলে রোগবালাইয়ের ঝুঁকি বাড়ে। তাই কৃষকদের সতর্ক থাকতে এবং প্রয়োজনীয় পরামর্শ অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে।
স্বাস্থ্যঝুঁকি ও করণীয়
কুড়িগ্রামে শীতের দাপট বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে ঠাণ্ডাজনিত রোগ যেমন—সর্দি, কাশি, জ্বর ও নিউমোনিয়ার ঝুঁকি বাড়ছে।
চিকিৎসকরা পরামর্শ দিচ্ছেন—
-
শিশু ও বয়স্কদের উষ্ণ কাপড়ে ঢেকে রাখা
-
ভোর ও রাতে অপ্রয়োজনে বাইরে না যাওয়া
-
গরম খাবার ও পানীয় গ্রহণ
-
শীতজনিত সমস্যা দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া
বিশেষ করে দরিদ্র মানুষদের জন্য শীতবস্ত্র বিতরণ কার্যক্রম জোরদার করার দাবি উঠেছে।
আবহাওয়া অফিসের পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী কয়েক দিন কুড়িগ্রামে তাপমাত্রা খুব বেশি না বাড়লেও শীতের অনুভূতি বজায় থাকবে। বিশেষ করে রাত ও সকালের দিকে কুয়াশা ঘন হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
এ অবস্থায় সাধারণ মানুষকে সতর্ক থাকার পাশাপাশি প্রশাসনের পক্ষ থেকে শীতবস্ত্র বিতরণ ও সহায়তা কার্যক্রম আরও জোরদার করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।




