নেতানিয়াহু এখন কোথায়? —এ প্রশ্নে ইরানি গণমাধ্যমে ছড়িয়েছে গুজব। তাসনিমের প্রতিবেদনে ৫টি সূত্রের কথা বলা হলেও জেরুজালেম পোস্ট তা মিথ্যা বলে উড়িয়ে দিয়েছে।
সাম্প্রতিক সময়ে আন্তর্জাতিক রাজনীতির আলোচনায় একটি প্রশ্ন ঘুরে ফিরে আসছে—নেতানিয়াহু কোথায়। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ‘আহত বা নিহত’ হয়েছেন—এমন জল্পনা ছড়িয়ে পড়েছে ইরানের কয়েকটি গণমাধ্যমে। গত কয়েক দিন ধরে তাকে প্রকাশ্যে দেখা না যাওয়া এবং কোনো নতুন ভিডিও বার্তা প্রকাশ না হওয়াকে কেন্দ্র করে এই আলোচনা আরও জোরালো হয়েছে।
মঙ্গলবার (১০ মার্চ) ইরানের বার্তা সংস্থা তাসনিম নিউজ এজেন্সি এক প্রতিবেদনে এই জল্পনার বিষয়টি তুলে ধরে। তবে ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম দ্য জেরুজালেম পোস্ট এই খবরকে সরাসরি গুজব বলে উড়িয়ে দিয়েছে। ফলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রশ্ন উঠেছে—আসলে পরিস্থিতি কী?
ইরানি প্রতিবেদনে কেন উঠছে প্রশ্ন: নেতানিয়াহু কোথায়

তাসনিম নিউজের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনার কারণে এই জল্পনা তৈরি হয়েছে। তাদের দাবি, বিভিন্ন সূত্র থেকে পাওয়া কিছু তথ্য ইঙ্গিত করছে যে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রীর সাম্প্রতিক কার্যক্রমে অস্বাভাবিকতা দেখা গেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, অন্তত পাঁচটি বিষয় এই আলোচনাকে উসকে দিয়েছে।
১. ভিডিও বার্তা হঠাৎ বন্ধ
তাসনিমের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, নেতানিয়াহুর ব্যক্তিগত চ্যানেলে তার সর্বশেষ ভিডিও পোস্ট হওয়ার প্রায় তিন দিন পেরিয়ে গেছে।
এছাড়া তার শেষ ছবি প্রকাশিত হওয়ারও প্রায় চার দিন হয়ে গেছে। এর পর থেকে নেতানিয়াহুর নামে যে বক্তব্যগুলো প্রকাশিত হয়েছে সেগুলো ছিল কেবল টেক্সটভিত্তিক।
প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, এর আগে নেতানিয়াহু প্রায় প্রতিদিনই অন্তত একটি ভিডিও প্রকাশ করতেন, কখনও কখনও দিনে তিনটি পর্যন্ত ভিডিওও দেখা যেত। হঠাৎ করে ভিডিও বার্তা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও নানা আলোচনা শুরু হয়েছে।
২. নিয়মিত ভিডিও প্রকাশের ধারাবাহিকতা ভেঙে যাওয়া
তাসনিম আরও উল্লেখ করেছে, নেতানিয়াহুর আগের ভিডিও কার্যক্রমের সঙ্গে সাম্প্রতিক পরিস্থিতির একটি বড় পার্থক্য রয়েছে।
প্রতিদিন ভিডিও প্রকাশের অভ্যাস থাকলেও গত তিন দিনে কোনো নতুন ভিডিও না থাকায় বিভিন্ন মহলে সন্দেহ তৈরি হয়েছে। এই পরিস্থিতিই মূলত গুজব ছড়িয়ে পড়ার অন্যতম কারণ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
৩. বাসভবনের নিরাপত্তা জোরদারের খবর
প্রতিবেদনটিতে আরও বলা হয়েছে, কয়েকটি হিব্রু ভাষার সূত্র দাবি করেছে যে ৮ মার্চ নেতানিয়াহুর বাড়ির চারপাশে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে।
বিশেষ করে সম্ভাব্য আত্মঘাতী ড্রোন হামলা মোকাবিলার জন্য এই নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।
যদিও এই দাবির সত্যতা নিয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক বিবৃতি প্রকাশ করা হয়নি।
৪. যুক্তরাষ্ট্রের দুই গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির সফর বাতিল
তাসনিম নিউজ আরও দাবি করেছে, যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার এবং ট্রাম্পের বিশেষ প্রতিনিধি স্টিভ উইটকফ–এর ইসরায়েল সফর বাতিল হওয়াও আলোচনার একটি কারণ।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই সফর মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। তবে হঠাৎ করে সফরটি বাতিল হওয়ায় অনেকে এর সঙ্গে নেতানিয়াহুর পরিস্থিতির সম্পর্ক খুঁজছেন।
৫. ম্যাক্রোঁর সঙ্গে ফোনালাপের তারিখ উল্লেখ না করা
আরেকটি বিষয় তুলে ধরা হয়েছে ফরাসি প্রেসিডেন্সির একটি প্রতিবেদনে।
এতে বলা হয়েছে, ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ ও নেতানিয়াহুর মধ্যে টেলিফোনে কথোপকথনের বিষয়টি উল্লেখ করা হলেও নির্দিষ্ট তারিখ উল্লেখ করা হয়নি।
এছাড়া এই কথোপকথনের একটি টেক্সট প্রকাশ করা হলেও কোনো ভিডিও বা বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।
তাসনিমের মতে, এই ঘটনাগুলোও জল্পনা বাড়াতে ভূমিকা রেখেছে।
ইসরায়েল সরকারের পক্ষ থেকে এখনো কোনো ব্যাখ্যা নেই
এই পরিস্থিতিতে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—ইসরায়েল সরকারের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত এসব জল্পনা নিয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো ব্যাখ্যা বা প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
ফলে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের মধ্যে নেতানিয়াহু কোথায়—এই প্রশ্ন আরও জোরালোভাবে সামনে আসছে।
জেরুজালেম পোস্ট বলছে: পুরো বিষয়টি গুজব
অন্যদিকে ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম দ্য জেরুজালেম পোস্ট এই খবরকে সরাসরি গুজব হিসেবে উল্লেখ করেছে।
তাদের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানি গণমাধ্যমে ছড়ানো নেতানিয়াহুর আহত বা নিহত হওয়ার খবরের কোনো সত্যতা নেই।
সংবাদমাধ্যমটি আরও উল্লেখ করেছে, ৭ মার্চ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে নেতানিয়াহুর একটি আনুষ্ঠানিক বিবৃতি প্রকাশিত হয়েছে।
সাম্প্রতিক সময়রেখা কী বলছে
জেরুজালেম পোস্টের তথ্য অনুযায়ী নেতানিয়াহুর সাম্প্রতিক কার্যক্রমের একটি টাইমলাইনও প্রকাশিত হয়েছে।
-
৫ মার্চ: ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁর সঙ্গে নেতানিয়াহুর ফোনালাপের বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়।
-
৬ মার্চ: তাকে ইসরায়েলের বীরশেবা এলাকায় একটি ক্ষতিগ্রস্ত স্থান পরিদর্শন করতে দেখা গেছে।
-
৭ মার্চ: প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে একটি আনুষ্ঠানিক বিবৃতি প্রকাশ করা হয়।
এই তথ্যগুলো তুলে ধরে জেরুজালেম পোস্ট বলছে, নেতানিয়াহুর আহত বা নিহত হওয়ার খবর ভিত্তিহীন।
আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু
ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক উত্তেজনার কারণে এ ধরনের খবর দ্রুত আন্তর্জাতিক আলোচনায় উঠে আসে।
বিশেষ করে যখন কোনো গুরুত্বপূর্ণ নেতা কয়েক দিন প্রকাশ্যে না থাকেন, তখন গুজব বা অনুমান দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার প্রবণতা দেখা যায়।
এই পরিস্থিতিতেও একই ধরনের তথ্যযুদ্ধ বা তথ্যভিত্তিক বিতর্ক দেখা যাচ্ছে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা।
যাচাইযোগ্য তথ্যের গুরুত্ব
আন্তর্জাতিক সংবাদ পরিবেশে বড় রাজনৈতিক নেতাদের নিয়ে গুজব ছড়িয়ে পড়া নতুন কিছু নয়।
তবে সাংবাদিকতার মূল নীতি অনুযায়ী, কোনো তথ্য নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত সেটিকে যাচাই করা জরুরি।
এই প্রসঙ্গে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর যাচাই করা প্রতিবেদন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
সবশেষে বলা যায়, ইরানি গণমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া খবরের ভিত্তিতে নেতানিয়াহু কোথায়—এই প্রশ্ন আন্তর্জাতিক আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে।
তবে এখন পর্যন্ত ইসরায়েল সরকারের পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি। একই সময়ে ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম জেরুজালেম পোস্ট এই খবরকে সম্পূর্ণ গুজব হিসেবে উল্লেখ করেছে।
ফলে যাচাই করা তথ্য ছাড়া কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয়। পরিস্থিতি সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পেতে আরও আনুষ্ঠানিক তথ্য প্রকাশের অপেক্ষা করছেন আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা।




