জাতীয় গ্রিডে এলএনজি সরবরাহ কমেছে রক্ষণাবেক্ষণ কাজের কারণে। এতে বাসাবাড়ি, শিল্প ও বিদ্যুৎ খাতে গ্যাস সংকট আরও তীব্র হচ্ছে—জানুন বিস্তারিত।
দেশে চলমান জ্বালানি সংকটের মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে জাতীয় গ্রিডে এলএনজি সরবরাহ কমেছে—এই তথ্যটি। এলএনজি টার্মিনালের রক্ষণাবেক্ষণ কাজের কারণে সাময়িকভাবে জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ হ্রাস পাচ্ছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে বসতবাড়ি, শিল্প, বাণিজ্যিক ও বিদ্যুৎ খাতে। ফলে দেশের বড় একটি জনগোষ্ঠী এবং অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলো নতুন করে চাপের মুখে পড়ছে।
তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন পিএলসি জানিয়েছে, শনিবার দুপুর ১২টা থেকে রবিবার দুপুর ১২টা পর্যন্ত এলএনজি টার্মিনালে রক্ষণাবেক্ষণ কাজ চলবে। এই সময়ের মধ্যে এলএনজি থেকে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ স্বাভাবিকের তুলনায় কম থাকবে। এতে গ্যাসের চাপ আরও কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বর্তমান বাস্তবতায় জাতীয় গ্রিডে এলএনজি সরবরাহ কমেছে—এই খবর শুধু একটি সাময়িক বিজ্ঞপ্তি নয়; এটি দেশের জ্বালানি ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার দিকটিও সামনে এনে দিয়েছে।
জাতীয় গ্রিডে এলএনজি সরবরাহ কমেছে: কেন এই সংকট?
সংশ্লিষ্ট সূত্র অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩৮০ কোটি ঘনফুট। অথচ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ হচ্ছে মাত্র ২৫০–২৬০ কোটি ঘনফুট। অর্থাৎ প্রতিদিন গড়ে ১২০ কোটি ঘনফুটের বেশি ঘাটতি থাকছে।
এই ঘাটতির বড় অংশ পূরণে সরকার আমদানিকৃত এলএনজির ওপর নির্ভরশীল। তবে টার্মিনালের রক্ষণাবেক্ষণ কাজের সময় এলএনজি গ্রহণ ও রিগ্যাসিফিকেশন প্রক্রিয়া আংশিকভাবে ব্যাহত হয়। ফলে জাতীয় গ্রিডে এলএনজি সরবরাহ কমেছে, যার প্রভাব দ্রুত গ্রাহক পর্যায়ে পৌঁছে যাচ্ছে।
বসতবাড়িতে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তি
গ্যাস সংকটের সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী হচ্ছেন আবাসিক গ্রাহকরা। রাজধানী ঢাকা ও আশপাশের এলাকায় সকাল ও সন্ধ্যার রান্নার সময় বহু জায়গায় চুলায় আগুন জ্বলছে না—এমন অভিযোগ নিয়মিত পাওয়া যাচ্ছে।
অনেক পরিবারকে একাধিক চুলা থাকলেও একটি চুলা ব্যবহার করে রান্না শেষ করতে হচ্ছে। কোথাও কোথাও দিনের নির্দিষ্ট সময় ছাড়া গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না। এই পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষ নতুন করে প্রশ্ন তুলছেন—কবে মিলবে স্বস্তি?
বিশেষজ্ঞদের মতে, জাতীয় গ্রিডে এলএনজি সরবরাহ কমেছে এমন পরিস্থিতিতে আবাসিক খাতে চাপ বাড়াই স্বাভাবিক, কারণ এই খাতে বিকল্প জ্বালানির সুযোগ সীমিত।
এলপিজি বাজারেও বাড়তি চাপ

পাইপলাইনের গ্যাসের বিকল্প হিসেবে ব্যবহৃত এলপিজি বাজারেও সংকট দেখা দিয়েছে। চলতি মাসের শুরু থেকেই অনেক এলাকায় এলপিজি সিলিন্ডার পাওয়া যাচ্ছে না বা দেরিতে মিলছে।
ব্যবসায়ীরা বলছেন—
-
শীত মৌসুমে চাহিদা বৃদ্ধি
-
পরিবহন জটিলতা
-
আমদানিনির্ভরতা
এই তিনটি কারণ মিলেই বাজারে চাপ তৈরি করেছে। ফলে নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে এলপিজি বিক্রির অভিযোগও উঠছে।
গ্যাস সংকটের কারণে যখন জাতীয় গ্রিডে এলএনজি সরবরাহ কমেছে, তখন এলপিজি বাজারে স্থিতিশীলতা না থাকায় ভোগান্তি আরও বেড়েছে।
শিল্প খাতে উৎপাদন ব্যাহত
গ্যাস সংকটের সরাসরি প্রভাব পড়ছে শিল্প খাতে। অনেক কারখানায়—
-
উৎপাদন শিফট কমানো হয়েছে
-
আংশিক উৎপাদন বন্ধ রাখা হয়েছে
-
কিছু ক্ষেত্রে অর্ডার ডেলিভারিতে দেরি হচ্ছে
বিশেষ করে গার্মেন্টস, সিরামিক, টেক্সটাইল ও খাদ্য প্রক্রিয়াজাত শিল্পগুলো বেশি চাপে পড়েছে।
শিল্প উদ্যোক্তারা বলছেন, জাতীয় গ্রিডে এলএনজি সরবরাহ কমেছে—এই অবস্থায় ধারাবাহিক উৎপাদন ধরে রাখা কঠিন হয়ে যাচ্ছে। এতে রপ্তানি আয়ে প্রভাব পড়ার আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে।
বিদ্যুৎ উৎপাদনে বাড়ছে বিকল্প জ্বালানির ব্যবহার
বিদ্যুৎ খাতেও গ্যাস সংকটের প্রভাব স্পষ্ট। গ্যাসচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো চাহিদা অনুযায়ী গ্যাস না পাওয়ায় বিকল্প জ্বালানির ওপর নির্ভরতা বাড়ছে।
ফার্নেস অয়েল বা ডিজেল ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে হলে—
-
উৎপাদন ব্যয় বাড়ে
-
সরকারকে বেশি ভর্তুকি দিতে হয়
-
বিদ্যুতের দাম বাড়ার চাপ তৈরি হয়
এ অবস্থায় জাতীয় গ্রিডে এলএনজি সরবরাহ কমেছে—এই সংকট দীর্ঘস্থায়ী হলে বিদ্যুৎ খাতেও অস্থিরতা বাড়তে পারে।
তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষের বক্তব্য
তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই রক্ষণাবেক্ষণ কাজ শেষ করার চেষ্টা চলছে। কাজ শেষ হলে এলএনজি থেকে জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ ধীরে ধীরে স্বাভাবিক করা হবে।
তবে তারা স্বীকার করেছে, চাহিদার তুলনায় সামগ্রিক সরবরাহ ঘাটতি থাকায় পুরোপুরি স্বস্তি ফিরতে কিছুটা সময় লাগতে পারে।
সংস্থাটি সাময়িক এই অসুবিধার জন্য গ্রাহকদের প্রতি দুঃখ প্রকাশ করেছে এবং সংকটকালীন সময়ে গ্যাসের সাশ্রয়ী ব্যবহার নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছে।
ভবিষ্যৎ করণীয় ও বিশেষজ্ঞ মত
জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘমেয়াদে এই সংকট কাটাতে হলে—
-
দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে
-
এলএনজি টার্মিনালের সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে হবে
-
নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়াতে হবে
না হলে বারবার এমন পরিস্থিতি তৈরি হবে, যেখানে জাতীয় গ্রিডে এলএনজি সরবরাহ কমেছে—এই খবর সাধারণ মানুষের জন্য নিয়মিত দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়াবে।




