মান্না বেঁচে থাকলে শাকিবের উত্থান এতটা সহজ হতো না—এক পডকাস্টে এমন গুরুত্বপূর্ণ ও নাটকীয় মন্তব্য করেছেন প্রবীণ অভিনেতা সোহেল রানা।
মান্না বেঁচে থাকলে শাকিবের উত্থান সহজ হতো না—এমনই এক নাটকীয় ও গুরুত্বপূর্ণ দাবি করেছেন ঢালিউডের প্রবীণ অভিনেতা সোহেল রানা। সম্প্রতি একটি পডকাস্টে অংশ নিয়ে তিনি বাংলাদেশের চলচ্চিত্র শিল্পের দুই প্রজন্মের সুপারস্টার মান্না ও শাকিব খানকে কেন্দ্র করে নিজের বিশ্লেষণ তুলে ধরেন। ঢালিউডের অতীত ও বর্তমান তারকাখ্যাতির তুলনামূলক আলোচনাই ছিল তাঁর বক্তব্যের মূল কারণ।
ঢালিউডের দুই প্রজন্মের দুই সুপারস্টার
বাংলাদেশি চলচ্চিত্র ইতিহাসে মান্না ও শাকিব খান—এই দুই নাম আলাদা আলাদা সময়ের প্রতীক। মান্না ছিলেন নব্বই দশক ও দুই হাজার দশকের শুরুতে ঢালিউডের একচ্ছত্র নায়ক। অন্যদিকে, শাকিব খান গত প্রায় দেড় দশক ধরে ইন্ডাস্ট্রির শীর্ষ তারকা হিসেবে নিজের অবস্থান ধরে রেখেছেন।
সোহেল রানার মতে, এই দুই তারকার উত্থানকে আলাদা করে দেখা জরুরি। কারণ সময়, দর্শকের রুচি ও ইন্ডাস্ট্রির বাস্তবতা—সবই ছিল ভিন্ন।
মান্না বেঁচে থাকলে শাকিবের উত্থান কেন কঠিন হতো

পডকাস্টে সোহেল রানা বলেন, মান্না জীবিত থাকলে শাকিব খানের মতো নতুন কোনো নায়কের জন্য এত দ্রুত ওপরে ওঠা সহজ ছিল না। তাঁর ভাষায়, মান্নার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে জনপ্রিয় হওয়া যেকোনো নায়কের জন্যই তখন কঠিন সময় পার করতে হতো।
তিনি মনে করিয়ে দেন, মান্নার সময়টা ছিল ঢালিউডে একক আধিপত্যের যুগ। বক্স অফিস, দর্শকপ্রিয়তা কিংবা প্রযোজকদের আস্থা—সবখানেই মান্নার প্রভাব ছিল স্পষ্ট।
মান্নার একচ্ছত্র আধিপত্যের সময়
সোহেল রানা জানান, একসময় ঢালিউডে রাজ্জাক, সোহেল রানা নিজে কিংবা অন্য তারকাদের ঘিরেও দর্শকের বিভক্ত মতামত থাকত। কিন্তু মান্না যখন শীর্ষে, তখন দর্শকের আলোচনা প্রায় একমুখী ছিল।
তাঁর মতে, দর্শক তখন মূলত মান্নাকেই কেন্দ্র করে সিনেমা দেখতেন। মান্নার বিপক্ষে তেমন কোনো আলোচনা বা বিকল্প নায়ক নিয়ে আগ্রহ ছিল না।
মান্নার অভিনয় ও ব্যক্তিত্ব নিয়ে বিশ্লেষণ
আলোচনার একপর্যায়ে সোহেল রানা মান্নার অভিনয়শৈলী ও ব্যক্তিত্বের দিকটি আলাদাভাবে তুলে ধরেন। তিনি বলেন, মান্নার কথা বলার নিজস্ব একটি ধরন ছিল, যা ঢালিউডে তাকে আলাদা করে চিনিয়েছে।
বিশেষ করে টাঙ্গাইল–ময়মনসিংহ অঞ্চলের আঞ্চলিক টান তাঁর কণ্ঠে এমনভাবে মানিয়ে যেত, যা দর্শকদের কাছে অত্যন্ত গ্রহণযোগ্য ছিল। এই ভাষাভঙ্গিকে তিনি সারা দেশে জনপ্রিয় করে তুলেছিলেন—যা ঢালিউডে খুব কম শিল্পীর ক্ষেত্রেই দেখা গেছে।
চরিত্রে মানিয়ে নেওয়ার ব্যতিক্রমী ক্ষমতা
সোহেল রানার মতে, অভিনয়ের দিক থেকেও মান্না ছিলেন ব্যতিক্রমী। যেকোনো চরিত্রে নিজেকে সহজেই মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা ছিল তাঁর।
তিনি বলেন, মান্না জানতেন কীভাবে দর্শকদের নিজের দখলে রাখতে হয়। অ্যাকশন, রোমান্টিক কিংবা আবেগপ্রবণ চরিত্র—সব ক্ষেত্রেই তিনি দর্শকের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারতেন।
শাকিব খান ও বর্তমান বাস্তবতা
সোহেল রানা বর্তমান সময়ের শাকিব খানের সঙ্গেও মান্নার তুলনা করেন। তাঁর মতে, আজকের দিনে শাকিব খানও প্রায় একই অবস্থানে রয়েছেন, যেখানে তাঁর কাছাকাছি কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী নেই।
তিনি শাকিব খানকে ‘আনপ্যারালাল’ উল্লেখ করে বলেন, বর্তমানে ঢালিউডে শাকিব খানের মতো জনপ্রিয়তা ও বক্স অফিস নিশ্চয়তা আর কোনো নায়কের নেই।
বক্স অফিস নিশ্চয়তা: মান্না ও শাকিবের মিল
সোহেল রানার বিশ্লেষণে উঠে আসে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক—প্রযোজকদের আস্থা। তাঁর মতে, একসময় মান্না মানেই ছিল হিট সিনেমার নিশ্চয়তা।
প্রযোজকরা মান্নাকে নিয়ে বিনিয়োগ করতে সাহস পেতেন। ঠিক একই ভরসা এখন শাকিব খানের সিনেমার ক্ষেত্রেও দেখা যায়। এই জায়গাটিই মান্না ও শাকিব খানের মধ্যে সবচেয়ে বড় মিল।
মান্নার মৃত্যু ও ঢালিউডের শূন্যতা
উল্লেখ্য, ঢালিউডের জনপ্রিয় ও সফল নায়ক মান্না ২০০৮ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুর ঠিক আগের রাতেও তিনি শুটিং শেষ করে বাসায় ফিরেছিলেন।
তাঁর অকাল প্রয়াণে ঢালিউডে যে শূন্যতা তৈরি হয়, তা আজও পূরণ হয়নি বলে মনে করেন অনেক চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি। দর্শকদের স্মৃতিতে মান্না এখনো একজন কিংবদন্তি অভিনেতা হিসেবে উজ্জ্বল।
শিল্পীসত্তা ও সময়ের প্রভাব
সোহেল রানার বক্তব্য থেকে স্পষ্ট, তিনি মান্না ও শাকিব—দুজনকেই তাঁদের সময়ের প্রেক্ষাপটে মূল্যায়ন করতে চান। তাঁর মতে, সময় বদলেছে, দর্শকের রুচিও বদলেছে। তবে একক আধিপত্যের জায়গায় মান্না ও শাকিব খান—দুজনই নিজ নিজ সময়ের প্রতিনিধি।
গণমাধ্যমে আলোচনার প্রভাব
এই মন্তব্য প্রকাশের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিনোদন অঙ্গনে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। ঢালিউডের ইতিহাস, তারকাখ্যাতির ধারাবাহিকতা এবং ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব নিয়ে এই বক্তব্য নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।




