নতুন সরকারের সামনে কঠিন অর্থনীতি বাস্তবতা হয়ে দাঁড়িয়েছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, দুর্বল ব্যাংক খাত ও বিনিয়োগ সংকট সামাল দিতে কঠিন সিদ্ধান্ত দরকার।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর দায়িত্ব নিতে যাওয়া নতুন সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে নতুন সরকারের সামনে কঠিন অর্থনীতি। বাইরে থেকে অর্থনৈতিক পরিস্থিতি কিছুটা স্থিতিশীল মনে হলেও ভেতরে জমে আছে গভীর সংকট। প্রায় সব খাতেই স্থবিরতা, অনিশ্চয়তা ও আস্থাহীনতার ছাপ স্পষ্ট, যা নতুন সরকারের জন্য নীতিনির্ধারণকে জটিল করে তুলছে।
বিশেষ করে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে শুরু হওয়া আর্থিক খাতের বেশ কয়েকটি সংস্কার এখনো অসমাপ্ত। এসব সংস্কার শেষ করার দায় পড়বে নির্বাচিত সরকারের ওপর। তবে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, দুর্বল ব্যাংক খাত, রাজস্ব ঘাটতি ও বিনিয়োগ স্থবিরতার মতো সমস্যার ভিড়ে কাজটি সহজ হবে না।
কেন নতুন সরকারের সামনে কঠিন অর্থনীতি সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ

অর্থনীতিবিদদের মতে, বর্তমানে দেশের অর্থনীতির সবচেয়ে বড় সংকট হলো বিনিয়োগ কমে যাওয়া। নতুন সরকারের সামনে কঠিন অর্থনীতি বাস্তবতায় বিনিয়োগ না বাড়লে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয় না, উৎপাদনও বাড়ে না। এর প্রভাব পড়ে সামগ্রিক অর্থনীতির ওপর।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)-এর নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে নীতির ধারাবাহিকতা ও সুশাসন নিশ্চিত না হলে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরানো কঠিন হবে। শিল্প খাতে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থায়ন এখন বড় সংকটে রয়েছে।
ব্যাংক খাতের দুর্বলতা বাড়াচ্ছে চাপ
ব্যাংক খাত নতুন সরকারের জন্য অন্যতম বড় মাথাব্যথা। রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পরও গ্রাহকদের আস্থা পুরোপুরি ফেরেনি। অনেক ক্ষেত্রে ব্যাংক ঋণ শিল্পের সহায়ক না হয়ে বোঝায় পরিণত হয়েছে।
সরকারের বাজেট ঘাটতি মেটাতে ব্যাংক থেকে বেশি ঋণ নেওয়ার ফলে বেসরকারি খাত ঋণ সংকটে পড়ছে। এতে নতুন সরকারের সামনে কঠিন অর্থনীতি আরও জটিল রূপ নিচ্ছে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, ব্যাংক সংস্কার ছাড়া এই সংকট দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে।
উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা
উচ্চ মূল্যস্ফীতি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে প্রতিদিন আরও কঠিন করে তুলছে। খাদ্যপণ্যের দাম কিছুটা স্থিতিশীল হলেও খাদ্যবহির্ভূত পণ্যের দাম এখনো চাপে রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এটি আর সাময়িক সমস্যা নয়; বরং কাঠামোগত সংকট। শুধু সুদের হার বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। সরবরাহ ব্যবস্থা, মজুত ব্যবস্থাপনা ও বাজার তদারকিতে সংস্কার জরুরি।
উন্নয়ন ব্যয়ে ধীরগতি ও বিনিয়োগ স্থবিরতা
সিপিডির গবেষণায় দেখা গেছে, চলতি অর্থবছরের প্রথম কয়েক মাসে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) বাস্তবায়ন হার খুবই কম। ফলে অর্থনীতিতে যে চাহিদা তৈরি হওয়ার কথা ছিল, তা হচ্ছে না।
উন্নয়ন প্রকল্পের ধীরগতি সরাসরি প্রভাব ফেলছে বেসরকারি খাতের ওপর। শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও মানবসম্পদ খাতে কম ব্যয় ভবিষ্যতের উৎপাদনশীলতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। এতে নতুন সরকারের সামনে কঠিন অর্থনীতি দীর্ঘমেয়াদি রূপ নিতে পারে।
কর্মসংস্থান সংকট ও শিল্প খাতের চাপ
গত এক বছরের বেশি সময় ধরে অনেক কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। এর ফলে লাখো মানুষ কাজ হারিয়েছে। কর্মসংস্থান না বাড়ায় সাধারণ মানুষের আয়ও বাড়ছে না। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে জীবনযাত্রার ব্যয়ে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কর্মসংস্থান পুনরুদ্ধার না হলে অর্থনীতির গতি ফিরবে না। তাই নতুন সরকারের জন্য শিল্প খাতকে সচল করা জরুরি।
রমজান ও ঈদের বাজার নিয়ন্ত্রণে বড় পরীক্ষা
দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই নতুন সরকারের সামনে তাৎক্ষণিক চ্যালেঞ্জ হবে রমজানের বাজার নিয়ন্ত্রণ। তবে এই বাজার পরিস্থিতি শুধু মৌসুমি সমস্যা নয়।
দীর্ঘদিনের উচ্চ মূল্যস্ফীতি, দুর্বল সরবরাহ ব্যবস্থা ও বাজার ব্যবস্থাপনার সীমাবদ্ধতা এ সংকটের মূল কারণ। ফলে নতুন সরকারের সামনে কঠিন অর্থনীতি মোকাবিলায় বাজার ব্যবস্থাপনায় সংস্কার জরুরি হয়ে উঠেছে।
রাজস্ব ঘাটতি ও পে-স্কেল বাস্তবায়নের চাপ
চলতি অর্থবছরের প্রথমার্ধেই রাজস্ব ঘাটতি বড় আকার ধারণ করেছে। করদাতার সংখ্যা না বাড়লে এবং অপ্রয়োজনীয় কর ছাড় কমানো না গেলে এ ঘাটতি আরও বাড়তে পারে।
এদিকে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য নতুন বেতন কাঠামোর প্রস্তাব এসেছে। মূল বেতন দ্বিগুণসহ বড় ধরনের বাড়তির সুপারিশ থাকায় সরকারি অর্থনীতির ওপর চাপ বাড়তে পারে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।
এলডিসি উত্তরণ ও ভবিষ্যৎ চাপ
আগামী নভেম্বরে বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণ করবে। এতে উন্নত দেশ থেকে পাওয়া কিছু বাণিজ্য সুবিধা কমে যাবে।
ব্যবসায়ীরা এলডিসি উত্তরণ কিছু বছর পিছিয়ে দেওয়ার দাবি জানালেও সরকার তার সিদ্ধান্তে অনড়। বিশ্লেষকদের মতে, এই উত্তরণ নতুন সরকারের সামনে কঠিন অর্থনীতি আরও চ্যালেঞ্জিং করে তুলতে পারে।
সামনে পথ কতটা কঠিন
সব মিলিয়ে নতুন সরকারের সামনে অর্থনীতির পথ সহজ নয়। বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান, মূল্যস্ফীতি ও ব্যাংক খাত—সব জায়গাতেই সমন্বিত সংস্কার প্রয়োজন।
নীতির ধারাবাহিকতা ও সুশাসন নিশ্চিত করা না গেলে সংকট আরও গভীর হতে পারে। তাই বাস্তবমুখী সিদ্ধান্তই হতে পারে নতুন সরকারের সবচেয়ে বড় শক্তি।




